Advertisement
E-Paper

অক্ষয় তৃতীয়া ফিরে পাচ্ছে হারানো গৌরব

Akshaya Tritiya Getting back Lost gloryকুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শেষ। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ধর্মরাজ্য। কিন্তু সিংহাসনে বসেও মহারাজ যুধিষ্ঠিরের মনে শান্তি নেই। যুদ্ধে এত প্রাণের বিনাশ, সহায় সম্পদের বিপুল অপচয়। কান পাতলেই স্বামী, পুত্র, স্বজনহারা মানুষের কান্নায় কাতর ধর্মরাজ।

শেষ আপডেট: ২৮ এপ্রিল ২০১৭ ০১:২৮

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শেষ। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ধর্মরাজ্য। কিন্তু সিংহাসনে বসেও মহারাজ যুধিষ্ঠিরের মনে শান্তি নেই। যুদ্ধে এত প্রাণের বিনাশ, সহায় সম্পদের বিপুল অপচয়। কান পাতলেই স্বামী, পুত্র, স্বজনহারা মানুষের কান্নায় কাতর ধর্মরাজ। কে বহন করবে এই পাপের বোঝা? মহারাজ যুধিষ্ঠিরের মনের অস্থিরতা বুঝতে পেরে মহামুনি শতানিক তাঁকে শোনালেন এক কাহিনি।

অনেক কাল আগে এক ব্রাহ্মন ছিলেন। তিনি যেমন রাগী তেমন নিষ্ঠুর। ব্রাহ্মন হলেও ধর্ম বিষয়ে কোনও আগ্রহ ছিল না। একবার এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ ক্ষুধায় কাতর হয়ে তাঁর কাছে কিছু খেতে চাইলেন। শুনে সেই নাস্তিক ব্রাহ্মণ কিছু দেওয়া দূরে থাক, গরিব ব্রাহ্মণকে ভিখারি বলে গালমন্দ করে দরজা থেকেই তাড়িয়ে দিলেন। খিদে-তেষ্টায় কাতর ব্রাহ্মন অপমানিত হয়ে চলে যাবেন বলে পা বাড়িয়েছেন, এমন সময় তাঁর পথ রোধ করে দাঁড়ালেন ব্রাহ্মনী সুশীলা। অতিথির কাছে মার্জনা ভিক্ষা করে তিনি বললেন, ‘ভরদুপুরে অতিথি বিমুখ হয়ে ফিরে গেলে সংসারের অমঙ্গল হবে। গৃহের শান্তি-সমৃদ্ধি লোপ পাবে।’ ক্ষুধার্ত ব্রাহ্মণকে তিনি বললেন, ‘কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন নেই, আপনি এখানেই অন্ন জল গ্রহণ করবেন।’ কিছুক্ষনের মধ্যেই ব্রাহ্মনপত্নী অতিথি ভিক্ষুকের সামনে ঠাণ্ডা জল এবং অন্ন-ব্যঞ্জন পরিবেশন করলেন। মধ্যাহ্ন ভোজন শেষে যাওয়ার আগে সন্তুষ্ট ব্রাহ্মন সুশীলাকে আশীর্বাদ করে বললেন, ‘তোমার এই অন্নজল দান হোক অক্ষয় দান।” এরপর সেই ব্রাহ্মন চলে গেলেন।

তারপর কেটেছে বহু বছর। সেই ক্রোধী ব্রাহ্মণ বৃদ্ধ হয়েছেন। তাঁর মৃত্যু আসন্ন। তাঁকে নিয়ে যেতে একই সঙ্গে হাজির যমদূত ও বিষ্ণুদূতের দল। ব্রাহ্মণের মৃত্যু হওয়া মাত্র তাঁকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হবে এই নিয়ে তুমুল বিবাদ শুরু হল দুই দল দূতের মধ্যে। একদল তাঁকে বিষ্ণুলোকে নিয়ে যেতে চায়। অপরদলের দাবি, ওই পাপী ব্রাহ্মনের একমাত্র স্থান নরক। এরই মাঝে ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর ব্রাহ্মন একটু জল খেতে চাইলেন। যমদূতেরা তখন ব্রাহ্মণকে অতীতের কথা স্মরণ করিয়ে বললেন, ‘একদা তুমি তোমার গৃহ থেকে অতিথি ভিখারিকে জল না দিয়ে বিতাড়িত করে ছিলে। সুতরাং তুমি জল পাবে না।’ এই বলে তাঁরা ব্রাহ্মণকে নিয়ে সোজা যমরাজের কাছে নিয়ে গেলেন।

কিন্তু যম ব্রাহ্মণের দিকে তাকিয়েই চমকে উঠলেন। তাঁর দূতদের বললেন, ‘ওঁর মতো পুণ্যবান ব্রাহ্মনকে আমার কাছে এনেছ কেন? বৈশাখ মাসের শুক্লা তৃতীয়া তিথিতে এই ব্রাহ্মনপত্নী তৃষ্ণার্ত অতিথিকে অন্নজল দান করেছেন। এই দান অক্ষয় দান। স্ত্রীর পুণ্যে ইনিও পুণ্যাত্মা। সেই পুণ্যফলে ব্রাহ্মনের স্থান নরকে নয়, হবে স্বর্গে।’

কাহিনি শেষে শতানিক মুনি যুধিষ্ঠিরকে বললেন, ‘মহারাজ বৈশাখ মাসের শুক্লা তৃতীয়া তিথিতে ব্রাহ্মনকে অন্ন বস্ত্র জল দান করলে যাবতীয় পাপ থেকে মুক্তি লাভ করা যায়। এবং সেই দানের পুন্য অক্ষয় হয়ে থাকে।’ এই কাহিনি শুনে মহারাজ যুধিষ্ঠির কী করেছিলেন মহাভারতে সে কথার উল্লেখ না থাকলেও, মৎস্যপুরাণের এই কাহিনিই অক্ষয় তৃতীয়াকে ঘিরে বহুল প্রচলিত।

সোজা কথায় অক্ষয়তৃতীয়া হল চান্দ্র বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষের তৃতীয়া তিথি। অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি তিথি হল অক্ষয় তৃতীয়া। অক্ষয় শব্দের অর্থ হল যা ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না। বৈদিক বিশ্বাসানুসারে এই পবিত্র তিথিতে কোনও শুভকার্য সম্পন্ন হলে তা অনন্তকাল অক্ষয় হয়ে থাকে। যদি ভাল কাজ করা হয় তার জন্য লাভ হয় অক্ষয় পূণ্য। যদি খারাপ কাজ করা হয় তবে অক্ষয় পাপের বোঝা বয়ে বেড়াতে হয়। তাই শাস্ত্রের নির্দেশ, এ দিনের প্রতিটি কাজ খুব সাবধানে করা উচিত। খেয়াল রাখতে হবে, কোনও খারাপ কাজ, কোন কটু কথা যেন মুখ থেকে না বের হয়। কোনও কারণে যেন কারো ক্ষতি বা কাউকে আঘাত না দিয়ে ফেলি। তাই এ দিন যথাসম্ভব মৌন থাকা জরুরি। পূজা, জপ, ধ্যান, দান বা অন্যের মনে আনন্দ দেওয়ার মতো কাজ করা উচিত। যেহেতু এই তৃতীয়ার সব কাজ অক্ষয় থাকে তাই প্রতিটি পদক্ষেপ ফেলতে হয় সতর্ক ভাবে। এ দিনটা ভাল ভাবে কাটানোর অর্থ সাধনজগতের অনেকটা পথ এক দিনেই এগিয়ে যাওয়া।

তবে শতানিক মুনির গল্পের শেষে আরও একটু আছে। বিষ্ণুলোকে পৌঁছানোর পরে ভগবান বিষ্ণু সেই ব্রাহ্মনকে বলেন, তাঁর স্ত্রী মাত্র একবার অক্ষয় তৃতীয়ার দিনে ব্রাহ্মনকে অন্নজল দান করেছেন। কিন্তু সেই দান বা ‘অক্ষয়ব্রত’ পরপর আট বার করতে হবে। তবেই অক্ষয় পুণ্যলাভ হবে। এই বলে বিষ্ণু ব্রাহ্মনকে কী ভাবে অক্ষয় ব্রত পালন করতে হবে তা বিশদে বলে ফের মর্ত্যে পাঠিয়ে দেন। তাঁরা স্বামী-স্ত্রী মিলে আরও সাত বার অক্ষয় তৃতীয়ার দিনে বিষ্ণু কথিত পদ্ধতিতে অক্ষয়ব্রত পালন করেন। এই ব্রতের প্রধান উপকরণ হল যব। শুক্লা তৃতীয়া তিথিতে যব দিয়ে লক্ষী-নারায়ণের পুজো করে ব্রাহ্মনকে অন্ন, বস্ত্র, ভোজ্য, ফল ইত্যাদি দিয়ে বরণ করতে হয়। ব্রতীরা এ দিন যব দিয়ে তৈরি খাবার খান। এপার-ওপার দুই বাংলাতেই এখনও এই দিনে সেই রীতি মেনে পালন করা হয় অক্ষয়ব্রত।

সধবা মহিলারা (এয়ো) সূর্য ওঠার আগেই নদী ঘাটে ফুল, দূর্বা, বেলপাতা, সিঁদুর, সরষের তেল প্রভৃতি উপকরণ নিয়ে জড়ো হন। সূর্য এবং গঙ্গাদেবীকে আবাহন এবং পরিবারের মঙ্গল কামনার মধ্য দিয়ে স্নান সম্পূর্ণ করেন। গোত্রভেদে কোনও কোনও পরিবারে ‘সরিষা ধোওয়া’ রেওয়াজের প্রচলন রয়েছে। এই সরষে দিয়ে কাসুন্দি তৈরি করা শুরু হয়। ক্রমশ কমে আসছে ব্রত পালনের ক্ষেত্র। তবে স্বল্প পরিসরে হলেও গ্রাম বাংলায় এখনও এই ব্রত পালনের রেওয়াজ রয়েছে।

স্মার্ত রঘুনন্দন তাঁর ‘স্মৃতি তত্ত্বে’ অক্ষয়ব্রতের চারটি ভাগ করেছেন। অক্ষয়ঘট ব্রত, অক্ষয়সিঁদুর ব্রত, অক্ষয়কুমারী ব্রত এবং অক্ষয়ফল ব্রত। এই ব্রতগুলি চার বছর একটানা পালন করতে হয়। ব্রাহ্মন থেকে কুমারী, সধবা সর্বস্তরের মানুষকে জড়িয়ে অক্ষয়তৃতীয়া লৌকিক ধর্মাচরণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু প্রশ্ন জাগে বারো মাসে তেরো পার্বণের দেশে হঠাৎ অক্ষয় তৃতীয়ার মতো একটা মামুলি তিথিকে কেন এতটা গুরুত্ব দিয়ে ছিলেন শাস্ত্রকারেরা?

উত্তর শুনলে অবশ্য চোখকপালে উঠতে বাধ্য। সেই পৌরানিক যুগ থেকে অক্ষয়তৃতীয়ার দিনে কম করে এক ডজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছিল বলে জানা যাচ্ছে। বৈশাখ মাসের শুক্লা তৃতীয়া তিথিতে ঘটা কিছু তাত্পর্যপূর্ণ ঘটনা একনজরে—১) এদিনই বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার পরশুরাম জন্ম নেন পৃথিবীতে। ২) রাজা ভগীরথ গঙ্গাদেবীকে মর্ত্যে নিয়ে এসেছিলেন। ৩) সিদ্ধিদাতা গনেশ মহর্ষি বেদব্যাসের মুখে শুনে শুনে মহাভারত রচনা শুরু করেন। ৪) দেবী অন্নপূর্ণার আবির্ভাব ঘটে। ৫) সত্যযুগ শেষ হয়ে ত্রেতাযুগের সূচনা হয়। ৬) কুবেরের তপস্যায় তুষ্ট হয়ে মহাদেব তাঁকে অতুল ঐশ্বর্য প্রদান করেন। এদিনই কুবেরের লক্ষ্মী লাভ হয়েছিল বলে এ দিন বৈভব-লক্ষ্মীর পূজা করা হয়। ৭) এ দিনই ভক্তরাজ সুদামা শ্রীকৃষ্ণের সাথে দ্বারকায় গিয়ে দেখা করেন এবং সখার আনা সামান্য চালভাজা খেয়ে শ্রীকৃষ্ণ দুঃখমোচন করেন। ৮) দুঃশাসন দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ করতে যান এবং সখী কৃষ্ণাকে রক্ষা করেন শ্রীকৃষ্ণ। শরণাগতের পরিত্রাতা রূপে শ্রীকৃষ্ণ রক্ষা করেন দ্রৌপদীকে। ৯) এ দিন থেকেই পুরীধামে জগন্নাথদেবের রথযাত্রা উপলক্ষ্যে রথ নির্মাণ শুরু হয়। ১০) কেদারবদরী মন্দির ছ’মাস বন্ধ থাকার পর এই দিনেই ফের খোলা হয় মন্দিরের দরজা। দেখা যায় সেই অক্ষয়দীপ যা ছ’মাস আগে জ্বালিয়ে আসা হয়েছিল। ১১) ভগবান শ্রীকৃষ্ণের চন্দনযাত্রা শুরু হয় এই তিথিতে।

অক্ষয় তৃতীয়াকে ঘিরে সর্বশেষ সংযোজন, ব্যবসায়ীদের গণেশ পুজো বা নতুন খাতা। বাঙালি ব্যবসায়ীদের একটি অংশ অক্ষয়তৃতীয়াকে বেছে নিলেন পয়লা বৈশাখের বিকল্প হিসাবে। ক্রমশ সেই বিকল্প তিথি পেয়ে গেল আরও এক বাণিজ্যিক উৎসব মরসুমের তকমা। দোকানে হালখাতার উৎসবের পাশাপাশি ক্রেতাদের নানারকম উপহার, অলঙ্কার ব্যবসায় নানা ‘অফার’, ছাড় সব মিলিয়ে অক্ষয় তৃতীয়া যেন আবার নতুন করে ফিরে পাচ্ছে তার হারানো গৌরব।

Akshaya Tritiya

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy