সেই ষাটের দশক থেকে গ্যারি সোবার্সের অনুরাগী আমি। কারণ, তিনি বিশ্বের শ্রেষ্ঠ অলরাউন্ডার তখন। সকলেই জানেন, গ্যারি সোবার্সের টেস্টে শতরানের সংখ্যা ২৬। এর বাইরেও, অসম্ভব প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও তিনি আরও দু’টি সেঞ্চুরি করেছিলেন। সেগুলি ছিল বেসরকারি টেস্ট। কিন্তু প্রতিপক্ষ ছিল খুবই শক্তিশালী। তার মানে, ওঁর টেস্টে শতরানের সংখ্যা হয়ে দাঁড়ায় ২৮।
তখন ওয়েস্ট ইন্ডিজ বিশ্ব-চ্যাম্পিয়ন। ’৬৭-’৬৮ সালে ইংল্যান্ড-ওয়েস্ট ইন্ডিজ টেস্ট সিরিজ চলছে। তিনটি টেস্ট ড্র হয়েছে। চতুর্থ টেস্টের পঞ্চম দিন। সেই টেস্টও ড্র হওয়ার দিকেই চলেছে। এই সময়, সম্ভবত দলের দুই উইকেটে ৯২ রানে, সোবার্স অধিনায়ক হিসেবে ইনিংস ডিক্লেয়ার করলেন। এবং যত দূর মনে পড়ছে, ইংল্যান্ডকে ১৫০ বা ১৬৫ মিনিটে ২১৫ রান করবার একটা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন। তখন কিন্তু টি ২০, এমনকি ওয়ান ডে-ও ছিল না। ফলে, তখন দ্রুত রান করাটা একটু কঠিন। সে-সময়ে ইংল্যান্ডের ব্যাটররা, বয়কট, কাউড্রে, এডরিচ— এঁরা সব ধীর গতির ব্যাটিং-এর জন্যই বিখ্যাত ছিলেন। কিন্তু খুব আশ্চর্য ভাবে বয়কট মারমুখী হয়ে উঠলেন। এবং এক উইকেট পড়তেই, ব্যাটিং অর্ডারে আগে উঠিয়ে আনা হল উইকেট কিপার অ্যালান নট-কে। যিনি আক্রমণাত্মক ব্যাটিং-এর জন্য প্রসিদ্ধ। ইংল্যান্ড তিন উইকেটে ২১৫ রান তুলে, সেই টেস্ট তথা সিরিজ জিতে নিল। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়ে থাকা আঘাত পেল, সেই প্রথম! সঙ্গে-সঙ্গে সমালোচনার ঝড় বয়ে গেল সোবার্স-কে নিয়ে। কারণ, তিনি ইনিংস ডিক্লেয়ার না-করলে স্বাভাবিক ভাবেই খেলাটি ড্র হত, এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজ বিশ্ব চ্যাম্পিয়নই থেকে যেত। এই সমালোচনার ফলে সোবার্সের শত্রুরা মাথা চাড়া দিয়ে উঠলেন। সোবার্স এই সব সমালোচনার প্রসঙ্গে একটি ছোট উত্তর দিয়েছিলেন তখন। কুড়ি বছর পরেও, তাঁর উত্তর কোনও দিন পাল্টায়নি। সোবার্স খুবই দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসেছিলেন। অর্থোপার্জনের জন্য কৈশোরে ব্যান্ড বাজাতেন। ’৭৫ সালে প্রথম বিশ্বকাপ খেলার খুব ইচ্ছে ছিল সোবার্সের, কিন্তু তা সত্ত্বেও ’৭৩ সালেই অবসর নিতে তিনি বাধ্য হন। ’৬৭ সালের ওই ডিক্লারেশনের ২০ বছর পর, ’৮৭ সালে ইংল্যান্ডে তিনি এলে সাংবাদিকরা তাঁকে প্রশ্ন করেন, ২০ বছর আগেকার তাঁর ওই সিদ্ধান্ত যা তাঁর ক্রিকেট-জীবনকে অবনমনের দিকে নিয়ে আসে, সে-বিষয়ে তিনি আজ কী মনে করেন? সেটা কি ভুল সিদ্ধান্ত ছিল?
সোবার্স দু-দশক আগেকার মতোই শান্ত স্বরে উত্তরে বলেন, “আমি পাঁচটা ‘ড্র্যাব ড্র’ চাইনি। চেয়েছিলাম, ফলাফল হোক। অর্থাৎ খেলাটার জয় হোক। তাই হয়েছে।”
সোবার্সের এই উত্তরের ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে জীবনকে বোঝবার এক দার্শনিক মন। নিজের কোনও সিদ্ধান্ত প্রবল বিরোধিতার মুখে পড়লেও, যদি তা নিজের আদর্শকে জীবিত রাখে, তা হলে শান্ত ভাবে সেই সিদ্ধান্তে কী ভাবে অটল থাকা যায়, সেই অল্প বয়সে শিখেছিলাম সোবার্সের কাছেই। সেই সিদ্ধান্ত, প্রেমের ক্ষেত্রে। সেই সিদ্ধান্ত, কবিতা লেখার ক্ষেত্রেও। আমার সাধারণ জীবনে আমি তাঁকে প্রয়োগ করার চেষ্টা করে গেছি!
সোবার্স চলে গেলেন। কিন্তু আমার ভেতরে তাঁর সেই শিক্ষা এখনও রয়েছে, জীবন্তই।
সাক্ষাৎকার-ভিত্তিক অনুলিখন: অভিরূপ মুখোপাধ্যায়।