কেউই স্বচক্ষে তাঁকে ডিউটি করতে দেখেননি। অথচ, কাজের শংসাপত্র দিয়েছেন। কেন দিয়েছেন? প্রত্যেকেরই দাবি, ‘অন্যেরাও তো দিয়েছেন!’ ‘বিতর্কিত’ সেই চিকিৎসক অভীক দে-র সার্ভিস কোটায় স্নাতকোত্তর পড়ার সুযোগের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তে এমনই তথ্য উঠে এসেছে বলে খবর। চার সদস্যের তদন্ত কমিটির জমা দেওয়া প্রায় ১৫০ পাতার রিপোর্টের ছত্রে ছত্রে অভীককে ‘প্রভাবশালী’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সূত্রের খবর, তদন্তকারীদের পর্যবেক্ষণ, রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অলিখিত নিয়ন্ত্রক উত্তরবঙ্গ গোষ্ঠীর দাপুটে নেতা অভীক নিজের প্রভাবে একাধিক শংসাপত্র জোগাড় করেছিলেন। সেই সব শংসাপত্র দেওয়া আধিকারিকেরা অনেকেই পরবর্তী সময়ে স্বাস্থ্য দফতর, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন শীর্ষ পদে বসেছিলেন। সূত্রের আরও খবর, রিপোর্টে জানানো হয়েছে, ওই পদাধিকারীরা দাবি করেছেন, অন্য আধিকারিকের দেওয়া শংসাপত্র দেখে তাঁরাও দিয়েছেন। যদিও প্রথম পাওয়া বিভাগীয় প্রধানের শংসাপত্রের সই নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে তা বিশেষজ্ঞ দিয়ে পরীক্ষা করানোর কথা রিপোর্টে বলা হয়েছে।
বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজের ‘অ্যানেক্স’ অনাময় হাসপাতালে কাজের সুবাদে সার্ভিস কোটায় এসএসকেএমের শল্য বিভাগে অভীকের এমএস পড়ার সুযোগ পাওয়া নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘ দিনের। আর জি কর আন্দোলনের সময়ে তাঁকে নিলম্বিত করে স্বাস্থ্য দফতর। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন দুর্নীতির তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়। সেখানেও দোষ প্রমাণিত হয় বলে খবর। পরবর্তী সময়ে সার্ভিস কোটা পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক আদালতপর্যন্ত গড়ায়। এমনকি, বর্তমান স্বাস্থ্য-শিক্ষা অধিকর্তার তদন্তেও ‘অনিয়ম’ পাওয়া যায়নি অভীকের বিরুদ্ধে। তবে, সেই তদন্তে সাক্ষী হিসেবে থাকা এক জন ছাড়া বাকি প্রায় সকলেই অভীককে আগেই শংসাপত্র প্রদান করেছিলেন।
সেই ‘অনিয়ম’ না-পাওয়া নিয়ে বিতর্ক হওয়ায় কামারহাটির সাগর দত্ত মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ পার্থপ্রতিম প্রধানের নেতৃত্বে আর জি করের অধ্যক্ষ মানস বন্দ্যোপাধ্যায়, চিকিৎসক সোমনাথ দাস, কৌশিক মিত্রকে নিয়ে নতুন তদন্ত কমিটি গড়ে স্বাস্থ্য দফতর। ১০ অগস্ট থেকে তদন্ত শুরু হয়। বিভিন্ন নথি খতিয়ে দেখা, প্রায় ৩০ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ, পুলিশি পাহারায় অভীককে বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে এসে জিজ্ঞাসাবাদের শেষে গত ৩ সেপ্টেম্বর রিপোর্ট জমা পড়েছে স্বাস্থ্য দফতরে। যদিও কমিটির কেউ এ বিষয়ে মুখ খুলতে রাজি হননি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘সরকারি বিভাগীয় তদন্তের রিপোর্ট জমা পড়েছে। যত রকমের বেআইনি কার্যকলাপ থাকতে পারে, সবই তিনি করেছেন তৎকালীন প্রশাসন ও স্বাস্থ্য দফতরকে কাজে লাগিয়ে।’’ অনৈতিক ও বেআইনি ভাবে স্নাতকোত্তর ডিগ্রির কোটা অভীক ব্যবহার করেছিলেন বলেও স্পষ্ট করেছেন মন্ত্রী।
কী রয়েছে রিপোর্টে? সূত্রের খবর, ২০১৮ সালে স্বাস্থ্য ভবন থেকে বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজের অন্য এক জনকে অনাময় হাসপাতালে পোস্টিং দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রেডিয়ো-ডায়াগনোসিস বিভাগের আরএমও অভীকের পোস্টিং হয়েছিল স্থানীয় নির্দেশিকায়। অর্থাৎ, বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষ সেই নির্দেশ জারি করেছিলেন। ওই হাসপাতালে কাজে যোগ দেওয়া এবং রিলিজ় নেওয়া সংক্রান্ত কোনও নথি নেই। কোনও কর্মী তাঁকে দেখেছেন বলেও দাবি করেননি।
হাজিরা খাতায় পোস্টিং হওয়া অন্য চিকিৎসকের সই থাকলেও অভীকের নেই। যদিও তিনি বর্ধমান মেডিক্যালের হাজিরা খাতায় সই করতেন বলে দাবি করেছেন বলে খবর। কিন্তু বর্ধমান মেডিক্যাল থেকে অনাময়ের দূরত্ব প্রায় ৮ কিলোমিটার। আবার, বর্ধমান মেডিক্যালেরনির্দিষ্ট ওই বিভাগের হাজিরা খাতাও উধাও।
বিভাগীয় প্রধান, সুপার, অধ্যক্ষ থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য দফতরের এক শীর্ষ কর্তা— এত জনের শংসাপত্র কেন দরকার হয়েছিল, তা নিয়েও রিপোর্টে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে বলে খবর। কেউ কাজ করতে না দেখা সত্ত্বেও শংসাপত্র পেয়ে যাওয়া, সহজেই একাধিক শংসাপত্র জোগাড় করা, স্বাস্থ্য দফতরের ভিজিল্যান্সের ছাড়পত্র ছাড়াই ট্রেনি-রিজ়ার্ভের সুযোগ পাওয়ার বিষয়গুলিকে সামনে রেখেই রিপোর্টে অভীককে ‘প্রভাবশালী’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে বলে খবর। তবে অভীককে ফোন করা হলে তিনি ধরেননি, মেসেজেরউত্তর দেননি।