‘এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে…’ দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে অপরূপ সব রাস্তা! এই শীতে ঢুঁ মারাই যায়
দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে এমন অসংখ্য রাস্তা, যেখানে গাড়ি বা বাইকে যেতে যেতে প্রতি মুহূর্তে বদলে যায় দৃশ্যাবলি। রইল এমনই মনোরম সড়ক সফরের হদিস।
শীতকাল সড়ক সফরের জন্য আদর্শ সময়। কোথাও পাহাড়ের গায়ে কুয়াশার চাদর, কোথাও রোদে ঝলসানো মরুভূমি, আবার কোথাও সমুদ্রের হাওয়া। দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে এমন অসংখ্য রাস্তা, যেখানে গাড়ি বা বাইকে যেতে যেতে প্রতি মুহূর্তে বদলে যায় দৃশ্যাবলি। রইল এমনই মনোরম কিছু সড়ক সফরের হদিস।
দিল্লি থেকে মানালি: ৫৩০-৫৮০ কিমির এই পথ। পানিপত, অম্বালা, চণ্ডীগড়, বিলাসপুর, মান্ডি, কুল্লু হয়ে মানালি পৌঁছোতে পারেন দিল্লি থেকে। মসৃণ হাইওয়ে পার হয়ে যখন গাড়ি পাহাড়ের কোলে প্রবেশ করে, চারপাশের সবুজ উপত্যকা এবং পাশে বয়ে চলা বিপাশা নদীর দৃশ্য চোখ জুড়িয়ে দেয়। বন্ধুদের সঙ্গে লং ড্রাইভ হোক বা পরিবারের সঙ্গে ভ্রমণ, হাইওয়ে থেকে পাহাড়ি বাঁকের রোমাঞ্চ উপভোগ করার জন্য এটি একটি চমৎকার রোড ট্রিপ।
মুম্বই থেকে গোয়া: সমুদ্র ভালবাসেন যাঁরা, তাঁদের জন্য এই পথের জুড়ি নেই। কোঙ্কণ উপকূল ধরে এগোতে এগোতে দেখা যাবে সবুজ পাহাড়, ধানখেত, সারি সারি নারকেল গাছ আর ছোট ছোট উপকূলীয় গ্রাম। দু’টি শহরের দূরত্ব প্রায় ৫৫০-৬০০ কিমি। তুলনায় কম গরম ও মনোরম আবহাওয়ার কারণে শীতকাল এই পথের জন্য আদর্শ। তবে শুধু গন্তব্যে দ্রুত পৌঁছোনোর বদলে হাতে সময় নিয়ে চললেই এই সফরের আসল আনন্দ পাওয়া যাবে।
জয়পুর থেকে পুষ্কর: পাহাড় আর সমুদ্র ছাড়াও শীতের সফরে রয়েছে মরুভূমির আকর্ষণ। জয়পুর থেকে ১৪৩-১৪৮ কিমির এই রাস্তার দু’পাশে রয়েছে অরাবলী পর্বতমালার শুষ্ক অথচ মনোরম দৃশ্য। পুষ্করে পৌঁছে হ্রদের ঘাট, রঙিন বাজার, ছোট ক্যাফে আর সূর্যাস্ত উপভোগ করতে পারেন। শীতের মনোরম আবহাওয়ায় রাজস্থানের এই পথ ধরে সফর বেশ আরামদায়ক।
বেঙ্গালুরু থেকে কুর্গ: বেঙ্গালুরু থেকে কুর্গের দূরত্ব ২৫০-২৭০ কিমি। কফির গন্ধে মোড়া পাহাড়ি জনপদ, কুয়াশায় ঢাকা রাস্তা আর সবুজ বনভূমি, গাড়িতে চেপে এই পথ উপভোগ করার সুযোগ হাতছাড়া করা উচিত নয়। বেঙ্গালুরু থেকে মাইসুরু হয়ে কুর্গের দিকে এগোলে শহরের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। পৌঁছে কফি বাগান ঘুরে দেখা, প্রকৃতির কোলে সময় কাটানো বা পাহাড়ি পথে হাঁটার সুযোগ রয়েছে। শীতের নরম রোদে এই সফর বিশেষ ভাবে উপভোগ্য।
আরও পড়ুন:
চেন্নাই থেকে পুদুচেরি: প্রায় ১৫০ কিমি দূরত্ব অনায়াসে গাড়িতে চেপে পার করা যায়। কিন্তু তাতে মনে হবে, এই পথ যেন শেষই না হয়! ইস্ট কোস্ট রোড ধরে বঙ্গোপসাগরের পাশ দিয়ে যেতে যেতে চোখ জুড়োনো দৃশ্য নজরে আসবে। উপকূল ধরে চলা এই মসৃণ মহাসড়কে রয়েছে সমুদ্রের দৃশ্য, অপূর্ব কিছু সৈকত এবং যাত্রার শেষে অপেক্ষা করে আছে আকর্ষণীয় ফরাসি ঔপনিবেশিক স্থাপত্য।
গুয়াহাটি থেকে শিলং: উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ি সৌন্দর্য উপভোগ করতে চাইলে গুয়াহাটি থেকে শিলংয়ের প্রায় ১০০ কিমি পথ বেছে নিন। রাস্তার দু’পাশে পাইন গাছ, পাহাড়ি বাঁক আর মেঘের আনাগোনা এই সফরকে করে তোলে উপভোগ্য। মাঝে উমিয়াম হ্রদ, নংপো শহর, নেহরু পার্ক, মারাই গুহা ইত্যাদিও দেখে নেওয়া যায়। শিলংয়ে পৌঁছে হ্রদ, ক্যাফে, স্থানীয় খাবার উপভোগ করতে পারেন। শীতকালে আকাশ পরিষ্কার থাকলে চারপাশের দৃশ্য আরও প্রাণজুড়োনো হয়ে ওঠে।
অহমদাবাদ থেকে কচ্ছের রণ: মরুভূমির বুক চিরে চলে যাওয়া এই পথটি আপনাকে নিয়ে যাবে শুভ্র লবণের চাদরে ঢাকা এক দিগন্তবিস্তৃত অপূর্ব ল্যান্ডস্কেপে। শীতের সময়ে গেলে উপভোগ করতে পারবেন মরুভূমির শীতল রাতের আমেজ, সেখানকার দারুণ সব লোকশিল্প এবং পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় পুরো এলাকার এক মায়াবী রূপ।
দিল্লি থেকে মসুরী: দিল্লির ব্যস্ততা পেরিয়ে উত্তরাখণ্ডের পাহাড়ি পথে পৌঁছে যান মসুরীতে। দেরাদুন থেকে পাহাড়ের দিকে উঠতে উঠতে চোখে পড়বে পাইন গাছের সারি, উপত্যকা আর মেঘে ঢাকা পাহাড়। ল্যান্ডোরের পুরনো রাস্তা, ছোট ক্যাফে আর মসুরীর সূর্যাস্ত শীতের ছুটিকে করে তুলতে পারে আরও মায়াময়। যাঁরা খুব বেশি দুর্গম পথে যেতে চান না, তাঁদের জন্যও এটি ভাল বিকল্প। ২৭০-৩০০ কিমি রাস্তা যেতে সময় লাগে ৫ থেকে সাড়ে ৭ ঘণ্টা।
আরও পড়ুন:
বেঙ্গালুরু থেকে উটি: চা-বাগান, কুয়াশায় ঢাকা পাহাড় আর আঁকাবাঁকা রাস্তা, নীলগিরির পথে এই সফর প্রকৃতিপ্রেমীদের মন জয় করবে। বেঙ্গালুরু থেকে উটির দিকে এগোলে পথের দৃশ্য ধীরে ধীরে বদলে যায়। সেখানে চা-বাগান, পাহাড়ি দৃশ্য আর নিরিবিলি পরিবেশ উপভোগ করা যায়। তবে পাহাড়ি পথে বাঁক বেশি থাকায় সাবধানে গাড়ি চালানো জরুরি। পথের বিস্তৃতি ২৭০-২৮০ কিমি।
কলকাতা থেকে আমলাশোল: কলকাতা থেকে ঘণ্টা ছয়-সাতেক পাড়ি দিলেই পৌঁছে যাওয়া যায় এমন এক গন্তব্যে, যেখানে রূপ উজাড় করে দিয়েছে প্রকৃতি। ঘন সবুজের বুক চিরে চলে গিয়েছে কালো পিচের মসৃণ রাস্তা। সুযোগসুবিধা বাড়লেও, এখনও শহুরে জীবনের সম্পূর্ণ ছাপ পড়েনি ঝাড়গ্রাম জেলার বেলপাহাড়ির এই গ্রামটিতে। যেতে যেতে পথে মিলবে অরণ্য, পাহাড়, ছোট ছোট গ্রাম। ঘাটশিলা হয়ে যেমন যাওয়া যায়, তেমনই লোধাশুলি, ঝাড়গ্রাম, বেলপাহাড়ি হয়েও সেখানে যেতে পারেন।
কলকাতা থেকে পুরী: বাঙালির শীতের বেড়ানোর তালিকায় পুরীর নাম থাকবে না, তা কি হয়? কলকাতা থেকে গাড়ি নিয়ে পুরীর পথে বেরিয়ে পড়লে শহরের কোলাহল ছেড়ে ধীরে ধীরে পৌঁছে যাবেন ওড়িশার উপকূলীয় পরিবেশে। পুরীতে সমুদ্রসৈকত, জগন্নাথ মন্দির ও স্থানীয় খাবারের আকর্ষণ তো রয়েছেই। হাতে সময় থাকলে কোনার্ক সূর্যমন্দিরও ঘুরে আসতে পারেন। পথ দীর্ঘ হওয়ায় মাঝপথে বিশ্রাম নিয়ে, দিনের আলো থাকতে থাকতে গন্তব্যে পৌঁছোনোর পরিকল্পনা করুন।
সড়ক সফরের আনন্দ বজায় রাখতে গাড়ির অবস্থা, জ্বালানি, টায়ার, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং আবহাওয়ার পূর্বাভাস আগে থেকেই দেখে নিন। পাহাড়ি পথে তুষারপাত, কুয়াশা বা বরফ জমার কারণে রাস্তা বন্ধ হতে পারে। কোথাও বা রাস্তা সারাইয়ের কাজ চলতে পারে। তাই যাত্রার ঠিক আগে স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশ ও রাস্তার পরিস্থিতি যাচাই করুন।
একটানা দীর্ঘক্ষণ গাড়ি না চালিয়ে যথেষ্ট বিরতি নিন। আর সবচেয়ে জরুরি, গন্তব্যে দ্রুত পৌঁছোনোর তাড়ায় সফরের আনন্দ নষ্ট করবেন না। কারণ, কখনও কখনও বেড়ানোর সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি গন্তব্যে নয়, মাঝপথের কোনও অচেনা বাঁকেই লুকিয়ে থাকে।
তবে অবশ্যই অভিজ্ঞ চালকের সঙ্গেই যাওয়া উচিত এই রাস্তাগুলিতে। এই তালিকার কোথাও পাহাড়ি বাঁক, কোথাও মরুভূমির উঁচু-নিচু পথ, কোথাও আবার গ্রামের পথও পড়তে পারে রাস্তায়। তাই পথের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য পাকা হাতের চালক সঙ্গে থাকলেই ভাল।