সিংহবাহিনীর বাহনের সন্ধানে কোথায় যাওয়া যায় দেশের মধ্যে? কী ভাবে দেখা মেলে ‘জঙ্গলের রাজা’র
জঙ্গলের রাজা সিংহ। সিংহ মা দুর্গার বাহনও। কিন্তু সিংহ থাকে কোথায়? শুধুই কি আফ্রিকায়? ভারতে সিংহ দেখতে গেলে কোথায় যাবেন?
ফেলুদা: ‘‘ক্যাপ্টেন স্পার্কের মতো একজন লোক থাকতে বাড়ি থেকে গণেশটা চুরি হয়ে গেল, এটা কেমন হল? এটা কি ভাল হল?’’ রুকু: ‘‘ওটা একজন রাজার কাছে আছে।’’ ফেলুদা: ‘‘কোথাকার রাজা?’’ রুকু: ‘‘আফ্রিকার।’’
সাহিত্য-সিনেমাপ্রেমী বাঙালির জীবনে এই সংলাপ মোটেই অচেনা নয়। বরং কোথাও যেন আফ্রিকার জঙ্গলের রাজা, ফেলুদা, বাঙালির উৎসব মিলেমিশে যায়। ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’-এর মতো সত্যজিৎ রায়ের কিছু সিনেমার সঙ্গে জড়িয়ে যায় দুর্গাপুজোও। মা দুর্গা সিংহবাহিনী। এই পুজোর অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ তাই সিংহও।
‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ ছবিতে গোয়েন্দা ফেলুদা কিন্তু বুঝতে পেরেছিল, তাকে যে বিশেষ গণেশ উদ্ধারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তা বাড়ির ছোট্ট ছেলে রুকু, তার ঠাকুরদাদার কথাতেই চিউইংগাম দিয়ে আটকে রেখেছিল মা দুর্গার বাহন সিংহের বিশাল হাঁয়ের মধ্যে। কী ভাবে সেই গণেশ উদ্ধার হল, তা রোমাঞ্চকর।
জঙ্গলের রাজা সিংহ। সিংহ মা দুর্গার বাহনও। কিন্তু সিংহ থাকে কোথায়? শুধুই কি আফ্রিকায়? ছোটরা অবশ্য বলতে পারে চিড়িয়াখানায়। তবে চিড়িয়াখানা তাদের ঘর নয়। ভারতে আফ্রিকার মতো তাগড়াই সিংহ না হলেও, দেখা মেলে এশিয়াটিক লায়নের। যাবেন না কি তাদের ডেরায়?
গুজরাতের সৌরাষ্ট্র অঞ্চলের বেশ কয়েকটি স্থানে সিংহের দেখা মেলে। তার মধ্যে অন্যতম গীর জাতীয় উদ্যান। ১৪১০ বর্গকিলোমিটার জুড়ে এই অরণ্যের বিস্তৃতি। তার মধ্যে ২৫৮ বর্গকিলোমিটার অঞ্চল গহীন বন। চিঙ্কারা, চিতাবাঘ, চিতল, নীলগাই, হরেক প্রজাতির পাখির পাশাপাশি এই স্থান সিংহেরও বিচরণক্ষেত্র।
আরও পড়ুন:
জানা যায়, প্রায় ৫৫,০০০ বছর আগে আফ্রিকান এবং এশীয় সিংহ আলাদা হয়ে যায় এবং তার পর তারা দু'টি ভিন্ন উপ-প্রজাতিতে বিভক্ত হয়। একসময় এশীয় সিংহ উত্তর আফ্রিকা, পশ্চিম এশিয়া এবং ভারতের এক বিশাল অংশ জুড়ে বাস করত। সিন্ধু নদ থেকে শুরু করে মধ্য ভারত পর্যন্ত এদের অবাধ বিচরণ ছিল। একসময় ভারতীয় রাজন্য এবং ব্রিটিশদের শিকারের শখপূরণে অসংখ্য সিংহের প্রাণ যায়। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে গির অরণ্য ছাড়া ভারতের প্রায় সমস্ত বিচরণক্ষেত্র থেকে সিংহ একপ্রকার বিলুপ্ত হয়ে যায়।
গীর অরণ্যে সিংহ টিকে যাওয়ার পিছনে ছিল তৎকালীন নবাবের ভূমিকা। সিংহের সংখ্যা যখন প্রায় লুপ্ত হতে বসেছে, তখন জুনাগড়ের তৎকালীন নবাব সিংহ শিকারের উপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। অবলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পায় সিংহ। ১৯৬৫ সালে সিংহ সংরক্ষণ এবং সংখ্যাবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে গির জাতীয় উদ্যান এবং অভয়ারণ্য প্রতিষ্ঠা হয়।
গীর জাতীয় উদ্যান-এর সাইট থেকে প্রাপ্ত তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের সিংহসুমারি অনুযায়ী সমগ্র সৌরাষ্ট্রের বনভূমি এলাকায় সিংহের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৯১।
খোলা অরণ্যে সিংহদর্শনের জন্য গীর জাতীয় উদ্যানই জনপ্রিয়। তবে শুধু এই জাতীয় উদ্যান নয়, সৌরাষ্ট্রের নানা স্থানে সিংহের থাকার প্রমাণ মিলেছে। বরডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, জেতপুর সংলগ্ন অঞ্চল, ভাবনগর উপকূলীয় অঞ্চল, বাবরা-জসদন সন্নিহিত এলাকা-সহ আরও একাধিক জায়গায় সিংহের দেখা পাওয়া যায়।
আরও পড়ুন:
সিংহ দেখতে তাই শুধু গীর নয়, যেতে পারেন অন্য স্থানেও। গুজরাতের সৌরাষ্ট্র অঞ্চলের পোরবন্দর উপকূল থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে বরডা পাহাড়ে রয়েছে বরডা অভয়ারণ্য। ১৯২.৩১ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে তার বিস্তৃতি। ২০২৫ সালের সিংহগণনার তথ্য বলছে, এই অরণ্যে ১৭টি সিংহ রয়েছে, তার মধ্যে ৯টি শাবক।
বর়ডা অভয়ারণ্যে ২০২৪ সাল থেকে জিপ সাফারি চালু হয়েছে। সকাল পৌনে ৭টা থেকে পৌনে ১০টা এবং বিকালে ৩টে থেকে ৫টা দিনে দু’বার জঙ্গল সাফারি হয়। বর্ষায় অর্থাৎ জুন-সেপ্টেম্বর জঙ্গল বন্ধ থাকে। তবে বছরের বাকি সময় অরণ্যে প্রবেশের অনুমতি মেলে। শুধু সিংহ নয়, অসংখ্য বন্যপ্রাণের আবাস্থলটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও যথেষ্ট।
গীরের জঙ্গল সাফারি বেশি জনপ্রিয়। বিশেষ ভাবে সংরক্ষিত এলাকা পরিচিত ‘কোর এরিয়া’ নামে, বাকিটা বাফার এরিয়া। সিংহদর্শনে সাফারির ব্যবস্থা কোর এরিয়াতেই। আর তার বুকিং শুরু হয়ে যায় মাস দুই-তিন আগে থেকেই। একটি জিপ অথবা জিপসিতে ছ’জনের বসার ব্যবস্থা।
জঙ্গল সাফারি করলেই যে সিংহের দেখা মিলবে, তার কোনও স্থিরতা নেই। জাতীয় উদ্যানে ঘুরে সিংহদর্শন আর চিড়িয়াখানায় বা আবদ্ধ এলাকায় সিংহ দেখার মধ্যে তফাত অনেক। তবে বরাত ভাল থাকলে চিতাবাঘ থেকে সিংহ— অনেক কিছুরই দেখা মিলতে পারে। চিঙ্কারা, চিতল তো আছেই। আসলে অরণ্যভ্রমণ করতে গেলে, প্রকৃতি উপভোগের মানসিকতা থাকা দরকার।
সকাল সাড়ে ৬টা থেকে সাড়ে ৯টা, সাড়ে ৯টা থেকে সাড়ে ১২টা— দু’ দফায় কোর এরিয়ায় সাফারি হয়। বিকেলে সাফারি শুরু হয় ৩টে থেকে। ঘোরানো হয় ৬টা পর্যন্ত। ছ’জনের জিপে ভারতীয়দের জন্য খরচ পড়ে ৬ হাজার ৫০০ টাকা। সোমনাথ থেকে গীরের দূরত্ব ৬০ কিলোমিটার। জুনাগড় থেকে দূরত্ব ২০৬ কিলোমিটার। অহমদাবাদ থেকে গীরের দূরত্ব ৩২৭ কিলোমিটার।
দেবলিয়া পার্ক: সাসণ গ্রাম থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে দেবলিয়া পার্ক। এখানে চিতাবাঘ এবং সিংহদর্শনের সুযোগ অনেকটাই বেশি। ৪১২ হেক্টর জায়গায় রয়েছে সিংহ, চিতাবাঘ এবং অন্যান্য প্রাণী। অরণ্যভ্রমণের শখ এখানে মিটবে না বটে, সিংহদর্শন হবেই, তা বলা চলে। বিস্তীর্ণ এলাকা বেড় দিয়ে ঘিরে বন্যপ্রাণ রাখা হয়েছে এখানে। তবে তারা খাঁচাবন্দি মোটেই নয়। জিপসি এবং ছোট বাস এখানে পর্যটকদের ঘোরানোর জন্য রাখা থাকে। সময় লাগে ঘণ্টাখানেক।
জুন থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেবলিয়া পার্কে দিনে সাত বার সাফারি হয়। সকাল ৭টা, ৮টা, ৯টা এবং ১০টা, তার পর দুপুর ৩টে, বিকাল ৪টে এবং ৫টায়। ছ’জনের জিপ সাফারির খরচ ২৫০০ টাকা। এর সঙ্গে যোগ হয় পারমিট চার্জ এবং গাইডের টাকা। প্রতি বুধবার দেবলিয়ায় সাফারি বন্ধ থাকে।