দিল্লিতে ‘ইন্ডিয়া’ মঞ্চের সমাবেশের ঠিক আগে ফের এক দফায় এ রাজ্যের ভোটে ‘অস্বচ্ছতা’ নিয়ে সুর চড়াল মমতা-তৃণমূল। ভোটার তালিকায় অন্তর্ভূক্তির পরেও ১৬ লক্ষের বেশি নাম বাতিলের আবেদন নিয়ে ওঠা প্রশ্ন সামনে রেখেই আক্রমণ শানিয়েছেন দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। নির্বাচন কমিশন ও বিজেপির দিকে আঙুল তুলে তাঁর হুঁশিয়ারি, এই মামলার নিষ্পত্তি হবেই। তখন রাজ্যের এই সরকার আর থাকবে না!
এরই পাশাপাশি, ‘যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতি’র (লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি) জেরে ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাওয়া কলকাতার প্রায় ১ লক্ষ ২৬ হাজার এবং হাওড়ার প্রায় ৩৯ হাজার নাগরিকদের আবেদন ট্রাইবুনালে যাতে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে শুনানি করে দ্রুত নিষ্পত্তি হয়, সে জন্য প্রয়োজনীয় সমন্বয় করার জন্য রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও), রাজ্য নির্বাচন কমিশনার এবং কলকাতার পুর-কমিশনারের কাছে আর্জি জানিয়েছে কংগ্রেস।
রামলীলা ময়দানে রবিবারের সভায় যোগ দিতে আজ, শনিবার দিল্লি রওনা হওয়ার কথা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। দেশ জুড়ে নির্বাচন নিয়ে অনিয়মের অভিযোগে ওই সভায় থাকবেন অভিষেকও। তার ঠিক আগে ফের এক দফায় এ রাজ্যে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) নিয়ে দলের অভিযোগগুলি সামনে নিয়ে এসেছেন তাঁরা। এ রাজ্যে ভোটার তালিকা থেকে ১৬ লক্ষ নাম বাদ দেওয়ার যে আবেদন কমিশনের তরফে করা হয়েছিল, শুক্রবার সে প্রসঙ্গ টেনে অভিষেক বলেছেন, ‘‘অঙ্ক কষে এ রাজ্যের ৩০ লক্ষ ভোটারকে বাদ দেওয়া হয়েছে।’’ সুপ্রিম কোর্টে কমিশনের দেওয়া হলফনামার প্রসঙ্গ টেনে তাঁর বক্তব্য, ‘‘অঙ্ক কষে ৩০ লক্ষ ভোটার বাদ দেওয়া হয়েছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত, এসআইআর-এর বিশেষ পর্যবেক্ষক সুব্রত গুপ্ত এখন বলেছেন, বিচারবিভাগীয় আধিকারিকেরা ‘যোগ্য’ বলে রায় দেওয়ার পরেও নাম বাদ দেওয়ার ১৬ লক্ষ আবেদন সম্পর্কে তাঁর কিছু জানা নেই।’’ তার পরেই তাঁর মন্তব্য, ‘‘এ মামলা চলবে। যাওয়ার সময় এসে গিয়েছে! আজ না হোক কাল তো নিষ্পত্তি হবে। কয়েক মাসের অপেক্ষা।’’ রাজ্যে ভোট চুরি’র অভিযোগ করে তাঁর চ্যালেঞ্জ, ‘‘১০০টি বিধানসভা কেন্দ্রের নাম দিচ্ছি। কমিশন যদি পারে সেগুলির গণনার ১০ মিনিটের ‘ফুটেজ’ দেখিয়ে দিক। অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেব!’’ এই সূত্রেই এসআইআর এবং ভোটের সময়ে রাজ্যের বিশেষ পর্যবেক্ষক ও সিইও-র (মনোজ আগরওয়াল) রাজ্যের নতুন সরকারের দুই শীর্ষ পদে পরবর্তী নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দলের নেতা কুণাল ঘোষ।
এই প্রেক্ষিতে সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তীর বক্তব্য, ‘‘যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতি নিয়ে গোড়া থেকেই প্রশ্ন ছিল। এখন সুপ্রিম কোর্টও তার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। অথচ এর ভিত্তিতে ভোটারদের নাম বাদ দিয়ে বিধানসভা ভোট করে ফেলা হয়েছে! এই অনিয়মের দায় নির্বাচন কমিশনকে নিতে হবে এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার-সহ সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের অপসারণ করতে হবে।’’
ভোটার তালিকা নিয়ে এই বিতর্কের মধ্যেই আসন্ন পুরভোটের আগে বেশ কিছু বিষয়ে প্রক্রিয়াগত সমস্যার সমাধানের আর্জি জানিয়ে রাজ্যের সিইও, রাজ্য নির্বাচন কমিশনার ও কলকাতার পুর-কমিশনারের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন প্রদেশ কংগ্রেস নেতা প্রশান্ত দত্ত, আশুতোষ চট্টোপাধ্যায়, অজিতেশ পাণ্ডেরা। ট্রাইবুনালে আবেদনের দ্রুত নিষ্পত্তির দাবির পাশাপাশি কংগ্রেসের অভিযোগ, ‘খসড়া তালিকা অনুযায়ী, কলকাতা পুর-এলাকার অধিকাংশ ওয়ার্ডে ভোটারের সংখ্যা ১২ হাজারের কম হলেও, কয়েকটি ওয়ার্ডে তা ১৮ হাজারের বেশি। এই অসামঞ্জস্য খতিয়ে দেখা দরকার। ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস যে আপত্তি জানানো হয়েছিল, তার শুনানিও বাকি রয়েছে’।
কংগ্রেসের বক্তব্য, বর্তমান জনগণনা, যথাযথ বিশেষ সংক্ষিপ্ত সংশোধনের (এসএসআর) জন্য কী পদক্ষেপ করা হয়েছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলির ধারণা নেই। এই প্রেক্ষিতে ওয়ার্ডভিত্তিক জাতগত জনসংখ্যা এবং সেই অনুপাতে সংরক্ষণের তথ্য চাওয়া হলেও তা কর্তৃপক্ষ দিতে পারছেন না। এ ছাড়া, নির্বাচন-সংক্রান্ত সমস্যার সুষ্ঠু সমাধানের জন্য জেলা নির্বাচন দফতরগুলিতে নোডাল অফিসার নিয়োগ, যাবতীয় আপত্তি ডিজিটাল ব্যবস্থায় জমা দেওয়ার জন্য প্রতিটি এমআরও-কে ইমেল আইডি দেওয়া, খসড়া তালিকা ও বুথ তালিকা সংক্রান্ত আপত্তি জানানোর শেষ তারিখ অন্তত ১০ দিন বাড়ানো, খসড়া তালিকা ডিজিটাল মাধ্যমে দেওয়ার মতো বিভিন্ন দাবিও তুলেছে কংগ্রেস।