রাজ্যের শাসক দলের ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে সংঘাত শুরুর পরেই কি যাদবপুরকে দেশবিরোধী প্রমাণ করতে উঠে-পড়ে লেগেছে রাজনৈতিক ভাবে প্রভাবশালী একটি অংশ? যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু পোস্টারের ভিডিয়ো পোস্ট করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সমাজমাধ্যমে মন্তব্যের পরে বিষয়টি নিয়ে শিক্ষাজগতে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। যাদবপুরের ইলেকট্রনিক্স ও কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রাক্তনী (১৯৭৫-৮০) তথা আইআইটি খড়্গপুর ও যাদবপুরের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, রাজা রামান্না চেয়ার প্রফেসর অনুপম বসু যেমন মনে করেন, “যে কোনও সরকারের বিরোধিতা যৌবনের ধর্ম। কিন্তু যাদবপুরে এক জনও দেশদ্রোহী ছাত্র আছে বলে আমি বিশ্বাস করি না। বরং যাদবপুরের তর্ক, বিতর্কের পরিবেশ দেশপ্রেমের ভিত্তিই মজবুত করে থাকে।”
তবে পিছনের দিকে না-তাকিয়ে যাদবপুরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ও উৎকর্ষ চর্চার পথে বাধা দূর করতে তৎপর হওয়া উচিত বলে বার্তা দিয়েছেন রাজ্যের উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়। তিনি বলেন, “যাদবপুর দেশের উচ্চশিক্ষা উৎকর্ষ, গবেষণার তীর্থক্ষেত্র। আমরা চাই, যাদবপুর অতীতের সুনাম বজায় রেখে ভবিষ্যতে তা আরও জোরালো করুক। এর পথে যা বাধা, যাদবপুরকেই তা দূর করতে হবে।” ভুল কারণে যাদবপুরের শিরোনামে আসা কাম্য নয় জানিয়ে উচ্চশিক্ষামন্ত্রীর আর্জি, যে মনোভাব থেকে রাজ্য সরকার বাজেটে যাদবপুরকে উৎকর্ষ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পদক্ষেপ করেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই যেন তার সঙ্গে সঙ্গতি বজায় রাখেন। খামোখা অতীত না-ঘাঁটার পরামর্শ দিয়ে উচ্চশিক্ষামন্ত্রী বলেন, “কোনও একটি প্ররোচনা, তার প্রতি প্ররোচনা এবং তার প্রতিক্রিয়ায় যা ঘটেছে তা নিন্দনীয়, নিন্দা করছি।” উচ্চশিক্ষামন্ত্রীর এই অবস্থানকে স্বাগত জানিয়েছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি (জুটা)-ও। তাঁদের বক্তব্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের উৎকর্ষ ও সম্মান সব কিছুর ঊর্ধ্বে। সেই দায়িত্ব পালনে সবার উদ্যোগ জরুরি। সরকার ও প্রশাসনকেও নিরপেক্ষ ও দায়িত্বশীল হতে আবেদন জানায় জুটা।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা বেশির ভাগই দলমত নির্বিশেষে মনে করেন, একেবারেই বিক্ষিপ্ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাপ্রাঙ্গণের কোনও কোণে কিছু পোস্টারকে যাদবপুরের মুখ বলে তুলে ধরাটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তির প্রতি সুবিচার করে না। আরএসএফ বলে একটি সংগঠনের পোস্টারে নিহত মাওবাদী নেতাদের শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। এর বেশ কিছু পোস্টার বা লেখা এখন মুছে ফেলা হয়েছে। তবে ওই সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক ছাত্রের দাবি, কোনও পোস্টারে ব্যক্তি বিশেষকে কুর্নিশ জানানো মানেইতারা মাওবাদীদের সমর্থক এটা ভাবা ঠিক নয়।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির মতেও, দেশের সার্বভৌমত্ব বিরোধী কোনও স্লোগান বা পোস্টার নিয়ে ছাত্রদের সচেতন হওয়া উচিত। কাশ্মীর বা মাওবাদী সমস্যা নিয়ে পঠনপাঠন, গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাক্রমে থাকতে পারে। কোনও অন্যায়ের তাৎক্ষণিক প্রতিবাদও হতে পারে। তবে তা নিয়ে একপেশে রাজনৈতিক অবস্থানের প্রচার বিশ্ববিদ্যালয়ে কাম্য নয়। কিন্তু যাদবপুরের ছাত্রদের দেশবিরোধী ভাবমূর্তি গড়ে তোলার চেষ্টাও সুস্থ রাজনীতি নয় বলে তাঁদের অবস্থান। মুখ্যমন্ত্রীর শেয়ার করা ভিডিয়োয় চিত্তপ্রসাদের আঁকা দেশভাগের যন্ত্রণাময় ছবিও উঠে এসেছে। সমাজমাধ্যমে এই নিয়ে অনেকের কটাক্ষ, ওই ছবিও কি তবে ‘রাষ্ট্রবাদ-বিরোধী’? যাদবপুরের ইংরেজির অধ্যাপক অভিজিৎ গুপ্ত বলেন, “যাদবপুরের শিকড়ে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস জড়িয়ে। আজকের যাদবপুরের গবেষকরাও বিষয়টিনিয়ে সজাগ। যাদবপুরে অরবিন্দ চর্চারও বহু গুরুত্বপূর্ণ তথ্যপ্রমাণ রয়েছে।” স্বাধীন প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রের পক্ষে স্লোগান বা নাৎসি প্রতীকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-চিত্রে আপত্তি কেন, তা-ও বোধগম্য হয়নি অনেকের। এক শিক্ষকের মতে, “দেওয়াল-চিত্র বা পোস্টারের সব কিছু আক্ষরিক ভাবে নেওয়ার নয়। তার কিছু স্বাধীনতাও থাকে। তরুণ প্রজন্মের ভাষার কচকচি নিয়ে মাথা ঘামানোও সব সময়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়।”
মোটের উপরে যাদবপুর এ দিন ছন্দে ফিরলেও ছাত্রদের একাংশ অবশ্য তদন্ত কমিটি নিয়ে অসন্তোষে মুখর। এসএফআইয়ের দাবি, তদন্ত কমিটিতেও ছাত্র প্রতিনিধি রাখতে হবে। আবার এবিভিপি,এনএসএফের ক্ষোভ, তাদের উপরে হামলার ছবি যাদবপুর কর্তৃপক্ষ পুলিশকে দেননি। তাঁরা নিজেরা ওই ঘটনার ভিডিয়ো পুলিশকে দিয়েছেন। যাদবপুর কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, মাঠের ভিতরে যেখানে গোলমাল, তা সিসি ক্যামেরার আওতায় নেই। তবে তদন্তের জন্য ভিডিয়ো বা ছবির তথ্যপ্রমাণে সাহায্য সবার কাছ থেকেই স্বাগত। তদন্ত কমিটির অন্যতম সদস্য অম্বেডকর বিএড বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অরুণাশিস গোস্বামীও সময়াভাবে দায়িত্বপালনে তাঁর অপারগতা জানান।
যাদবপুরের উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য এ দিন অসুস্থতার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেননি। তবে পুলিশ এসে রেজিস্ট্রার সেলিম বক্স মণ্ডলের থেকে গোলমালের সময়ের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে। বেশ কয়েক ঘণ্টা সময়ের ঘটনাবলির হার্ড ডিস্ক সংগ্রহ করেছে পুলিশ। তা ছাড়া রাজপথের গোলমাল জরিপ করতে ট্রাফিক পুলিশের ফুটেজ নেওয়া হচ্ছে। যাদবপুরের গেটে ভাঙচুরের তদন্তে আজ, বুধবার ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞরা যাদবপুরে আসতে পারেন।