ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া তাঁকে খেলার অনুমতি দেওয়ার পর থেকে বিতর্ক আরও বেড়েছে অনয়া বাঙ্গারকে ঘিরে। ভারতের প্রাক্তন ক্রিকেটার সঞ্জয় বাঙ্গারের সন্তান অনয়া রূপান্তরিত। ছেলে থেকে মেয়ে হয়েছেন তিনি। অনয়াকে ক্রিকেট খেলার অনুমতি দেওয়া উচিত কি না, তা নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত ক্রিকেট দুনিয়া। এই পরিস্থিতিতে রূপান্তরিত হিসাবে প্রথম আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা ড্যানিয়েল ম্যাকগেহেকে পাশে পেয়েছেন অনয়া।
কানাডার মহিলা ক্রিকেটার ড্যানিয়েল জানিয়েছেন, তিনি অনয়াকে পূর্ণ সমর্থন করছেন। নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন তিনি। স্পোর্টস নাও-কে ড্যানিয়েল বলেন, “অনয়ার প্রতি আমার পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। আমি ওকে নিয়ে গর্বিত। এত বিরোধিতার পরেও যে ও ক্রিকেট খেলতে চেয়েছে, সেটাই আমার সবচেয়ে ভাল লেগেছে।” ড্যানিয়েল আরও বলেন, “আমি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, রূপান্তরিত হওয়ার পর নিজের পরিচয় বাঁচিয়ে রাখা কতটা কঠিন। মানুষ আপনাকে না জেনেই সমালোচনা করবে। সে সব পাত্তা দিলে হবে না।”
অনয়াকে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া খেলার অনুমতি দেওয়ার পর ক্ষুব্ধ দক্ষিণ আফ্রিকার মহিলা ক্রিকেটার মারিজ়ান কাপ। অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটে অনয়াকে খেলার অনুমতি দেওয়া একটি প্রতিবেদনের ছবি উল্লেখ করে সমাজমাধ্যমে স্টোরি দিয়েছেন কাপ। সঙ্গে লিখেছেন, “পুরোপুরি হাস্যকর সিদ্ধান্ত। কোনও মতেই এই জিনিস চলতে দেওয়া উচিত নয়।”
কাপকে জবাব দিয়েছেন অনয়া। শুক্রবার এক সাক্ষাৎকারে অনয়া বলেছেন, “যারা এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গলা চড়িয়ে কথা বলছে, তাদের উচিত এই বিষয়টা নিয়ে ভাল করে পড়াশোনা করা। আমি যে অন্যায্য সুবিধা পাচ্ছি না, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য ইতিমধ্যেই জমা দিয়েছি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া যে নির্দেশিকা দিয়েছে সেটাও মেনে চলছি। যদি কেউ ব্যক্তিগত মতামত দিয়ে থাকেন, তা হলে তাদের উচিত নিজেদের শিক্ষিত করে তোলা।”
এই ঘটনাতেও অনয়ার পাশে ড্যানিয়েল। তিনি জানিয়েছেন, যে ভাবে প্রকাশ্যে কেউ কেউ অনয়ার সমালোচনা করেছেন, তাতে তিনি হতাশ। ড্যানিয়েল বলেন, “তিন বছর আগে যে ভাবে আমাকে অসম্মান করা হত, অনয়াকেও সেই একই ভাবে অসম্মানিত করা হচ্ছে। এটা দেখে আমি হতাশ। আমাদের চিকিৎসাবিজ্ঞান এক উন্নত হওয়ার পরেও কিছু মানুষ বস্তাপচা ধারণা নিয়ে পড়ে আছে। তাতে আরও খারাপ লাগছে।”
ড্যানিয়েলের মতে, অনয়া মহিলাদের ক্রিকেটে খেলতে পারবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ ভাবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের উপর ছেড়ে দেওয়া উচিত। সকলে ভুলে যাচ্ছেন যে, অনয়াও মানুষ। ড্যানিয়েল বলেন, “আমাদের এটা মাথায় রাখতে হবে যে, অনয়াও মানুষ। কারও অধিকার নেই ওকে এ সব বলার। কিছু না জেনেই সকলে মন্তব্য করছে। যদি চিকিৎসাবিজ্ঞান ওকে খেলার অনুমতি দেয়, তাতে কার কী বলার আছে।”
লিঙ্গ পরিবর্তনের পর ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডও অনয়াকে খেলার অনুমতি দেয়নি। বোর্ডের বিরুদ্ধেও মুখ খুলেছেন তিনি। সংবাদ সংস্থাকে সাক্ষাৎকারে অনয়া বলেছেন, “বরাবর আমার প্রতি নীরব থেকেছে বোর্ড। দেখে প্রচণ্ড হতাশ হয়েছি। মন ভেঙে গিয়েছে। আমি জানতাম রূপান্তরিত হলে ক্রিকেট থেকে দূরে সরে যেতে হবে। আশা করি এ বার বোর্ড আমাদের মতো ক্রিকেটারদের খেলানো নিয়ে নতুন নিয়ম তৈরি করবে। কারণ আমিই এ ব্যাপারে ভারতে প্রথম।”
আরও পড়ুন:
অনয়ার সংযোজন, “সুযোগ পেলে দলের সদস্য হতে রাজি। নিজের জ্ঞান এবং গোটা যাত্রাপথের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে চাই। দেশ এবং মহিলাদের খেলাধুলোর উন্নতির জন্য যা যা দরকার তা করতে চাই।”
প্রাক্তন ক্রিকেটার সঞ্জয়ের কন্যা অনয়া জানিয়েছেন, লিঙ্গ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত সহজ ছিল না। এ জন্য অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে তাঁকে। অনয়া বলেছেন, “রূপান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়া এবং রূপান্তরিত ক্রীড়াবিদ হওয়ার পর, এ দেশের রাজনৈতিক পরিবেশের কারণে নিজেকে খুব বিচ্ছিন্ন লাগতে পারে। আপনার নিজেকে একা মনে হবে। বুঝতে পারবেন আপনার যন্ত্রণা কেউ বুঝতে চাইবে না।”
অনয়ার সংযোজন, “সকলেই আপনাকে বিভিন্ন রকম পরামর্শ দেবেন। কিন্তু আপনি বুঝতে পারবেন নিজে যে পথ বেছে নিয়েছেন সেটাই ঠিক। বুঝবেন আপনার সঙ্গে যা হচ্ছে সেটা অন্যায়। ফলে এই গোটা যাত্রাপথে আমি নিজের প্রতি বিশ্বাস রেখেছি। সেটাই আমাকে সাহায্য করেছে।”
উল্লেখ্য, আইসিসি লিঙ্গ পরিবর্তনকারীদের মহিলাদের ক্রিকেটে খেলার অনুমতি না দিলেও অস্ট্রেলিয়ায় সেই সমস্যা নেই। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া তাদের ঘরোয়া ক্রিকেটে ট্রান্সজেন্ডার এবং জেন্ডার-ডাইভার্স খেলোয়াড়দের জন্য দীর্ঘদিন ধরে একটি নীতি অনুসরণ করছে। অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া ক্রিকেটে এই ধরনের খেলোয়াড়দের খেলতে বাধা নেই। তবে তার জন্য কিছু শর্ত রয়েছে। কয়েকটি শারীরিক পরীক্ষার পরেই সেই ক্রিকেটারকে খেলার অনুমতি দেওয়া হয়।