আচমকা অবসর ঘোষণা করে দিলেন অজিঙ্ক রাহানে। তিনি জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ও ক্রিকেটের সব ধরনের ফরম্যাট থেকে অবসর নিচ্ছেন। বৃহস্পতিবার একটি ভিডিয়োবার্তায় কাঁদতে কাঁদতে নিজের অবসরের কথা জানিয়ে দেন আইপিএলে কলকাতা নাইট রাইডার্সের অধিনায়ক।
ইনস্টাগ্রামে একটি ভিডিয়ো পোস্ট করেছেন রাহানে। ক্যাপশনে লেখা, “টুপি নম্বর ২৭৮ বিদায় জানাচ্ছে। এত বছর ধরে সব ভালবাসা ও সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ। সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকব।”
ভিডিয়োয় দেখা যাচ্ছে, এক জায়গায় বসে নিজের অবসরের ঘোষণা করছেন তিনি। রাহানে বলেন, “জীবনের সার কথাই হল, সব কিছুর যেমন শুরু আছে, তেমন শেষও আছে। সময় এলে তাকে সম্মান জানিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হয়। আমি ব্যাটিংয়ের সময় টাইমিংয়ের উপর গুরুত্ব দিতাম। তাই সময়ের গুরুত্ব জানি। আমার মনে হয়েছে, এগিয়ে যাওয়ার এটাই সেরা সময়। তাই আমি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ও ক্রিকেটের সব ফরম্যাট থেকে অবসর ঘোষণা করছি।”
ভিডিয়োয় কেকেআরের নাম নেননি রাহানে। কিন্তু ক্রিকেটের সব ফরম্যাট বলতে যেমন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বোঝায়, তেমনই ঘরোয়া ক্রিকেট ও আইপিএলকেও বোঝায়। তাই বলেই দেওয়া যায়, আইপিএল থেকেও অবসর নিলেন তিনি। তাঁর নেতৃত্বে গত দুই মরসুমে ব্যর্থ হয়েছে কেকেআর। আগামী মরসুমে না হলেও তার পরের বার তিনি বাদ পড়তেন। তাই তার আগেই হয়তো সরে দাঁড়ালেন রাহানে। অর্থাৎ, আগামী মরসুমের আগে নতুন অধিনায়ক বেছে নিতে হবে কেকেআরকে।
নিজের জীবনের সংগ্রামের কথাও শোনা গিয়েছেন রাহানের মুখে। তিনি বলেন, “ডম্বিভলির যে ছেলেটা রোজ সকালে অনুশীলনে যেত, রোজ মাঠে নামত, যে সুযোগ পেত তা কাজে লাগানোর চেষ্টা করত, সেই ছেলেটার একটাই স্বপ্ন ছিল। ভারতের জার্সি পরা। আমি সব সময় দলকে ও সতীর্থদের নিজের থেকে আগে রেখেছি। সব সময় সততার সঙ্গে খেলেছি। একটা কথা বিশ্বাস করেছি। যদি তুমি সঠিক মানসিকতা নিয়ে খেলো, তা হলে এই খেলা তোমাকে অনেক কিছু ফিরিয়ে দেবে।”
গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
ভারতীয় ক্রিকেটের বিবর্তনের কথাও বলেছেন রাহানে। তিনি বলেন, “যে দিন ভারতের হয়ে অভিষেক হয়েছিল, সে দিন থেকে গত ২০ বছরে ভারতীয় ক্রিকেট অনেক বদলেছে। সেই পরিবর্তনের সাক্ষী থেকেছি।” ক্রিকেটার হিসাবে অবসর নিলেও যে ক্রিকেট তিনি ছাড়বেন না, সেই ইঙ্গিতও দিয়েছেন রাহানে। তিনি বলেন, “ক্রিকেটার হিসাবে আমার যাত্রা শেষ। কিন্তু ক্রিকেট থেকে দূরে যাচ্ছি না। পরের প্রজন্মকে এখনও কিছু দেওয়ার আছে। ক্রিকেট আমাকে যে মূল্যবোধ শিখিয়েছে, তা পরের প্রজন্মকে শিখিয়ে যেতে চাই।” তবে কি এ বার মেন্টর বা কোচের ভূমিকায় দেখা যেতে পারে রাহানেকে? সেই জল্পনা শোনা যাচ্ছে।
হার-জিত তো লেগেই থাকবে, ক্রিকেট খেলার যে আনন্দ সেই কথা শোনা গিয়েছে রাহানের গলায়। তিনি বলেন, “মুম্বই থেকে শুরু করে ভারতীয় দলে এত বছর খেলেছি। অনেক হার-জিতের সাক্ষী থেকেছি। কিন্তু সে সবের বাইরে একসঙ্গে মিলে ক্রিকেট খেলার যে আনন্দ সেটাই আমার কাছে আসল।”
রাহানের আরও বলেন, “ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড, মুম্বই ক্রিকেট বোর্ড, আইপিএলের সকল ফ্র্যাঞ্চাইজ়ি, রাধিকা, আমার পরিবার, বন্ধুবান্ধব ও যাঁরা আমার পাশে থেকেছেন, সকলকে ধন্যবাদ। সবচেয়ে বেশি ধন্যবাদ সেই সকল সমর্থকে, যাঁরা আমার জীবনের ভাল ও খারাপ সব পরিস্থিতিতেই সমর্থন করেছেন।” আইপিএলের ফ্র্যাঞ্চাইজ়িদের ধন্যবাদ জানানোর অর্থ, ক্রোড়পতি লিগেও আর দেখা যাবে না তাঁকে। নইলে এই কথা বলতেন না তিনি। অর্থাৎ, সরাসরি না বললেও বোঝা যাচ্ছে, ক্রিকেট খেলতে আর দেখা যাবে না ভারতের অন্যতম সেরা মিডল অর্ডার ব্যাটারকে।
আরও পড়ুন:
এর পর আর নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারেননি রাহানে। আপাতশান্ত রাহানে কেঁদেও ফেলেন। কাঁদতে কাঁদতেই তিনি বলেন, “অজিঙ্ক নামের অর্থ অপরাজিত। কিন্তু ক্রিকেট আমাকে শিখিয়েছে, সাফল্যের চেয়ে বেশি হার হবে। আমার দল হেরেছে। আমি ভুল করেছি। শিখেছি। কিন্তু একটা জায়গায় আমি কোনও দিন হারিনি। সেটা হল আপনাদের হৃদয়ে জিততে। আপনারা সকলে আমাকে আপন করে নিয়েছেন। তার জন্য ধন্যবাদ। টুপি নম্বর ২৭৮ বিদায় জানাল।”
ভারতের হয়ে ৮৫ টেস্ট, ৯০ এক দিনের ম্যাচ ও ২০ টি-টোয়েন্টি খেলেছেন রাহানে। টেস্টে ৫০৭৭, এক দিনের ক্রিকেটে ২৯৬২ ও টি-টোয়েন্টিতে ৩৭৫ রান করেছেন তিনি। সব মিলিয়ে ১৫ শতরান ও ৫১ অর্ধশতরান রয়েছে তাঁর। ২০১ প্রথম শ্রেণির ম্যাচে ১৪,০০০ রান করেছেন রাহানে। ৪১ শতরান ও ৫৯ অর্ধশতরান করেছেন তিনি। ভারতকে ছ’টি টেস্টে নেতৃত্ব দিয়েছেন রাহানে। একটিও হারেননি। চারটি জিতেছেন। দু’টি ড্র হয়েছে। তার মধ্যে ২০২১ সালে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তাদের বিরুদ্ধে ভাঙাচোরা দল নিয়ে বর্ডার-গাওস্কর ট্রফি জয়ের কৃতিত্বও রয়েছে।
পাশাপাশি আইপিএলে মুম্বই ইন্ডিয়ান্স, রাজস্থান রয়্যালস, রাইজ়িং পুণে সুপারজায়ান্ট, দিল্লি ক্যাপিটালস, চেন্নাই সুপার কিংস ও কলকাতা নাইট রাইডার্সের হয়ে খেলেছেন তিনি। সব মিলিয়ে ২১২ ম্যাচে ৫৩৬৭ রান করেছেন রাহানে। ২ শতরান ও ৩৫ অর্ধশতরান রয়েছে তাঁর।