বিপদ এখন বেশি। সুযোগও এখন বেশি! পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতির ‘গুণগত রূপান্তরে’র প্রেক্ষিতে আরএসএস-বিজেপির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক লড়াইয়ের জন্য দলের কর্মীদের তৈরি হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে সিপিএম।
সিপিএমের দলীয় অভিমুখ ঠিক হয় সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে পার্টি কংগ্রেস এবং রাজ্য স্তরে রাজ্য সম্মেলন থেকে। বাংলায় ২৭তম রাজ্য সম্মেলন হয়েছিল ডানকুনিতে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে। তখন ক্ষমতায় ছিল তৃণমূল কংগ্রেস। বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলকে সরিয়ে বিজেপির রাজ্যে প্রথম বার ক্ষমতায় আসা এবং তার পরে দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির প্রাথমিক পর্যালোচনা করে দলের রাজ্য ও জেলা কমিটির সদস্যদের আরএসএস-বিজেপির মোকাবিলায় উপযুক্ত আন্দোলন গড়ে তোলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে সিপিএমের তরফে। কল্যাণীতে রাজ্য কমিটির বিগত বর্ধিত অধিবেশনে এই সংক্রান্ত যে রিপোর্ট পেশ হয়েছিল, তারই ভিত্তিতে আগামী ১৫ মাসের ‘আবশ্যিক কাজে’র ধারা ঠিক করে পাঠানো হচ্ছে জেলায় জেলায়।
বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরেই রাজ্যের নানা জায়গায় বামেদের উপরে আক্রমণের ঘটনা ঘটছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন নতুন পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে গণ-আন্দোলন গড়ে তোলার পাশাপাশিই দলের নেতা-কর্মীদের মতার্দশগত অবস্থান পোক্ত করার দিকে নজর দিচ্ছে সিপিএম। বস্তুত, মতাদর্শের পাঠ ঝালিয়ে নেওয়ার পালা শুরু হচ্ছে শীর্ষ স্তর থেকেই। সিপিএম নেতৃত্বের বিশ্লেষণ, দক্ষিণপন্থী শক্তি বরাবরই বামপন্থীদের আক্রমণের লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেয়। আরএসএস-বিজেপি দেশ জুড়েই আগ্রাসন বাড়াচ্ছে, তার মোকাবিলায় মতাদর্শ ধারালো করা জরুরি। সূত্রের খবর, সে দিকে নজর রেখেই অক্টোবরের শেষ দিক থেকে দু’দফায় সিপিএমের কেন্দ্রীয়কমিটির সদস্যদের দিল্লিতে আবাসিক শিবির করা হবে মতাদর্শগত প্রশিক্ষণ ও আলোচনার জন্য। এই রাজ্য থেকে কেন্দ্রীয় কমিটির ১৩ সদস্য দু’দলে ভাগ হয়ে দুই শিবিরে অংশগ্রহণ করবেন। পরে তাঁরা আবার রাজ্যে ফিরে রাজ্য ও জেলা কমিটির নেতাদের জন্য এই ধরনের ‘ক্লাস’ করবেন। তার আগে ৭-৯ অক্টোবর আছে কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক।
সিউড়িতে সিপিএমের দফতরের সামনে ‘হনুমান চালিশা’ পাঠ বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও বজরং দলের। — নিজস্ব চিত্র।
সিপিএম সূত্রের খবর, বর্ধিত অধিবেশনের রিপোর্ট উদ্ধৃত করে জেলায় জেলায় দলের বার্তায় বলা হচ্ছে, ‘রাজ্যে পরিস্থিতির গুরুতর পরিবর্তনের মর্মবস্তু সমগ্র পার্টিকে সঠিক ভাবে উপলব্ধি করতে হবে। রাজ্য কমিটির সদস্য ও জেলা কমিটি সদস্যদের প্রকৃত নেতৃত্ব হিসেবে, এক দিকে নিজেদের উন্নত মানের কমিউনিস্ট হিসেবে গড়ে তোলার প্রশ্নে আরও যত্নবান হতে হবে, এরই সঙ্গে পরিস্থিতি উপযোগী শ্রেণি ও গণ-আন্দোলন (নতুন নতুন পদ্ধতির উদ্ভাবনা-সহ) গড়ে তুলে আরএসএস-বিজেপির আক্রমণকে মোকাবিলা করেই অগ্রসর হতে হবে’। বর্ধিত অধিবেশনের রিপোর্টে আরও বলা হয়েছিল, ‘রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের পরে পরিস্থিতির গুণগত রূপান্তর ঘটেছে। রাজ্যে এখন প্রত্যক্ষ ভাবে আরএসএস-বিজেপি’র শাসন। রুটি-রুজি-অধিকার-বাসস্থান সমস্তই প্রবল আক্রমণের মুখে। এর বিরুদ্ধে ছাত্র, যুব, মহিলাদের লড়াইয়ের শক্তি বাড়ছে’।
জমানা বদলের পরে আক্রমণের মুখে দলের শ্রেণিভিত্তিক চার সংগঠন— শ্রমিক, খেতমজুর, কৃষক ও বস্তি সংগঠন সংহত ভাবে কাজ করছে এবং আরও বেশি করে প্রতিরোধী আন্দোলন গড়ে উঠছে বলে সিপিএম নেতৃত্বের মত। পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী বলছেন, ‘‘রাজ্য জুড়ে গুন্ডাগিরি, শিক্ষাঙ্গনে মত্ত হস্তীর তাণ্ডব চলছে। আরএসএস-বিজেপির বাহিনী মুক্ত চিন্তাকে ভয় পাচ্ছে, লাল আতঙ্কে ভুগছে! এই সময়ে মতাদর্শে জোর দিতে হবে, যথাসম্ভব মানুষকে সঙ্গে নিয়ে আমাদের রাস্তায় থাকতে হবে।’’