কোথাও ঝুলন্ত স্তম্ভ, কোথাও ১৩ তলা জ্যামিতিক সিঁড়ি, দেশেই আছে এমন ‘অদ্ভুত’ কিছু ঐতিহ্যবাহী স্থান
ভারতের নানা প্রান্তে এমন অসংখ্য ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন (হেরিটেজ সাইট) রয়েছে, যেগুলি প্রচারের আলোকে সেই ভাবে না এলেও, স্থাপত্যকলার দিক থেকে বিস্ময়কর। ঘুরে আসতে পারেন চেনা, না-চেনা এমন ৭ জায়গা থেকে।
ভারতীয় ঐতিহ্য এবং নির্মাণশৈলীর ইতিহাস শুধু আগরার তাজমহল বা দিল্লির লালকেল্লায় বন্দি নয়। পরিচিত পর্যটন মানচিত্রের বাইরে, দেশের প্রত্যন্ত স্থলে ছড়িয়ে রয়েছে এমন কিছু নিদর্শন, যা অনন্য নির্মাণশৈলীর জন্য আজও গবেষক ও পর্যটকদের বিস্মিত করে।
ভারতের নানা প্রান্তে এমন অসংখ্য ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন (হেরিটেজ সাইট) রয়েছে, যেগুলি প্রচারের আলোকে সেই ভাবে না এলেও, স্থাপত্যকলার দিক থেকে বিস্ময়কর।
কোথাও ঘন অরণ্যের ভেতর শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে পাথরে খোদাই করা ভাস্কর্য, কোথাও বা পাথরের সুবিশাল থাম মাটি স্পর্শ না করেই শূন্যে ঝুলে রয়েছে স্থাপত্য এবং গণিতের জটিল সমীকরণে।
কোনও অঞ্চলে মরুভূমির জলকষ্ট রুখতে তৈরি হয়েছে তেরো তলার নিখুঁত জ্যামিতিক সোপানপথ, যা কেবল জল সংরক্ষণের আধার নয়, স্থাপত্যবিদ্যার এক চিত্তাকর্ষক নিদর্শন।
যাঁরা ইতিহাসের শিকড় অনুসন্ধান করতে চান এবং এমন স্থাপত্য ক্যামেরাবন্দি করতে চান, তাঁদের কাছে ভারতের ৭ স্থান হয়ে উঠতে পারে অন্যতম বিস্ময়।
আরও পড়ুন:
ঊনকোটি (ত্রিপুরা): পাহাড়ের খাঁজে ঘুমিয়ে থাকা প্রায় কোটি দেবতার মুখ, যেন বিস্ময়! ঘন সবুজ পাহাড়, বয়ে চলেছে ঝরনা। তার মাঝেই পাথুরে খাড়া দেওয়ালের গায়ে খোদাই করা রয়েছে একের পর এক দেব-দেবীর মুখ। নজর কাড়ে প্রায় ৩০ ফুট উঁচু কালভৈরবের পাথুরে মুখাবয়ব।
লোকগাথা বলে, কাশী যাওয়ার পথে এক কোটি দেব-দেবীকে নিয়ে এখানে এক রাত বিশ্রাম নিয়েছিলেন শিবঠাকুর। সকালে বাকিরা ঘুম থেকে না-ওঠায় তিনি একাই চলে যান, আর বাকিরা পাথরের মূর্তি হয়ে থেকে যান। এক কোটির চেয়ে একটি কম, অর্থাৎ ঊনকোটি (৯৯,৯৯,৯৯৯টি)। ত্রিপুরার ঊনকোটি জেলার স্থলটি ঘোরার সেরা সময় অক্টোবর থেকে মার্চ। কুমারঘাট স্টেশন থেকে দূরত্ব মাত্র ২০ কিলোমিটার।
বটেশ্বরের মন্দির, মধ্যপ্রদেশ: মধ্যপ্রদেশের গ্বালিয়র থেকে উত্তর দিকে চম্বলের দিকে এগোলেই পাহাড়ি ঢালে চোখে পড়বে হলুদ বেলেপাথরের ছোট-বড় মন্দির। ২৫ একর জমি জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে প্রায় ২০০টি মন্দির। শত শত বছর ধরে জায়গাটি ঢাকা পড়েছিল চম্বলের গভীর জঙ্গল আর কাঁটাঝোপের আড়ালে। এককালে এটি হয়ে উঠেছিল ডাকাতদের গোপন আস্তানা। পরে পুরাতাত্ত্বিকদের উদ্যোগে খননকার্য চলে, সামনে আসে মন্দিরগুলি।
অষ্টম থেকে দশম শতকের মাঝামাঝি সময়ে, গুর্জর-প্রতিহার রাজাদের আমলে উত্তর ভারতের প্রাচীন স্থাপত্যরীতি মেনে গড়ে উঠেছিল বটেশ্বর মন্দিরগুচ্ছ। শিব, বিষ্ণু ও শক্তির আরাধনায় তৈরি এই মন্দিরগুলির মধ্যে সবচেয়ে বড় শিবমন্দির ‘ভূতেশ্বর’। তা থেকেই সম্ভবত গোটা অঞ্চলের নাম হয়েছে বটেশ্বর। গ্বালিয়র থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে। ট্রেনে গ্বালিয়র পৌঁছে বাকি পথ গাড়িতে যেতে পারেন।
আরও পড়ুন:
লেপাক্ষী (অন্ধ্রপ্রদেশ): পাথরের তৈরি সুবিশাল মন্দিরচত্বর তৈরি হয়েছিল বিজয়নগর সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগে। এখানকার বীরভদ্র মন্দিরে পা রাখলেই চোখে পড়বে সূক্ষ্ম কারুকার্য করা পাথরের থাম। মন্দিরের ৭০টি স্তম্ভের মধ্যে একটি প্রায় ঝুলন্ত। মেঝের সঙ্গে তার কোনও সংযোগ নেই, মাঝের ফাঁক দিয়ে অনায়াসে ওড়না বা কাপড় গলিয়ে দেওয়া যায়।
মন্দিরে রয়েছে একটি ২৪ ফুট বাই ১৪ ফুটের বীরভদ্রের মূর্তি। মন্দিরপ্রাঙ্গণ থেকে কিছুটা দূরেই রয়েছে নিরেট গ্রানাইট কেটে তৈরি ভারতের অন্যতম বৃহৎ নন্দীমূর্তি। শান্ত দুপুরে পাথরের চাতালে বসে প্রাচীন ভাস্কর্যের নৈপুণ্য বিস্ময় জাগায়। লেপাক্ষীর এই মন্দিরটি ঘোরার সেরা সময় অক্টোবর থেকে মার্চ। অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রী সত্য সাই জেলায় (আগেকার অনন্তপুর) অবস্থিত লেপাক্ষী, বেঙ্গালুরু থেকে দূরত্ব ১২৪ কিলোমিটারের মতো। গাড়িতে লাগে আড়াই ঘণ্টা।
চাঁদ বাওড়ী, আভানেরী (রাজস্থান): জ্যামিতির ধাঁধায় ভরা পাতালে নামার সিঁড়ি আর গভীর পাতকুয়ো বিস্ময় জাগায়। মরুভূমির দেশে জল বাঁচিয়ে রাখার তাগিদে তৈরি হয়েছিল তা। কিন্তু তাকে যে এমন শিল্পরূপ দেওয়া যায়, চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। প্রায় ১৩ তলা সমান গভীর এই কুয়োয় নামার জন্য রয়েছে সাড়ে তিন হাজার খাড়াই পাথরের সিঁড়ি। খ্রিস্টীয় নবম শতাব্দীতে নিকুম্ভ রাজবংশের রাজা চন্দ এটি নির্মাণ করিয়েছিলেন।
সিঁড়িগুলো এমন নিখুঁত জ্যামিতিক নকশায় সাজানো যে উপর থেকে দেখলে চোখে ধাঁধা লেগে যায়। কুয়োর একপাশে রয়েছে স্তম্ভযুক্ত বারান্দা, যেখানে এককালে রাজপরিবারের বিশ্রাম নেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। রাজস্থানের দৌসা জেলায় (জয়পুর থেকে প্রায় ৯০ কিমি) রয়েছে চাঁদ বাওড়ী।
পদ্মনাভপুরম প্রাসাদ (তামিলনাড়ু): কেরলম এবং তামিলনাড়ুর সীমানায় দাঁড়িয়ে থাকা প্রাসাদটি ত্রিবাঙ্কুর রাজাদের হাতে গড়া। কাঠের প্রাসাদটি অলক্ষে রয়ে যাওয়া আর এক বিস্ময়। পদ্মনাভপুরম একসময় ছিল ত্রিবাঙ্কুর রাজ্যের রাজধানী। মেহগনি আর সেগুন কাঠের কারুকার্য করা প্রাসাদের অন্দরমহলে রোদ পড়লে পরিবেশ হয়ে ওঠে মায়াময়।
চারতলা ভবন, নীচের তলায় শয়নকক্ষ। রাজাদের খাটগুলি তৈরি হয়েছিল ঔষধি গাছ দিয়ে। একদম উপরের তলায় রয়েছে পূজার কক্ষ। মেঝে এমন এক বিশেষ মিশ্রণ দিয়ে তৈরি যা শতাব্দী পেরিয়েও আয়নার মতো চকচক করে এবং সবসময় শীতল থাকে। কাঠের জালির ফাঁক দিয়ে নরম আলো-বাতাসের খেলা এই প্রাসাদকে এক অদ্ভুত স্নিগ্ধতা এনে দেয়। তামিলনাড়ুর কন্যাকুমারী জেলায় অবস্থিত প্রাসাদটির দূরত্ব তিরুঅনন্তপুরম থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার।
জিঞ্জি দুর্গ (তামিলনাড়ু): এক অপরাজেয় কেল্লার নাম জিঞ্জি দুর্গ যার সঙ্গে জড়িয়ে ছত্রপতী শিবাজীর বিজয়গাথা। তিনটি রুক্ষ পাথুরে পাহাড়কে দেওয়াল হিসাবে ব্যবহার করে তৈরি হয়েছিল এই সুবিশাল দুর্গ। ব্রিটিশরা একে বলত ‘প্রাচ্যের ট্রয়’, মরাঠা অধিপতি শিবাজীর কাছে তা ছিল ‘অপরাজেয় কেল্লা’। ১৬৭৭ খ্রিস্টাব্দে শিবাজীর নেতৃত্বে সুবেদার হরজি রাজমহাদিক মরাঠাদের পক্ষে স্বরাজ্যের জন্য দুর্গটি জয় করেছিলেন। দীর্ঘদিন তা মরাঠাদের দখলে ছিল।
পাহাড়ের একেবারে উপরে দুর্গ। সেখানে পৌঁছোতে গেলে হাজারখানেক খাড়া পাথরের সিঁড়ি ভাঙতে হয়। উপরে উঠলে দেখা যায় সাততলা উঁচু কল্যাণ মহল, রাজকীয় স্নানাগার আর বিশাল শস্যভান্ডার। চারপাশের সবুজ উপত্যকার দিকে চোখে পড়লে বোঝা যায়, শত্রুসেনার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এর চেয়ে নিরাপদ স্থান হতে পারে না। তামিলনাড়ুর বিল্লুপুরম জেলার এই দুর্গটি পুদুচেরী থেকে প্রায় ৭০ কিমি দূরে অবস্থিত। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি এখানে যাওয়ার আদর্শ সময়।
বাসগো রাজপ্রাসাদ এবং গুম্ফা (লাদাখ): রুক্ষ পাহাড়ে মাটির তৈরি রূপকথা! এমনটাই মনে হতে পারে লাদাখের বাসগোতে এলে। লেহ থেকে কিছুটা দূরে সিন্ধু নদের উপত্যকায় লালচে-বাদামি রঙের খাড়া মাটির টিলা। দূর থেকে দেখলে মনে হবে টিলাগুলো প্রকৃতির খেয়ালে গড়া ভাস্কর্য।
মাটি, পাথর আর কাঠ মিশিয়ে তৈরি হয়েছিল লাদাখের পঞ্চদশ শতকের রাজধানী ও প্রাচীন দুর্গ। ধসে পড়া মাটির দেওয়ালের ফাঁক দিয়ে লাদাখের নীল আকাশ দেখা যায়। তবে এই ধ্বংসাবশেষের ভিতরেই সুরক্ষিত রয়েছে শতাব্দীপ্রাচীন বৌদ্ধ গুম্ফা, যার দেওয়ালে প্রাচীন ফ্রেস্কো আর বিশাল মৈত্রেয় বুদ্ধের মূর্তি দেখে স্তব্ধ হতে হয়। লেহ-শ্রীনগর সড়কে লেহ থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে বাসগো। মে থেকে অক্টোবর এখানে ঘোরার জন্য আদর্শ সময়।