E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

৯০টি কেমো পেরিয়ে স্বপ্নের উড়ান তরুণীর

মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লেও তার বছর চারেক বাদেই আকাশে ডানা মেলেছে দিভ্সার স্বপ্ন। কারণ, দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষায় ৯৭.৬ শতাংশ নম্বর পাওয়ার পাশাপাশি, ডাক্তারির সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষা নিটে ৬০১৫ স্থান পেয়েছেন তিনি।

আর্যভট্ট খান

শেষ আপডেট: ১৮ জুলাই ২০২৬ ০৬:৩২
মায়ের সঙ্গে দিভ্সা রায়।

মায়ের সঙ্গে দিভ্সা রায়। ছবি: দেবস্মিতা ভট্টাচার্য।

ক্যারাটে ক্লাস থেকে ফেরার পরে পিঠে খুব ব্যথা হচ্ছিল অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী দিভ্সা রায়ের। বাড়ির লোক প্রথমে ভেবেছিলেন, কোথাও হয়তো চোট লেগেছে। কিন্তু ব্যথা ক্রমশ বাড়তে থাকে, গোটা পিঠে ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় চিকিৎসককে দেখিয়েও কোনও ফল হয়নি। শেষ পর্যন্ত দিভ্সার এক বন্ধুর বাবা, যিনি পেশায় চিকিৎসক, তিনি রক্ত পরীক্ষা করাতে বলেন। রক্ত পরীক্ষা করিয়ে জানা যায়, ১৪ বছরের দিভ্সার রক্তের কর্কট রোগ হয়েছে। তিন জনের পরিবারে যেন আকাশ ভেঙে পড়ে।

সেই সময়ে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লেও তার বছর চারেক বাদেই আকাশে ডানা মেলেছে দিভ্সার স্বপ্ন। কারণ, দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষায় ৯৭.৬ শতাংশ নম্বর পাওয়ার পাশাপাশি, ডাক্তারির সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষা নিটে ৬০১৫ স্থান পেয়েছেন তিনি। ডাক্তার হওয়ার পাশাপাশি গবেষণা করাও লক্ষ্য দিভ্সার। তিনি বলেন, ‘‘২০২১-র অক্টোবরে যখন অসুখটা প্রথম ধরা পড়ে, তখন আমার ১৪ বছর বয়স। এখন ১৮। ৯০টির মতো কেমোথেরাপি নিয়েছি। এখন অনেকটাই সুস্থ। তবে ডাক্তার বলেছেন ২০২৯ পর্যন্ত খুব সাবধানে থাকতে। ওই সময়ের মধ্যে অসুখটা ফিরে আসতে পারে। কিন্তু আমি এ নিয়ে ভাবছি না। যা র‌্যাঙ্ক করেছি, তাতে ভাল মেডিক্যাল কলেজেই পড়ার সুযোগ পাব, আশা করি।’’

পূর্ব পুঁটিয়ারির স্কুল রোডে একটি দোতলা বাড়ির একতলায় তিন কামরার ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকে দিভ্সার পরিবার। তাঁর বাবা প্রবাল রায় একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করেন। মা সুরশ্রী জানান, দিভ্সা একটি হিব্রু শব্দ। এর অর্থ মধু। তিনি বলেন, ‘‘মেয়েকে হাসপাতালের ডে কেয়ারে রেখে পর পর কেমোথেরাপি দিতে হত। মেয়ের ওজন কমে গিয়েছিল। চুল পড়ে যাচ্ছিল। ও ক্যারাটেতে ব্ল্যাক বেল্ট। বার বার মনে হত, এমন মেয়ে কি এত সহজে হাল ছেড়ে দেবে?’’

সুরশ্রী বলেন, ‘‘তখন এমনও হয়েছে, কেমো দিতে গিয়ে দেখা গেল, হিমোগ্লোবিন নেমে গিয়েছে তিনে। ডাক্তার বলেছেন, কেমো দেওয়াযাবে না। আগে রক্ত দিতে হবে। আমাদের ওই সময়ে প্রায় ৩৩ইউনিট রক্ত জোগাড় করতে হয়েছে। বাড়ি ফেরার পরেও ওরাল কেমো নিতে হয়েছে বেশ কয়েক বার। কিছুটা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার পরে শুধু পড়াশোনাই নয়, গান গাওয়া, লেখালিখিও শুরু করে দেয় দিভ্সা। দশম শ্রেণিতে বোর্ডের পরীক্ষায় পায় ৯৮.৬ শতাংশ নম্বর।’’ দিভ্সা বলেন, ‘‘রাজারহাটের হাসপাতালের ওই দিনগুলো ভুলতেই পড়াশোনায় বেশি করে মন দিই।’’

দিভ্সা তখন একাদশ শ্রেণিতে। চলছে নিটের প্রস্তুতি। তখনই ফিরে আসে পিঠের সেই পুরনো ব্যথা। দিভ্সা বলেন, ‘‘মনে হল, আবারও কি ফিরে আসবে হাসপাতালের দিনগুলো? ডাক্তার তো বলেইছিলেন, ফিরে আসতে পারে অসুখটা। আবার আমার বায়োপ্সি হল। যদিও রিপোর্ট নেগেটিভ এল। তবে, পিঠে এত যন্ত্রণা হত যে, বাড়িতেও ঠিক মতো হাঁটাচলা করতে পারতাম না। হুইলচেয়ারে বসেই চলত পড়াশোনা।’’

দিভ্সার এই লড়াকু মনোভাব দেখে তাঁর স্কুল ‘গোখেল মেমোরিয়াল স্পিরিট অব গোখেলাইট’ নামে স্কলারশিপ দেয় তাঁকে। সুরশ্রী বলেন, ‘‘দিভ্সার বাবা নরেন্দ্রপুরের ছাত্র ছিলেন। মেয়ের অসুখের কথা শুনে প্রাক্তনীরা টাকা তুলে দেন। গোখেলের শিক্ষক, পড়ুয়া থেকে প্রাক্তনীরা— সকলেই ওর পাশে আছেন। তাঁদের না পেলে লড়াইটা জেতা যেত না। সুস্থ হলেও হয়তো হুইলচেয়ারে বন্দি জীবন কাটাতে হত।’’

সেই হুইলচেয়ার এখন বাড়ির এক কোণে পড়ে। পড়ার টেবিলে নানা বইয়ের মাঝে রয়েছে সৈয়দ মুজতবা আলীর রচনা সমগ্র। এখন দিভ্সা মুজতবা আলী পড়ছেন। আলমারি ভর্তি নানা মেডেল রয়েছে তাঁর। তার মধ্যে রয়েছে ক্যারাটেতে ব্ল্যাক বেল্ট পাওয়া পুরস্কারও। সে দিকে তাকিয়ে দিভ্সা বলেন, ‘‘মা আমার প্রিয় বন্ধু। আমাকে মা সব সময়ে আগলে রাখেন। মা যখন আগলে রেখেছেন, আমি জানি, অসুখ আর ফিরবে না। স্বাভাবিক জীবনে তো ফিরেই এসেছি। ভাবছি, ক্যারাটে প্রশিক্ষণটাও আবার নিয়মিত শুরু করে দেব।’’

আত্মবিশ্বাস ঝরে পড়েদিভ্সার গলায়।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Cancer NEET

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy