ছাত্র রাজনীতির উস্কানির ধারা শুধু আটকে থাকছে না যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। যাদবপুরের ধাঁচে বারাসতে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ স্ট্রিট ক্যাম্পাসের দু’টি ঘটনা থেকেও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের ছাত্র সংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের ‘দখলদারি-রাজনীতির’ দিকেইআঙুল উঠছে।
বারাসতের ছাত্রাবাসের সিঁড়িতে ছাত্রদের মারধরের বিপজ্জনক একটি ভিডিয়ো সামনে এসেছে। অভিযোগ, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বেশ কয়েক জন বহিরাগত-সহ জনা পঞ্চাশের এবিভিপি-বাহিনী হস্টেলে তাণ্ডব চালায়। তাতে নিগ্রহের শিকার একটি ছাত্রকেই পরে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। হস্টেলের অন্য যে আবাসিকরা ওই ছাত্রকে হাসপাতালে ভর্তি করতে নিয়ে গিয়েছিলেন, তাঁদেরও পুলিশ গ্রেফতার করে। অনেকেরই অভিযোগ, যাদবপুরের ধাঁচে ছাত্রদের গোলমালের জেরে স্থানীয় বিধায়ককে কেন্দ্রে রেখে উস্কানি এবং তার পরের তাণ্ডবের মতোই বারাসতেও ‘বাড়াবাড়ি’ করেছে এবিভিপি। এবং শাসক দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে এ ক্ষেত্রে পুলিশ তাদের সহায় হয়েছে। এবিভিপি-র রাজ্য সম্পাদক নীলকণ্ঠ ভট্টাচার্যের অবশ্য পাল্টা দাবি, “বারাসতে আমরাই আক্রান্ত। তৃণমূল ছাত্র পরিষদের হাতে আমাদের ছেলেরাই মার খেয়ে গুরুতর আহত হয়েছে।”
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়েও মঙ্গলবার এবিভিপি এবং এসএফআই-এর কর্মী, সমর্থকদের বাগ্বিতণ্ডায় পরিস্থিতি উত্তাল হয়। এ ক্ষেত্রে এসএফআই ‘ভারত তেরে টুকড়ে হোগে’ বা কাশ্মীরের ‘আজ়াদি’র দাবিতেও স্লোগান দেয় বলে এবিভিপি-র কলকাতা মহানগর সম্পাদক তথা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের ছাত্র স্বাধীন হালদার তোপ দেগেছেন। তাঁর অভিযোগ, বন্দে মাতরম্ বিরোধী স্লোগানও তোলা হয়েছে। তবে এই ধরনের কোনও স্লোগানের ভিডিয়ো এবিভিপি নেতারা দেখাতে পারেননি। অনেকের মতে, এ ক্ষেত্রেও গোলমালের পরে দোষারোপের ‘যাদবপুর-মডেল’ কাজ করছে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের কথায়, “ছাত্র রাজনীতির দখলদারি কৌশলের এ এক নতুন মডেল। যারা আমার বিরোধী, তাদের দেশবিরোধী বলে দাগিয়ে দাও। যাদবপুরে এবিভিপি এই কৌশল আগেই নিয়েছে। কলকাতাতেও সেই চেষ্টাই চালাচ্ছে।”
অভিযোগ, বারাসতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীদের রাখি পূর্ণিমার একটি অনুষ্ঠান কী ভাবে বা কাদের নামে হবে তা নিয়ে কয়েক জন ছাত্রের মধ্যে গোলমাল বাধে। তার বদলা নিতে এবিভিপির সঙ্গে বহিরাগতেরা হস্টেলে ঢোকে বলে অভিযোগ। বারাসতের শিক্ষক, আধিকারিকেরা এই হামলার বিষয়ে স্থানীয় থানায় জানিয়েছেন। তবে হস্টেলে ঢুকে বহিরাগতদের দৌরাত্ম্যের পরে যাঁরা মার খেলেন, সেই ছাত্র, গবেষকদেরই পুলিশ গ্রেফতার করেছে বলে অভিযোগ। তবে এবিভিপি-র কয়েক জন ছাত্রও জখম হয়েছেন বলে তাঁরা মানছেন। কিন্তু সব মিলিয়ে শাসক দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে বারাসতে এবিভিপির সঙ্গে সংঘাতে জড়ানো চার জন ছাত্র, গবেষককেই পুলিশ গ্রেফতার করেছে। এক শিক্ষক বলেন, “যাদবপুরে রাজনৈতিক ভাবে স্পর্শকাতর পরিস্থিতিতে পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি। কিন্তু বারাসতে রাখঢাক ছাড়াই এবিভিপির প্রতিপক্ষদের নিশানা করেছে। ছাত্রদের গোলমালে এমন পুলিশি হস্তক্ষেপ এবং পক্ষপাতদুষ্টতা কাম্য নয়।”
পুলিশ জানায়, ধৃতদের মধ্যে রয়েছেন জ়ুলজির গবেষক আনিরুল ইসলাম, দর্শনের গবেষক রহমতুল্লা,লাইব্রেরি সায়েন্সের আবু সানা মণ্ডল, শাকিল মহাকুরা। নির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই তাঁদের গ্রেফতার করা হয়েছে। আহত আনিরুলকে বাকিরা বারাসতে হাসপাতালে অ্যাম্বুল্যান্সে করে ভর্তি করতে নিয়ে যান। অভিযোগ, সেই অবস্থায় তাঁদের গ্রেফতার করে পুলিশ। বারাসতের শিক্ষকেরাও মর্মাহত। দল নির্বিশেষে আহত ছাত্রদের তাঁরা পাশে ছিলেন। ধৃতেরা বুধবার জামিনে ছাড়া পান। আনিরুল বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণত শাসক দলের ছাত্র সংগঠনেরই দাপট বেশি। আগে টিএমসিপি ছিল। এখন এবিভিপি। আমি কোনও দলই করি না। হস্টেলে গবেষক ছাত্র হিসেবে অন্য ছাত্রদের মার খাওয়া আটকাতে গিয়েছিলাম।”
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা নিয়ে এসএফআইয়ের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির সম্পাদক অমিতকুমার ঘোষের দাবি, তাঁদের বিরুদ্ধে দেশ-বিরোধী স্লোগানের অভিযোগ মিথ্যা। তবে প্রাক্তন উপাচার্য তথা বিজেপির বন্দিত মনীষী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে কটাক্ষ করে কিছু স্লোগানের অভিযোগ তাঁদের বিরুদ্ধে উঠেছে। অনেকে মনে করেন, শ্যামাপ্রসাদকে নিশানা করে সেই সব স্লোগান আদৌ প্রয়োজনীয় ছিল না। অমিতের অভিযোগ, “একাধিক ক্ষেত্রে আমরা উপাচার্যকে কোনও স্মারকলিপি পেশ করতে গেলে আক্রান্ত হয়েছি।” এবিভিপিও এসএফআইয়ের নামে প্ররোচনার অভিযোগ এনেছে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দেবাশিস দাস বলেন, “দু’দল ছাত্রের তাৎক্ষণিক ঝগড়া। এই নিয়ে বেশি জটিলতা কাম্য নয়।” এসএফআইয়ের তরফে আজ, বৃহস্পতিবার তাঁদের নামে মিথ্যা অভিযোগের বিরুদ্ধে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দ্বারস্থ হওয়ার কথা বলা হয়েছে।