ঘুম থেকে উঠলেন মায়ানমারে, প্রাতরাশ ভারতে, ঘুরে আসুন অ্যাংদের অদ্ভুত বাড়ি থেকে
রান্না-খাওয়া মায়ানমারে, ঘুমোতে আসতে হয় ভারতে! গুলিয়ে যাচ্ছে সবকিছু। এই ধাঁধার উত্তর পেতে ঘুরে আসুন লংওয়া গ্রামের অ্যাংদের বাড়ি থেকে।
ঘুম ভাঙল ভারতে, প্রাতরাশ সারলেন মায়ানমারে। এক দেশ থেকে অন্য দেশে যেতে সময় লাগল মাত্র কয়েক সেকেন্ড! কী ভাবে সম্ভব?
অঙ্ক যদি ধাঁধার চেয়েও জটিল বলে মনে হয়, ঘুরে আসতে পারেন অ্যাংদের অদ্ভুত বাড়ি থেকে। তার জন্য যেতে হবে নাগাল্যান্ডের মন জেলার লংওয়া গ্রামে।
পাহাড়ি সৌন্দর্য উপভোগেই পর্যটকেরা আসেন এই গ্রামে। তবে শুধু সৌন্দর্য নয়, এই গ্রামের সঙ্গে জড়িয়ে কোনিয়াক নাগা উপজাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি। রয়েছে গায়ে কাঁটা দেওয়ার মতো ঘটনা।
লংওয়া গ্রামের কোনিয়াক নাগা উপজাতির প্রধান বা রাজাকে বলা হয় অ্যাং। গ্রামের প্রধান আকর্ষণ অ্যাংদের বাড়ি। আন্তর্জাতিক সীমান্ত ভাগ করে দিয়েছে এই বাড়িকে।
অ্যাংদের বাড়ির মূল ফটকের দু’টি থামের একটি রয়েছে ভারতে, অন্যটি মায়ানমারে। তাঁদের শোয়ার ঘরটি ভারতে, খাওয়ার জায়গাটি মায়ানমারে।
আরও পড়ুন:
অ্যাং-এর পরিবার এবং লংওয়া গ্রামের বাসিন্দারা দ্বৈত নাগরিকত্ব ভোগ করেন। কোনিয়াক উপজাতিদের প্রধান বা অ্যাং কেবল একটি গ্রামে সীমাবদ্ধ নন। একসময়ে অ্যাং ভারতের ৪টি এবং মায়ানমারের প্রায় ৬০টি নাগা গ্রামের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন ও শাসন করেছেন।
বিষয়টি মজার ঠেকলেও লংওয়ার কোনিয়াক উপজাতিদের কাছে সব কিছু এখন আর ততটাও সহজ নয়। সম্প্রতি সীমান্ত সুরক্ষা নিয়ে কড়াকড়ি করা হয়েছে। ফলে দুই দেশে বাস করা লংওয়া উপজাতিদের মধ্যে যাতায়াত অনুমতিসাপেক্ষ। সীমান্ত একটি নির্দিষ্ট স্থল দিয়েই পারাপার করা যায়।
গ্রাম একটি হলেও তা ভারত এবং মায়ানমার দুই দেশের নির্বাচনী ক্ষেত্রের মধ্যে পড়ে। লংওয়া নাগাল্যান্ড রাজ্য বিধানসভার ৪৪ এসি ফোমচিং নির্বাচনী কেন্দ্রের অধীনে মন জেলায় পড়েছে। অন্য দিকে, মায়ানমারের সাগাইং অঞ্চলের ইয়োচেন লাহেই টাউনশিপ নির্বাচনী কেন্দ্রেরও অংশ এটি।
শুধু আন্তর্জাতিক সীমান্তই এই গ্রামের মূল কথা নয়। কোনিয়াক নাগাদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে শিউরে ওঠার মতো ঘটনা। তাঁরা বংশানুক্রমিক যোদ্ধা। অতীতে নাগা উপজাতিদের মধ্যে গ্রামের সীমানা নিয়ে লড়াই চলত। সেই সময় যোদ্ধারা বীরত্ব প্রমাণে শত্রুপক্ষের শিরশ্ছেদ করতেন।
আরও পড়ুন:
যে যোদ্ধা শত্রুর মুণ্ড কেটে আনতে পারতেন, তাঁর মুখমণ্ডলে, বুকে বিশেষ উল্কি এঁকে সংবর্ধনা দেওয়ার চল ছিল। একসময়ের সেই যোদ্ধাদের কেউ কেউ এখনও বেঁচে আছেন। তাঁরাই সেই যোদ্ধাদের শেষ প্রজন্ম। মুখের উল্কি, সাজপোশাক এখনও তাঁদের আলাদা করে চিনিয়ে দেয়।
কোনিয়াক যোদ্ধাদের পেশার বদল ঘটেছে ধীরে ধীরে। পরিবারের অনেকেই এখন চাষবাসের সঙ্গে যুক্ত। কেউ কেউ কাঠের কাজ করেন। হস্তশিল্প তৈরি করেও জীবিকা নির্বাহ করে কিছু পরিবার। ধাতুর তৈরি নানা শিল্পকর্ম, যোদ্ধাদের মূর্তি দেখতে পাওয়া যায় এখানকার শিল্পীদের বাড়িতে।
লংওয়ার বর্তমান অ্যাং বা প্রধানের আওতায় ভারতের তিনটি এবং মায়ানমারের ৫টি গ্রাম রয়েছে। আছে স্কুলও। স্কুলগুলিতে দুই দেশের গ্রামের ছেলেমেয়েরাই একসঙ্গে পড়াশোনা করে।
কোনিয়াক নাগাদের ঐতিহ্যের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে মোরুংও। এটি হল শিক্ষা এবং সংস্কৃতি চর্চাকেন্দ্র। জরুরি সভাও এখানে অনু্ষ্ঠিত হয় বলে জানা যায়। এখানে থাকে কাঠের বড় গুঁড়ি দিয়ে তৈরি খং। গ্রাম পাহারা দেওয়ার সময় বিপদের আভাস পেলে খং বাজিয়ে সতর্ক করা হত একদা। খং বাজানোরও নির্দিষ্ট কৌশল আছে। নির্দিষ্ট শব্দ এবং ছন্দের অর্থ রয়েছে।
লংওয়া গ্রাম থেকে ঘুরে নিতে পারেন সীমান্তবর্তী জ়িরো পয়েন্ট। বিকেলের দিকে দূর-দূরান্ত পর্যন্ত পাহাড়ি উপত্যকার রূপ মুগ্ধ করবেই। মন জেলা থেকে সড়কপথে গ্রামটির দূরত্ব ৪০-৪৫ কিলোমিটার।
লংওয়া গ্রামে কোনও হোটেল নেই। প্রাথমিক সুবিধাযুক্ত ২-৩টি হোমস্টে রয়েছে। কোনিয়াক নাগাদের সংস্কৃতি, গ্রামের মানুষকে কাছ থেকে জানতে হলে এখানে থেকে যেতে পারেন। না হলে মন জেলা সদর থেকেও যাতায়াত করা যায়।
মন জেলায় পৌঁছোনোর জন্য নিকটতম বিমানবন্দর অসমের জোরহাট। অসমের শিবসাগর জেলার সোনারি হয়ে এবং সিমুলগুড়ি হয়ে মনে পৌঁছোনো যায়। বাসে করে সোনারি হয়ে মন জেলা সদরে পৌঁছোনো যায়। সোনারি থেকে মনের দূরত্ব প্রায় ৬৫ কিলোমিটার। সিমুলগুড়ি হয়েও মন পৌঁছোনো যায়, দূরত্ব ৯৫ কিলোমিটার।