দুর্গাপুজোর মধ্যে বিজেপির বিরুদ্ধে বইয়ের স্টলে হামলা, মনীষীদের ছবি নষ্ট করার মতো যে অভিযোগ বামেরা তুলছে, শুক্রবার তা আরও বাড়ল। পক্ষান্তরে, রাজ্যের মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ পুরোটাই বামেদের ‘নাটক’ বলে পাল্টা সরব হয়েছেন। এরই মধ্যে, উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁয় বইয়ের স্টল করার বিষয়ে সিপিএমকে যে অনুমতি কলকাতা হাই কোর্ট দিয়েছিল, এ দিন তাতে স্থগিতাদেশ দিয়েছে প্রধান বিচারপতি রবীন্দ্র ভি ঘুগে ও বিচারপতি মহম্মদ শব্বর রশিদির ডিভিশন বেঞ্চ।
বনগাঁয় স্টল করার বিষয়ে সিপিএমকে অনুমতি দিয়েছিলেন হাই কোর্টের বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য। তাতেই স্থগিতাদেশ দিয়ে প্রধান বিচারপতি ঘুগে ও বিচারপতি রশিদির বেঞ্চ বলেছে, দলীয় দফতরের সামনেও টেবিল পেতে বই বিক্রি করা যাবে না। ডিভিশন বেঞ্চের প্রশ্ন, জমি সংক্রান্ত মামলা বিচারপতি ভট্টাচার্যের বিচার্য বিষয় কী ভাবে হল। মামলার শুনানিতে রাজ্যের অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল বিল্বদল ভট্টাচার্য সওয়াল করেছেন, সিঙ্গল বেঞ্চে ভুল তথ্য দিয়ে আদালতকে বিভ্রান্ত করেছে সিপিএম। বিচারপতি ভট্টাচার্যের পর্যবেক্ষণ নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন তিনি। রাজ্যের বক্তব্য, এটি পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার মামলা নয়। সংশ্লিষ্ট জমির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা পূর্ত দফতরের কাছে বইয়ের স্টল করার অনুমতি চেয়ে আবেদনই করা হয়নি। আদালতের নির্দেশের পরে কয়েকটি শিবির থেকে দাবি করা হয়, সর্বত্র স্টল বন্ধের কথা বলা হয়েছে। যদিও সিপিএমের আইনজীবী শামিম আহমেদ বলেছেন, “আদালত শুধু বনগাঁর স্টলকে নিয়ে নির্দেশ দিয়েছে। অন্য কোনও স্টল নিয়ে কিছু বলা হয়নি। সিপিএমের দফতরের সামনে ‘হিন্দু জাগরণ মঞ্চে’র প্যান্ডেল সরিয়ে নেওয়া উচিত বলেও জানিয়েছে ডিভিশন বেঞ্চ।” আদালতের নির্দেশ প্রসঙ্গে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম বলেছেন, “বিচারপতির নির্দেশের বিষয়ে মন্তব্য করা ঠিক নয়। তবে বেশির ভাগ বামপন্থী দলের দফতরে এমনিতেই বই পাওয়া যায়। আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছনোর জন্যই বাইরে বইয়ের স্টল করা হয়।”
এই আবহে অব্যাহত রয়েছে হামলার অভিযোগও। উদ্বোধনের আগেই দলের বোটানিক্যাল গার্ডেন এলাকার বইয়ের স্টল ভাঙা এবং সেখানে থাকা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, সুকান্ত ভট্টাচার্যের ছবি নষ্ট করে দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় সিপিএম নেতা সঞ্জয় পাশি। পরে ভাঙা কাঠামোতেই সিপিএম স্টল দিয়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার কুলপি, হুগলির আরামবাগে স্টলে ভাঙচুরের অভিযোগ করেছে সিপিএম। কুলপিতে বিকেলে ফের স্টলটি হয়েছে। বিজেপির দাবি, সিপিএম নেতা বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের হিন্দু-বিরোধী বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে হিন্দু জনসাধারণের প্রতিবাদ ছিল এটি। এন্টালিতে বিজেপি এবং মেদিনীপুর শহরে পুলিশ স্টল তৈরিতে বাধা দিয়েছে বলে সিপিএমের অভিযোগ। পুলিশ সূত্রে অবশ্য দাবি, মেদিনীপুর শহরের স্থানীয় পঞ্চুরচকের ওই স্টলের অনুমতি নেওয়া হয়নি। ঢাকুরিয়াতেও দলের স্টল স্থানীয় থানার আধিকারিকদের নেতৃত্বে তুলে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে সিপিআই।
সেখানেই আবার বসেছে বইয়ের আসর। — নিজস্ব চিত্র।
রাজ্যের মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ মেদিনীপুরে পাল্টা বলেছেন, “সবাই স্টল করতে পারেন। বই বিক্রিই তো হয় না! ২৫ বছর ধরে সেই বই-ই আছে। স্টল না-বলে, বই প্রদর্শনী বলুন!” তাঁর সংযোজন, “কিছু নাটক ক’রে, একটু খবরে আসার চেষ্টা।” পাশাপাশি, বিধানসভায় দাঁড়িয়ে দুর্গাপুজো না-বললে বামেদের স্টল করতে দেওয়া হবে না বলে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী যে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, তার প্রতিধ্বনি করে আর এক মন্ত্রী অর্জুন সিংহ বলেছেন, “দুর্গোৎসব বলে বোর্ড লাগাক, অসুবিধা নেই। কার্ল মার্ক্স, লেনিন নিয়ে বই বিক্রি করবেন? দিমাগি নকশাল তৈরি করবেন? যাঁরা দেশ ‘তেরে টুকড়ে’ হবে স্লোগান, প্যালেস্টাইনকে সমর্থন করেন, তাঁদের ভারতে জায়গা নেই। করতে দেওয়া হবে না (স্টল)।”
বইয়ের স্টলে হামলার অভিযোগ তুলেছে এসইউসি-ও। পূর্ব মেদিনীপুরের পাঁশকুড়া পুরাতন বাজার, মুর্শিদাবাদের বহরমপুরের গোরাবাজার, কলকাতার ট্যাংরা, বেহালার জেমস লং সরণি, হাওড়ার ব্যাতাইতলা, দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাধাকান্তপুর আটেশ্বরতলা-সহ নানা জয়গায় স্টলে ভাঙচুর চালানোর অভিযোগ করেছে তারা। শহরের কামারডাঙার সাধারণ দুর্গোৎসব সমিতির নাম দিয়ে পুজোয় ‘বামবধে’র বার্তা দেওয়া ফ্লেক্স টাঙিয়ে বামেদের স্টল করতে দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল। সেখানে এ দিন সিপিএমকে স্টল করতে বাধা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। পরে এসইউসি স্টল করতে গেলে তাদের হোর্ডিং, ব্যানার ছিঁড়ে দেওয়া হয় এবং দলের নেতা তপন মুখোপাধ্যায় আক্রান্ত হন বলে অভিযোগ। শেষমেশ আদালতের নির্দেশ থাকায় পুলিশ স্টলে করতে দিয়েছে বলে জানিয়েছেন এসইউসি নেতৃত্ব।