ইট-পাথরে ধ্বনিত হয় আর্তনাদ, মনে করায় গণহত্যার অভিশপ্ত অধ্যায়, দেশের যে জায়গাগুলির ইতিহাস কলঙ্কিত
প্রকৃতির টানে ভ্রমণ নয়। সমুদ্রসৈকতের বিলাসিতাও নয়। ইতিহাসের টানে আজও অনেকে পা রাখেন সেই সব স্থানে, যেখানে কখনও ঘটেছিল নৃশংস কোনও ঘটনা। যেখানে আজও ইট-পাথরে ধ্বনিত হয় বহু মানুষের আর্তনাদের শব্দ। ইতিহাসের কলঙ্কিত অধ্যায়ের খোঁজ দেয় ‘ডার্ক ট্যুরিজ়ম’।
দেশের মানচিত্রে এমন কিছু জায়গার নাম আছে, যেখানে আজও ভ্রমণপিপাসুরা ছুটে যান ইতিহাসের টানে। যে ইতিহাস কোনও সুখস্মৃতি বহন করে না, বরং কলঙ্কিত অধ্যায় রূপে রয়ে গিয়েছে। বর্বরতা, বিশ্বাসঘাতকতা এবং রক্তক্ষরণের ইতিহাস যার প্রতি পদক্ষেপে। আজও যেখানকার ইট-পাথরে প্রতিধ্বনিত হয় বহু নিরপরাধের আর্তনাদের শব্দ। অতীতের ধ্বংসলীলার স্মৃতিচারণ করতে সেই জায়গাগুলি ফিরে দেখা যাক।
জালিয়ানওয়ালাবাগ: নারকীয় হত্যাকাণ্ডের সাক্ষ্য বহন করছে। ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল পঞ্জাবের অমৃতসরে জালিয়ানওয়ালাবাগের একটি ঘেরা বাগানে বৈশাখী উৎসব ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশে যোগ দেওয়া হাজার হাজার নিরস্ত্র ভারতীয়ের ওপর ব্রিটিশ কর্নেল রেজিনাল্ড ডায়ারের নির্দেশে নির্মম ভাবে নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। শত শত মানুষ নিহত হন, আহত হন সহস্রাধিক।
প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত উদ্যানটি দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে এবং এখানে প্রবেশ করতে কোনও টিকিট কাটতে হয় না। আজও এখানে গেলে দেওয়ালের গায়ে ব্রিটিশ সেনাদের গুলির দাগ স্পষ্ট দেখা যায়। সন্ধ্যার সময়ে আলো ও ধ্বনির মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের ইতিহাস ফুটিয়ে তোলা হয়।
মুঙ্গের ফোর্ট: মীরকাসিমের রাজধানী এবং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু বলা যায়। বাংলা-বিহার-ওড়িশার নবাব মীরকাসিম ব্রিটিশদের আধিপত্য মেনে নিতে পারেননি। তিনি মুর্শিদাবাদ থেকে রাজধানী মুঙ্গেরে সরিয়ে আনেন এবং ব্রিটিশদের সঙ্গে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হন। এই মুঙ্গের ফোর্ট বা মুঙ্গের দুর্গের ইতিহাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র এবং ক্ষমতা দখলের নৃশংসতায় ভরপুর। পলাশির পর এই দুর্গ ব্রিটিশ ও নবাবের বাহিনীর মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সাক্ষী। কথিত আছে, ব্রিটিশ সেনা দুর্গ দখলের পর নবাবের অনুগত সৈন্য এবং অস্ত্র তৈরির কারিগরদের উপর চরম অত্যাচার চালিয়েছিল।
এখানে গেলে প্রাচীন দুর্গের ধ্বংসাবশেষ, কাসিমবাজারের সুড়ঙ্গপথ এবং নবাবের আমলের বন্দুক কারখানাটি দেখা যাবে।
আরও পড়ুন:
সেলুলার জেল: স্বাধীনতা সংগ্রামীদের জন্য ব্রিটিশদের তৈরি ‘কালাপানি’ বা নরককুণ্ড। ১৮৯৬ থেকে ১৯০৬ সালের মধ্যে নির্মিত এই জেলটি ছিল ব্রিটিশ শাসনের বর্বরতার প্রতীক। সিপাহি বিদ্রোহের সময়ে এখানে দ্বীপান্তরে পাঠানো হত বন্দিদের। পরে ব্রিটিশ শাসক সেই ধারা বজায় রেখেছিল স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ক্ষেত্রেও। বটুকেশ্বর দত্ত, বিনায়ক দামোদর সাভারকর (বীর সাভারকর), উল্লাসকর দত্ত, বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, শচীন্দ্রনাথ সান্যালের মতো স্বাধীনতা সংগ্রামীরা অকথ্য অত্যাচারের শিকার হয়েছেন এখানে। নির্মম নির্যাতন সইতে না পেরে অনেক বন্দিরই মৃত্যু হত, কেউ পাগল হয়ে যেতেন আবার কেউ বেছে নিতেন আত্মহননের পথ।
আজও এখানে গেলে দেখা যাবে জেলের বিশাল চত্বর, ফাঁসির মঞ্চ, নির্জন কুঠুরি এবং শহিদদের স্মরণে জাতীয় স্মৃতিসৌধ। ১৯৬৩ সালে কারাগারের একাংশে তৈরি হয় গোবিন্দ বল্লভ পন্থ হাসপাতাল। বর্তমানে এটি ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট একটি হাসপাতাল।
আগরা ফোর্ট: মোগল সাম্রাজ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য। ১৫৬৫ থেকে ১৫৭৩ সালের মধ্যে মোগল সম্রাট আকবর এটি পুনর্নির্মাণ করেন। ১৯৮৩ সালে ইউনেস্কো একে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ঘোষণা করে। কিন্তু এখানেই একসময়ে পারিবারিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিলেন সম্রাট শাহজাহান। সন্তান ঔরঙ্গজ়েব জীবনের শেষ আট বছর তাঁকে বন্দি করে রাখেন এখানে। বলা হয়, এখান থেকে তাজমহলের দিকে তাকিয়েই যন্ত্রণাময় শেষ দিনগুলি কাটান শাহজাহান।
এখানে গেলে প্রথমেই দেখতে হবে জহাঙ্গির মহল। দেখার মতো সুন্দর দেওয়ান-ই-আম রয়েছে তার পরেই। ৪০ পিলারের উঁচু দরবারে অতি সুন্দর সিংহাসনে শাহজাহান বসতেন প্রজাদের মাঝে। বহুমূল্য ময়ূর সিংহাসন ছিল এখানেই। পরে যেটি লুট করেন নাদির শাহ। বেগমদের স্নানের জায়গা শিশমহল রয়েছে অঙ্গনে। সম্রাটের বিশ্রামঘর খাসমহল, মচ্ছি ভবন, নাগিনা মসজিদ, মোতি মসজিদ— সবই রাজকীয় আভিজাত্য আর কারুকার্যে মোড়া।
আরও পড়ুন:
চিতৌড় দুর্গ: মেবারের রাজপুত রাজাদের প্রাচীন রাজধানী ও বীরত্বের প্রতীক। ৭০০ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত এই দুর্গ রানি পদ্মিনীর জহর ব্রত পালনের সাক্ষ্য বহন করছে। ইতিহাসে তিন বার এই দুর্গ আক্রান্ত হয়েছে এবং প্রতি বারই রাজপুত নারীরা পরাজয় নিশ্চিত জেনে নিজেদের সম্মানরক্ষার্থে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন। ১৩০৩ সালে যখন আলাউদ্দিন খিলজি দুর্গ আক্রমণ করেন, রানী পদ্মিনী এবং ১৬ হাজার রাজপুত রমণী জহর কুণ্ডে প্রাণ বিসর্জন দেন বলে কথিত।
পদ্মিনী মহল, জহর কুণ্ড দেখলে গায়ে কাঁটা দেবে। মহারানা কুম্ভের প্রতিষ্ঠা করা বিজয় স্তম্ভ, মীরা মন্দির, রানা কুম্ভ প্রাসাদও রয়েছে এখানে।
লখনউয়ের রেসিডেন্সি: ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের সবচেয়ে দীর্ঘ এবং রক্তক্ষয়ী অবরোধের স্থান। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ বা ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এটি দীর্ঘ অবরোধের সাক্ষী হয়। টানা কয়েক মাস ধরে ভারতীয় সিপাহিরা রেসিডেন্সি অবরোধ করে রাখেন এবং অনবরত গোলাবর্ষণ করেন। এই দীর্ঘ সময়ে খাবার ও ওষুধের অভাবে, রোগে এবং গোলার আঘাতে শত শত নারী, শিশু এবং সেনার মৃত্যু ঘটে। ব্রিটিশরা পরে অবরোধমুক্ত করলেও, এখানকার ধ্বংসাবশেষ সেই ভয়াল দিনের কথা মনে করিয়ে দেয়।
এখানে গেলে আজও দেখা যাবে কামানের গোলার আঘাতে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া রেসিডেন্সির ভবনগুলির ধ্বংসাবশেষ, জাদুঘর এবং নিহত ব্রিটিশদের কবরস্থান।
পলাশির প্রান্তর: ভারতের দাসত্বের সূচনালগ্ন এবং বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস লেখা আছে এখানে। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশির আমবাগানে বাংলার নবাব সিরাজউদৌল্লা, ইংরেজ ইস্ট কোম্পানির গভর্নর ক্লাইভের মুখোমুখি হয়েছিলেন। নবাবের প্রধান সেনাপতি মীরজ়াফর ব্রিটিশদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে যুদ্ধের ময়দানে নবাবের মূল বাহিনীকে নিষ্ক্রিয় করে রাখেন। মাত্র ৩০০০ ব্রিটিশ সৈন্যের কাছে নবাবের ৫০ হাজার সেনার বিশাল বাহিনী হেরে যায়। পরে নবাবকে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়।
ইতিহাসকে ধরে রাখার জন্য ‘ঐতিহাসিক স্থান’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে আগেই। পলাশির প্রান্তরে আজও দাঁড়িয়ে আছেন সিরাজ, রয়েছেন তাঁর সেনাপতি মীরমদন আর মোহনলাল। যুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ ও রণক্ষেত্র দেখতেই পর্যটকেরা যান সেখানে।
নানাসাহেব বা সতীচৌরা ঘাট: ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের সময়ে কানপুরে নানাসাহেবের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহীরা ব্রিটিশ ছাউনি অবরোধ করে। গঙ্গার এই ঘাটে ব্রিটিশ সেনাসদস্য ও তাঁদের পরিবারকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সতীচৌরা ঘাটে নৌকার ব্যবস্থা করেন নানাসাহেব। কিন্তু বিশৃঙ্খলায় ও বিদ্রোহীদের আচমকা আক্রমণে বহু ব্রিটিশ পুরুষ, নারী ও শিশুর প্রাণহানি হয়।
শোনা যায়, ১৮৫৭ সালের ২৭ জুন এই ঘাটে প্রায় ৩০০ জন ব্রিটিশ পুরুষ, নারী ও শিশুকে হত্যা করা হয়েছিল। এর পর ব্রিটিশরা এই জায়গার নাম দেয় ‘ম্যাসাকার ঘাট’। এই ‘কানপুর হত্যাকাণ্ড’ ব্রিটিশদের এতটাই ক্ষুব্ধ করেছিল যে, তারা পরে কানপুর পুনর্দখল করে ভারতীয়দের উপর অবর্ণনীয় অত্যাচার চালিয়েছিল।
ভেলোর ফোর্ট: তামিলনাড়ুর ভেলোরে এই দুর্গ নির্মিত হয়েছিল ১৬ শতকে। বিজয়নগর সাম্রাজ্যের অধীনস্থ সেনাপতি চিন্না বোম্মি নায়ক ও থিম্পা রেড্ডি তৈরি করিয়েছিলেন এই দুর্গ। ১৮০৬ সালের ১০ জুলাই এই দুর্গের ভিতরেই ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন ভারতের সিপাহিরা। কয়েক জন ব্রিটিশ অফিসারকে হত্যা করাও হয়েছিল। কিন্তু ব্রিটিশ বাহিনী দ্রুত এই বিদ্রোহ দমন করার জন্য প্রায় ৬০০ ভারতীয় সিপাহীকে নির্মম ভাবে গুলি করে ও কামানের গোলার মুখে দাঁড় করিয়ে হত্যা করেছিল।
ভেলোর দুর্গ আজও সেই নৃশংস ভেলোর বিদ্রোহের স্মৃতি বহন করছে। দুর্গের ভিতরে মন্দির, মসজিদ ও জাদুঘরও রয়েছে।
বিজাপুর দুর্গ: আদিলশাহি রাজবংশের ক্ষমতার কেন্দ্র, যা নিষ্ঠুর শাস্তি ও যুদ্ধের সাক্ষী। কথিত আছে, গোল গোম্বুজ নির্মাণের জন্য হাজার হাজার শ্রমিককে বছরের পর বছর ধরে অমানুষিক ভাবে খাটানো হয়েছিল। আদিলশাহি সুলতানেরা তাঁদের শত্রুদের এবং বিদ্রোহ করা প্রজাদের অত্যন্ত নিষ্ঠুর শাস্তি দিতেন এখানে। দুর্গের অন্ধকূপে বন্দি করে রাখা এবং হাতি দিয়ে পিষে মারার মতো ঘটনাও ঘটত এখানে।
বিজাপুর দুর্গ বর্তমানে ঐতিহাসিক স্থান হিসাবে ঘোষিত। বিশাল আকৃতির কামান মালিক-ই-মৈদান, গগন মহল, মেহতাব মহল এবং এর কাছাকাছি অবস্থিত গোল গোম্বুজ দেখতে অনেক পর্যটকই যান সেখানে।
গ্বালিয়র ফোর্ট: মধ্যপ্রদেশের গ্বালিয়রে দেশের অন্যতম প্রাচীন ও দুর্ভেদ্য পাহাড়ি দুর্গ। ষষ্ঠ বা অষ্টম শতাব্দীতে রাজা সূর্য সেন (সুরজ সেন) এটি নির্মাণ করেন বলে কথিত আছে। বহু শতাব্দী ধরে দুর্গটি গুর্জর-প্রতিহার, তোমর, লোদী, মোগল, মরাঠা (শিন্দে) এবং ইংরেজদের নিয়ন্ত্রণে থেকেছে।
মোগল যুগে, বিশেষ করে সম্রাট আকবর ও ঔরঙ্গজ়েবের সময়ে, এই দুর্গটিকে একটি সুরক্ষিত রাজনৈতিক কারাগার হিসেবে ব্যবহার করা হত। শোনা যায়, বন্দিদের ভূগর্ভস্থ কক্ষে বন্ধ করে রেখে বিষপ্রয়োগে হত্যা করা হত। এমনও কথিত আছে, ঔরঙ্গজ়েব তাঁর নিজের ভাই মুরাদ এবং ভাইপো সুলেমান শিকোহ্কে (দারা শিকোহ্র পুত্র) এই দুর্গেই বন্দি করে মৃত্যুদণ্ড দেন।
গোলকোন্ডা দুর্গ: হায়দরাবাদের গোলকোন্ডা দুর্গের ইতিহাসে সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়টি ঘটেছিল ১৬৮৭ সালে। মোগল সম্রাট ঔরঙ্গজ়েব গোলকোন্ডার কুতুবশাহি বংশের শেষ সুলতান আবুল হাসান কুতুব শাহকে পরাস্ত করতে প্রায় ৮ মাস ধরে দুর্গটি অবরুদ্ধ করে রাখেন। এই দীর্ঘ ৮ মাসের অবরোধের ফলে দুর্গের ভিতরে থাকা হাজার হাজার সেনা ও সাধারণ মানুষ খাদ্যাভাব, প্লেগ ও অন্যান্য মহামারিতে ধুঁকতে ধুঁকতে মারা যায়। শোনা যায়, দুর্গের ভিতরে কঙ্কালসার মৃতদেহের স্তুপ জমে গিয়েছিল।
কথিত আছে, দুর্গেরই এক লোভী সেনাপতি আবদুল্লাহ্ খানকে বিপুল সম্পত্তির লোভ দেখিয়েছিলেন মোগল সম্রাট। বিশ্বাসঘাতক সেনাপতি দুর্গেরই একটি গোপন ফটক খুলে দেন। রাতে হাজার হাজার মোগল সেনা দুর্গে ঢুকে নির্বিচারে হত্যালীলা চালায়। প্রতিরক্ষারত অগণিত কুতুবশাহি সেনা ও সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হয়। এই দুর্গের ইট-পাথর থেকে নাকি আজও সেই সব মানুষজনের আর্ত চিৎকার ভেসে আসে।