কোথাও একাকী শক্তিরূপিনী, কোথাও চতুর্ভুজা অশ্বারোহী! ‘বিসর্জনহীন দুর্গা’ দেখতে কোথায় যাবেন
বাংলার দুর্গাপুজোকে শারদীয়া উৎসব রূপে দেখতে অভ্যস্ত বাঙালি। চেনা আখ্যানের আড়ালে রয়ে যায় দুর্গা-আরাধনার একটি প্রাচীন ধারা। সেখানে দেবী আসেন না, কারণ তিনি কখনও চলে যান না। এই দুর্গাকেই বলা যেতে পারে বাংলার ‘বারোমাস্যা দুর্গা’। কলকাতা-সহ পশ্চিমবঙ্গের নানা প্রান্তে চলুন বিসর্জনহীন দুর্গা দর্শনে।
মহালয়ায় তাঁর আগমনের প্রতীক্ষা, ষষ্ঠীতে বোধন, দশমীতে দেবীর বিসর্জন। পুজোর পাঁচ দিন ঢাকের বাদ্যি, আলোর রোশনাই। বাংলার দুর্গাপুজোকে শরতের কয়েকটি দিনের নিরিখেই দেখতে অভ্যস্ত বাঙালি।
এই চেনা আখ্যানের আড়ালে রয়ে যায় দুর্গা-আরাধনার একটি প্রাচীন ধারা। সেখানে দেবী আসেন না, কারণ তিনি কখনও চলে যান না। তিনি কয়েক দিনের অতিথি নন, মন্দিরের, পরিবারের কিংবা জনপদের নিত্য-অধিষ্ঠাত্রী। এই দুর্গাকেই বলা যেতে পারে বাংলার ‘বারোমাস্যা দুর্গা’।
কলকাতা এবং পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে এমনই সমস্ত স্থায়ী দুর্গাবিগ্রহ। এমন দুর্গা সর্বত্র মহিষাসুরমর্দিনী নন। ‘বিসর্জনহীন দুর্গা’ মৃন্ময়ীও নন। কোনও একটিমাত্র নির্দিষ্ট রূপেও তিনি আবদ্ধ নন। একচালা দুর্গা, সঙ্গে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ, এই পরিচিত রূপের পাশেই রয়েছে তাঁর সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ।
সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের শিল্প-ইতিহাসের অধ্যাপক দেবদত্ত গুপ্ত বলছেন, ‘‘বারোমাস্যা দুর্গা কোথাও শক্তিরূপিনী, কোথাও তিনি স্বতন্ত্র একক দেবীরূপে পূজিত হন, কোথাও তিনি চতুর্ভুজা অশ্বারোহিণী। শরতে তাঁদের নতুন করে ঘরে আনা হয় না, বরং যিনি ঘরেই আছেন, তাঁর নিত্য-উপস্থিতিকেই কয়েকটি দিনের জন্য উৎসবমুখর করে তোলা হয়। ফলে এখানে দুর্গাপুজো আগমনের নয়, বরং হয়ে ওঠে উপস্থিতির উৎসব।’’
ঢাকেশ্বরী মাতা মন্দির, কুমোরটুলি: দুর্গাচরণ স্ট্রিটের ঢাকেশ্বরীর মন্দিরে নিত্যপূজিতা হন দেবী দুর্গা। জনশ্রুতি বলে, রাজা বল্লাল সেন স্বপ্নাদেশে মূর্তি খুঁজে পান। মূর্তিটি ঢাকা ছিল বলেই ঢাকেশ্বরী। এই মন্দিরে দশভুজার সঙ্গে রয়েছেন লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ। সিংহ ও মহিষাসুরও রয়েছেন। বিগ্রহ স্থায়ী। দেবীর সামনের হাত দু’টি পিছনের আটটি হাতের তুলনায় বড়। মন্দিরে প্রতিদিন দেবীর পূজা হয়, সকাল এবং সন্ধ্যায় মন্দির খোলা থাকে। দুর্গাপুজোর দিনগুলিতে বিশেষ অন্নভোগের ব্যবস্থা হয়।
আরও পড়ুন:
আদি চিত্তেশ্বরী বা জয়চণ্ডী চিত্তেশ্বরী দুর্গামন্দির: চিৎপুর-কাশীপুর অঞ্চলে ১৬১০ খ্রিস্টাব্দ তৈরি হয়েছিল মন্দিরটি। এই পুজোর নেপথ্যে রয়েছে চিতে ডাকাতের কাহিনি। শোনা যায় একসময় জঙ্গলাকীর্ণ চিৎপুর কাঁপিয়ে বেড়াতেন চিতে ডাকাত। ডাকাতির আগে দেবীর পুজো করতেন তিনি। সেখান থেকেই এই পুজো চিত্তেশ্বরী পুজো বলে পরিচিত হয়। দেবীবিগ্রহ নিমকাঠের। কলকাতার প্রাচীন স্থায়ী দুর্গাক্ষেত্রগুলির মধ্যে একটি। দেবী জয়চণ্ডী চিত্তেশ্বরী নামে পূজিত হন। দেবীর পায়ের কাছে প্রচলিত সিংহের পরিবর্তে বাঘের উপস্থিতি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। প্রতিদিন পুজো হয়। দুর্গোৎসবে বিশেষ আয়োজন এবং ভক্তসমাগম হয়।
জগৎরাম মুখোপাধ্যায় বাড়ির দুর্গা, বেহালা: ৫৬ ব্রাহ্মসমাজ রোডের জগৎরাম মুখোপাধ্যায়ের বাড়ির পুজোর সূচনা হয়েছিল ১৭৭০ সালে। বর্তমান দুর্গাবিগ্রহটি জগৎরাম মুখোপাধ্যায়ের পৌত্র যদুনাথ মুখোপাধ্যায় ১৮৫৮ সালে তৈরি করান। লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ মূল বিগ্রহের পাশে নয়, চালচিত্রে আছেন। প্রতিদিন দুর্গাপুজো হয় এবং দেবীকে মাছও নিবেদন করা হয়। একই স্থায়ী বিগ্রহে জগদ্ধাত্রী ও অন্নপূর্ণার পূজাও সম্পন্ন হয়।
বিজয়গড় ঠাকুরবাড়ির দুর্গা, দক্ষিণ কলকাতা: যাদবপুর সেন্ট্রাল রোডে ১৯৫০ সালের জানুয়ারিতে ঠাকুরবাড়ি প্রতিষ্ঠা হলেও, বর্তমান অষ্টধাতুর বিগ্রহটি নির্মিত হয় ২০১২ সালে। প্রথমদিকে মাটির প্রতিমায় দুর্গাপুজো হত। ২০১২ সালে স্থায়ী অষ্টধাতুর দুর্গাবিগ্রহ নির্মিত হয়। দশভূজা দুর্গা এখানে সপরিবার বিরাজমান। সকাল এবং সন্ধ্যায় মন্দিরটি খোলা থাকে। দুপুরে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
অভয়া মন্দির, হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিট: ৬৩/৩এ, হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে অভয়া দুর্গা পূজিত হন সারাবছর। মন্দিরটি ৭০ বছরেরও বেশি পুরনো বলে পুরোহিতের তরফে জানা যায়। আগে মাটির মূর্তি ছিল, পরে বর্তমান স্থায়ী প্রতিমা প্রতিষ্ঠিত হয়। দুর্গাপুজো, জগদ্ধাত্রীপুজো ও অন্নপূর্ণাপুজোয় বিশেষ আরাধনা হয়।
আরও পড়ুন:
দয়াময়ী দুর্গা মন্দির, সীতারাম ঘোষ স্ট্রিট: আনুমানিক ১৮৫০ সালে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা হয় বলে ফলকে পাওয়া যায়। দেবী এখানে দয়াময়ী দুর্গা বলে পরিচিত। গবেষকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী দেবীমূর্তিটি কষ্টিপাথরের। মন্দির সকাল ও সন্ধ্যায় নিয়মিত খোলা থাকে।
পতিতপাবনী দুর্গা মন্দির, ভূকৈলাস রাজবাড়ি: খিদিরপুরে ভূকৈলাস রাজবাড়ির ঐতিহ্যবাহী মন্দিরসমষ্টির মধ্যেই রয়েছে পতিতপাবনী দুর্গা মন্দির। অষ্টধাতুর দুর্গাবিগ্রহের সঙ্গে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ নেই। দেবীর সিংহের মুখাবয়বে ঘোড়ার আদল লক্ষণীয়। জয়নারায়ণ ঘোষাল মন্দির প্রতিষ্ঠা করিয়েছিলেন।
হালদারবাড়ির মহিষাসুরমর্দিনী, বাগবাজার: ১৭/১, কালীপ্রসাদ চক্রবর্তী স্ট্রিটে গৌড়ীয় মঠের বিপরীতে পূজিত হন দুর্গা। পদ্মের উপর দণ্ডায়মান মহিষাসুরমর্দিনী। কষ্টিপাথরের বিগ্রহের নিত্যপুজো হয়। জনশ্রুতি, এই বাড়ির পূর্বপুরুষদের একজন ওড়িশার সাহেবপুরে এক জেলের ঘর থেকে মূর্তিটি পেয়েছিলেন। মহালয়া থেকে দশমী পর্যন্ত দেবীমূর্তিকে দক্ষিণমুখী করে রাখা হয়। বিজয়াদশমীর সন্ধ্যায় ফের পশ্চিমমুখী করা হয়, সেই অবস্থাতেই দেবী বছরের বাকি সময় থাকেন।
নীলমণি দে ঠাকুরবাড়ির দুর্গা: ৪৫, হিদারাম ব্যানার্জি লেনে নীলমণি দে প্রতিষ্ঠিত এই ঠাকুরবাড়ির দুর্গাবিগ্রহ অষ্টধাতুর। বৈষ্ণব রীতিতে পূজা হয়। চালচিত্রে বাংলার পটচিত্রের প্রভাব রয়েছে। দুর্গাপুজো ছাড়াও জগদ্ধাত্রীপুজো ও রথযাত্রা পালিত হয়।
বিজয়গড়-শ্রীকলোনির বনদুর্গা: বারো ভূত দ্বাদশ অবতার মন্দিরে পূজিতা হন বনদুর্গা। এই দেবী কলকাতার নন, মূল শিকড় ঢাকার কাছে রোহিতপুর বা রহিতপুর গ্রামে। দেশভাগের পরে সেই গ্রামের মানুষ যাদবপুর, বাঘাযতীন, বিজয়গড় ও শ্রীকলোনি অঞ্চলে বসতি গড়েন এবং তাঁদের সঙ্গেই কলকাতায় আসে বনদুর্গা ও বারো ভূতের পুজোর ঐতিহ্য। দেবীর প্রধান ভোগ হাঁসের কাঁচা ডিম।
কনকদুর্গা মন্দির, ঝাড়গ্রাম: জামবনির চিল্কিগড়ে অরণ্যঘেরা পরিবেশে রয়েছে কনকদুর্গা মন্দির। অদূরেই বয়ে গিয়েছে ডুলুং নদী। একরত্ন মন্দিরের শিখর ওড়িশার একদেউলের মতো। রয়েছে নাটমণ্ডপও। দেবী চতুর্ভুজা, অশ্বারোহী। প্রচলিত ইতিহাস অনুসারে জামবনি পরগনার সামন্তরাজ গোপীনাথ সিংহ দেবীর স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন এবং রানির অলংকার দিয়ে সোনার দেবীমূর্তি নির্মাণ করান। পরবর্তী কালে সেই মূর্তি চুরি যায়। বর্তমান বিগ্রহটি অষ্টধাতুর। নিত্যপুজো হয় দেবীর। সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী ও দশমীতে বিশেষ পুজোর আয়োজন হয়।
বৈকুণ্ঠপুরের বনদুর্গা: শিলিগুড়ি সংলগ্ন বৈকুণ্ঠপুরের অরণ্যে পূজিতা হন বনদুর্গা। বছর জুড়ে পূর্ণিমাতিথিতে এবং পৌষপূর্ণিমায় পুজো হয়। দিল্লিভিটা-চাঁদের খাল অঞ্চলে অবস্থিত বনদুর্গার মন্দিরটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল দেবী ও অরণ্যের নিবিড় সম্পর্ক। মন্দিরে পৌঁছোতে বৈকুণ্ঠপুর অরণ্যের প্রায় আড়াই কিলোমিটার ভিতরে যেতে হয়। দুর্গাপুজোয় মহাড়ম্বরে পুজো হয়। জানা যায়, স্থানীয় রাজবংশী সম্প্রদায়ের মধ্যে দেবী প্রথমে ‘ঠুনঠুনি মা’ নামে পূজিত হতেন। পরবর্তী কালে তিনি ‘বনদুর্গা’ নামে পরিচিত হন। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, এই বনাঞ্চল ‘ভবানী পাঠক’ এবং ‘দেবী চৌধুরানী’র আশ্রয়স্থল ছিল। দেবী চৌধুরানি দেবীর আরাধনা করতেন।