‘কেউ বলে বিপ্লবী, কেউ বলে ডাকাত’!
কয়েক দিনের ঘটনার প্রেক্ষিতে কথাটা মনে করাচ্ছেন রাজ্য প্রশাসনের এক কর্তা। সেই সঙ্গেই মানছেন, একটা বিভ্রান্তি তৈরি করে দিতে পেরেছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তার রেশ ছড়িয়েছে প্রশাসনিক মহলের অন্দরেও। কারণ, হঠাৎ গলা বাড়িয়ে সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীকে প্রবল আক্রমণ করছেন মমতা-তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। এমনকি, রীতিমতো সময় বেঁধে পুলিশ আধিকারিকদের হুঁশিয়ারিও দিচ্ছেন! বিজেপির সরকার ক্ষমতায় আসার ৬ মাসের মধ্যে প্রশ্ন ও বিরোধিতার সুর নানা শিবির থেকেই আছে। কিন্তু বিস্তর অভিযোগ ও বিতর্কে জর্জরিত এক নেতা এত ‘ঝাঁঝ’ কী ভাবে দেখাচ্ছেন, প্রশ্ন উঠছে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক শিবিরের বড় অংশে।
সাম্প্রতিক সময়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর আক্রমণের বর্শাফলক থেকেছে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকেই। সরকারি কর্মসূচি করতে গিয়েও তিনি বারেবারেই আগের জমানার মুখ্যমন্ত্রীর কাজকর্মের সঙ্গে তুলনা টানছেন, ইদানিং মমতাকে বিদ্রুপ করতে গিয়ে নানা মঞ্চে তাঁর মতো করে গানের কলিও ভাঁজছেন! এই রকম একটা ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে সিনেমার ভাষায় যাকে বলে ‘এন্ট্রি নেওয়া’, প্রায় সে ভাবেই ঢুকেছেন অভিষেক। তাঁর বিরুদ্ধে যে অভিযোগই থাক, ভাবনা-চিন্তায় তীক্ষ্ণতা নিয়ে প্রশ্ন নেই। শাসক শিবিরের শীর্ষ মহলের মতে, মমতা-তৃণমূলের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা বুঝতে পারছেন, তাঁকে ঘিরে ফেলার সব রকমের ঘুঁটি তৈরি। এই পরিস্থিতিতে রাজ্যের বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে ‘আপসহীন যুদ্ধে’র সুর তুলে তিনি আসলে ‘শহিদের তাস’ খেলতে চাইছেন। যাতে এই বার্তা থেকে যায় যে, মাথা নোয়াননি বলেই তাঁর উপরে দমন-পীড়ন নামিয়ে আনা হচ্ছে। যদিও অভিষেকের মতে, শাসক বিজেপির বিরোধিতা করলে তার মধ্যে ‘অস্বাভাবিকতা’ খোঁজার চেষ্টাই অস্বাভাবিক!
এমনিতে অভিষেকের নামে অভিযোগের অন্ত নেই। ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী থানায় থানায় অভিযোগ জানিয়ে রীতিমতো ক্লান্ত হয়ে গিয়েছেন! অভিযোগই হবে, তার পরে আর কিছু হবে না— এই ধারণা আস্তে আস্তে বিজেপি শিবিরের একাংশের মধ্যেও ছড়িয়ে যেতে শুরু করেছে। তবে সূত্রের খবর, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সাম্প্রতিক দিল্লি সফর ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে বৈঠকের পরে পরিস্থিতির বদল এসেছে। শাসক শিবিরের এক শীর্ষ নেতার কথায়, ‘‘যিনি এত কথা বলছেন, তাঁর আপ্ত-সহায়ক আগেই গ্রেফতার হয়েছেন। নানা তথ্য প্রশাসনের হাতে আছে। দুর্নীতির অভিযোগ যদি বাদও দেওয়া হয়, শুধু ডায়মন্ড হারবারের ‘সেবাশ্রয়’ নিয়ে যা কারবার আছে, তার থেকে বাঁচার রাস্তা নেই। বুঝতে পেরে গিয়েছেন বলেই হয়তো বেশি প্রতিবাদী হয়ে উঠছেন!’’
তৃণমূল কংগ্রেসের স্বত্ব ও প্রতীক নিয়ে লড়াইয়ের ফয়সালা এখনও হয়নি। নির্বাচন কমিশনে স্ট্যাম্প পেপারে সই করে হলফনামা জমা দেওয়ার পালা চলছে। মমতাও আসরে নেমে দলের বেশ কিছু নেতা-বিধায়ককে ফোন করে কাছে টানার চেষ্টা করছেন। বিজেপি ও দুই তৃণমূলেরই একাংশের আরও ব্যাখ্যা, এই পরিস্থিতিতে দলের নিচু তলাকে চাঙ্গা করার চেষ্টাও একই সঙ্গে চালাচ্ছেন অভিযেক। এত অভিযোগ, এত মামলা থেকেও তিনি যদি সোজা থাকতে পারেন, বাকিদের অসুবিধা কোথায়— এই বার্তা দেওয়ার চেষ্টা আছে।
বস্তুত, ‘প্রকাশ্যে বিজেপির সমালোচনা করেও আমি কী ভাবে মুক্ত’— বিজেপিকে আক্রমণ করেই এই বক্তব্য এমন ভাবে এনেছেন ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ, যে রাজনৈতিক শিবিরের একাংশের প্রশ্ন, তিনি কি প্রশাসনিক কোনও পদক্ষেপের ইঙ্গিত ঘুরপথে নিজেই দিয়ে রাখছেন? যদিও তাতে আমল না-দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী তথা সরকারের উদ্দেশে মমতা-তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদকের মন্তব্য, ‘‘পুলিশ, সিআইডি, ইডি-সিবিআই, সবই তো হাতে। কোনও এজেন্সি বাদ নেই। কিছু করার থাকলে করে দেখান!’’
তবে এ সবের অন্তরালে অন্য জল্পনাও আছে। বিধায়কদের সই জালিয়াতি থেকে শুরু করে নানা অভিযোগ যাঁর বিরুদ্ধে যোগ হয়ে চলেছে জমানা বদলের পরে, শাসক দলের নেতারা নানা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, তাঁর ‘রক্ষাকবচ’ কি আসলে ‘শত্রু শিবিরে’র উপরের দিকেই আছে? রাজ্য রাজনীতির সমীকরণে কি ‘ভারসাম্য’রেখে দিতে চাইছেন কেউ কেউ? শাসক শিবিরের শীর্ষ নেতার মন্তব্য, ‘‘সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ। ধৈর্য রাখতে হবে!’’