Advertisement
E-Paper

খ্রিস্টান প্রার্থনাসভায় পর পর হামলার অভিযোগ, পাল্টা নালিশ ধর্মান্তকরণের! ‘রাজধর্ম’ পালনের আশ্বাস দিলেন মন্ত্রী

বিসিপি-র অভিযোগ, খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের উপর আক্রমণের সাম্প্রতিকতম ঘটনাটি ঘটেছে গত শুক্রবার, ২ অক্টোবর, কেশপুরের ঢলারা গ্রামে। সে দিন দুপুরে রানা পরিবারের বাড়িতে গ্রামের আরও তিনটি পরিবার মিলে প্রার্থনা করছিল।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৮ অক্টোবর ২০২৬ ১৬:১০
Attacks on Christian minority Prayer Meetings over Conversion Allegations in West Bengal

খ্রিস্টান প্রার্থনা সভায় হামলার প্রতিকার চেয়ে সংখ্যালঘু কমিশনের দ্বারস্থ বিসিপি। —নিজস্ব চিত্র।

রাজ্যে পালাবদলের পরে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের উপরে একের পর এক হামলার ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ জানাল খ্রিস্টানদের সংগঠন বঙ্গীয় খ্রিস্টীয় পরিষেবা (বিসিপি)। তাদের দাবি, গত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে গোটা রাজ্যে অন্তত ৪০টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। প্রতিকার চেয়ে কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘু কমিশনের দ্বারস্থ হয়েছে বিসিপি। মঙ্গলবার চিঠি দেওয়া হয়েছে জাতীয় এবং রাজ্যের মানবাধিকার কমিশনকেও। সংগঠনের অভিযোগের কথা শুনে ‘রাজধর্ম’ পালনের আশ্বাস দিয়েছেন রাজ্যের সংখ্যালঘু উন্নয়ন মন্ত্রী ক্ষুদিরাম টুডু।

বিসিপি-র অভিযোগ, খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের উপর আক্রমণের সাম্প্রতিকতম ঘটনাটি ঘটেছে গত শুক্রবার, ২ অক্টোবর, কেশপুরের ঢলারা গ্রামে। সে দিন দুপুরে রানা পরিবারের বাড়িতে গ্রামের আরও তিনটি পরিবার মিলে প্রার্থনা করছিল। সোনালি রানার দাবি, এই সময় বেশ কয়েক জন তাঁদের বাড়িতে আসেন। সেই দলে বহিরাগতেরাই বেশি ছিলেন। প্রার্থনা করা নিয়ে আপত্তি জানানোর পাশাপাশি জোর করে ধর্মান্তকরণ করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ জানান তাঁরা। সোনালির বক্তব্য, ‘‘গত ছ’বছর ধরে প্রতি সপ্তাহের শুক্রবার আমাদের বাড়িতে প্রার্থনা হয়। জোর করে ধর্ম পরিবর্তনের কোনও বিষয়ই নেই।’’

ওই দলটি তাঁর বাড়িতে তাণ্ডব চালায় এবং তাঁর পনেরো বছরের ছেলে প্রতিবাদ করলে তাকে মারধর করে বলেও সোনালির অভিযোগ। ‘‘এই ঘটনা যাঁরা ঘটিয়েছেন, তাঁদের আমি চিনি। মেডিক্যাল পরীক্ষা করিয়ে কেশপুর থানায় অভিযোগ জানাতে গিয়েছিলাম। কিন্তু রাত ১১টা পর্যন্ত থানায় বসিয়ে রেখেও অভিযোগ নেওয়া হয়নি’’, দাবি সোনালির। পরের দিন অবশ্য তাঁরা অভিযোগ দায়ের করতে পেরেছেন। মামলাও হয়েছে আদালতে।

বিসিপি-র দাবি, কেশপুর কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের উপরে আক্রমণের প্রথম ঘটনা ঘটেছিল ৪ মে, ভোটগণনার দিনেই। তার পর থেকে গোটা রাজ্যে একের পর এক এইরকম ঘটনা ঘটেই চলেছে। সবথেকে বেশি হামলা হয়েছে দক্ষিণ ২৪ পরগনায়, ৯টি। তার পর পূর্ব এবং পশ্চিম মেদিনীপুরে ৬টি করে হামলার ঘটনা ঘটেছে। উত্তর ২৪ পরগনায় ৫টি, হাওড়ায় ৪টি, বাঁকুড়ায় ৩টি, পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমানে ২টি করে এবং পুরুলিয়া, হুগলি এবং খাস কলকাতায় একটি করে আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে, বলছেন বঙ্গীয় খ্রিস্টীয় পরিষেবার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হেরোদ মল্লিক। তাঁর কথায়, ‘‘অনেক এলাকায় কোনও বাড়িতে কয়েকটি পরিবারকে নিয়ে প্রার্থনা করার চল রয়েছে। এই বাড়িগুলোকে আমরা ‘প্রার্থনা হাউস’ বলি। বেছে বেছে সেগুলির উপরেই আক্রমণ করা হচ্ছে।’’

যাঁরা আক্রমণ চালিয়েছেন, তাঁরা নিজেদের বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের লোক বলে পরিচয় দিয়েছেন, দাবি বিসিপি-র। গত ১২ সেপ্টেম্বর বাঁকুড়ার জয়পুরের শাপুলডাঙা গ্রামের একটি ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে হেরোদ মল্লিক বলেন, ‘‘হামলার ভিডিয়ো তুলে তার বাছাই করা অংশ সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা হয়েছে। বলা হয়েছে, গরিব হিন্দুদের টাকার লোভ দেখিয়ে ধর্মান্তকরণ করা হচ্ছে। তাই ‘সবক’ শেখানো হল। পোস্টেই লেখা রয়েছে, কারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে। তবু পুলিশ কোনও ব্যবস্থা নেয়নি!’’

২৭ সেপ্টেম্বর মধ্যমগ্রামে রত্না অধিকারীর বাড়িতে হামলার ঘটনায় অভিযোগের আঙুল বিশ্ব হিন্দু পরিষদের দিকে। রত্নার দাবি, সে দিন সন্ধ্যায় কয়েক জন আত্মীয়কে নিয়ে প্রার্থনা করছিলেন তাঁরা। এমন সময় প্রায় একশো জনের একটি দল জোর করে বাড়ির ভিতরে ঢুকে প্রার্থনা বন্ধ করতে বলে। বাড়ির আসবাবপত্র ভাঙচুর করে। ধর্মগ্রন্থ ছিঁড়ে ফেলে। ‘‘আমাকে পেটে লাথি মেরে মাটিতে ফেলে দেয়। মুখে বলছিল, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ থেকে এসেছে। আমার মেয়ের সামনে পরীক্ষা। হুমকি দিয়েছে, পরীক্ষায় বসতে দেবে না। ভয়ে ঘরছাড়া হয়ে রয়েছি’’, রত্না বলেন।

বিশ্ব হিন্দু পরিষদের কলকাতা ক্ষেত্রের নৈতিক শিক্ষাপ্রমুখ চন্দ্রনাথ দাসের পাল্টা বক্তব্য, ‘‘ধর্মান্তকরণ হচ্ছে বলেই হামলা হচ্ছে। শত শত প্রমাণ দেব যে অর্থ, চাকরির লোভ দেখিয়ে খ্রিস্টান করা হচ্ছে। ভারতে অনেক ধর্ম আছে, খ্রিস্টান ধর্মের দরকার নেই। খ্রিস্টান ধর্ম ভারতে করা যাবে না, এটাই ঠিক কথা।’’ জয়পুরের শাপুলডাঙার ঘটনার ছবি যাঁরা সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছেন, তাঁরা নিজেদের দাবি করেছেন হিন্দু জাগরণ মঞ্চের সদস্য মঞ্চের দক্ষিণবঙ্গের সংগঠনমন্ত্রী তাপস বারিকের অবশ্য দাবি, ‘‘অন্য ধর্মের মানুষের ধর্মাচরণে বাধা দেওয়ার নির্দেশ সংগঠনগত ভাবে দেওয়া হয়নি। তবে ধর্মন্তকরণ হলে আপত্তি আছে।’’

প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ম পরিবর্তনের অভিযোগ অবশ্য উড়িয়ে দিচ্ছেন হেরোদ মল্লিক। ‘‘প্রতিটি ঘটনা যাচাই করা হোক, কোথাও কোনও ধর্মান্তকরণের বিষয় রয়েছে কি না’’, বলেন তিনি। একের পর এক হামলার ঘটনা ঘটলেও পুলিশ কোনও ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে অভিযোগ বিসিপি-র। হেরোদ মল্লিকের কথায়, ‘‘৪০টি ঘটনার মধ্যে ১১টি ক্ষেত্রে মাত্র এফআইআর হয়েছে। তাতেও কোনও গ্রেফতারি নেই।’’

‘‘পশ্চিমবঙ্গে খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক হামলার যে বয়ান তৈরি করা হচ্ছে, তার সঙ্গে বাস্তব তথ্যের কোনও মিল নেই,’’ ফেসবুকে দাবি করেছে রাজ্য বিজেপি। তাদের বক্তব্য, গির্জা বা খ্রিস্টান কোনও প্রতিষ্ঠানে হামলার কোনও অভিযোগ জমা পড়েনি। কয়েকটি জায়গায় প্রার্থনাসভাকে কেন্দ্র করে ‘স্থানীয় আপত্তির’ ঘটনা ঘটেছিল। প্রতিটি ক্ষেত্রেই পুলিশ শান্তিপূর্ণ ভাবে তা মিটিয়ে দিয়েছে।

রাজ্যে খ্রিস্টান ধর্মালম্বীদের উপরে আক্রমণ বাড়ছে এমন কোনও অভিযোগ কোনও সংগঠনের তরফে তাঁর কাছে আসেনি বলে জানাচ্ছেন রাজ্যের সংখ্যালঘু উন্নয়ন মন্ত্রী ক্ষুদিরাম টুডু। ‘‘কোনও থানায় এই সংক্রান্ত লিখিত অভিযোগ হয়েছে, এমন কোনও তথ্য পুলিশও আমার দফতরকে জানায়নি। অভিযোগ পেলে এবং তার বাস্তবতা থাকলে সংবিধান মেনে নিশ্চয়ই ব্যবস্থা নেব’’, বলেন তিনি।

বিসিপি নেতাদের দাবি, মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার জন্য সময় পেয়েও দেখা করার সুযোগ পাননি তাঁরা। সেই কারণেই বাধ্য হয়ে সংখ্যালঘু এবং মানবাধিকার কমিশনের দ্বারস্থ হয়েছেন। মন্ত্রীর কথায়, ‘‘হতে পারে ব্যস্ততার কারণে দেখা করতে পারিনি। সাত-দশ দিন আগে থেকে সময় নিলে নিশ্চয়ই দেখা করে তাঁদের অভিযোগ শুনব। চেয়ারে যখন রয়েছি, তখন আমি সকলের মন্ত্রী। রাজধর্ম পালন করার জন্যই তো এখানে আছি।’’

Religious Conversion Christians

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy