E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

বিরোধীর ঘাঁটি ঘাঁটার অঙ্কে কি ওয়ার্ড ভাগ, প্রশ্ন দ্রুত পুনর্বিন্যাসে

বিধানসভায় বিল পাশ করে আগের আইনে সংশোধনী এনে কলকাতায় ১৪৪ থেকে ওয়ার্ড বাড়িয়ে ২০৯ এবং হাওড়া পুর-নিগমে ৫০ থেকে বাড়িয়ে ৬৮ করা হয়েছে।

সন্দীপন চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ২৩ অগস্ট ২০২৬ ০৭:০০
কলকাতা পৌরসংস্থা।

কলকাতা পৌরসংস্থা। —ফাইল চিত্র।

ছিল ১৪৪। হবে ২০৯। সরকারি ভাবে বলা হচ্ছে, আরও উন্নত পরিষেবা এবং উন্নয়নের লক্ষ্যে কলকাতা পুর-এলাকাকে বিভিন্ন ওয়ার্ডে সুষম বণ্টন করা হচ্ছে। তার জন্যই বাড়ছে কলকাতা পুর-নিগমের ওয়ার্ড সংখ্যা। কিন্তু সীমানা পুনর্বিন্যাসের গভীরে গেলে সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে শাসক পক্ষের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের! বিরোধী পক্ষের ঘাঁটিকে আগে ঘেঁটে দাও— এই কৌশলই এখানে কাজ করছে বলে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সূত্রে ইঙ্গিত মিলছে।

বিধানসভায় বিল পাশ করে আগের আইনে সংশোধনী এনে কলকাতায় ১৪৪ থেকে ওয়ার্ড বাড়িয়ে ২০৯ এবং হাওড়া পুর-নিগমে ৫০ থেকে বাড়িয়ে ৬৮ করা হয়েছে। সীমানা পুনর্বিন্যাস এবং সংরক্ষণ কী ভাবে কার্যকর হবে, এর পরে তা দেখার কথা রাজ্য নির্বাচন কমিশনের। নতুন ওয়ার্ডের বুথভিত্তিক চিত্র এখনও পরিষ্কার হয়নি। ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের যে খসড়া তালিকা সরকারি বিজ্ঞপ্তি দিয়ে প্রকাশ করা হয়েছিল, তার উপরে আপত্তি বা মতামত জানানোর জন্য হাওড়ার ক্ষেত্রে ১২ অগস্ট এবং কলকাতায় ১৩ অগস্ট বিকাল ৫টা পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছিল। অথচ সেই সময়সীমা ফুরনোর আগেই ১২ তারিখ দুপুরের মধ্যে বিধানসভায় জোড়া সংশোধনী কী ভাবে পাশ করিয়ে নেওয়া হল, প্রশ্ন তুলছে বিরোধীরা। তবে সে সবই পদ্ধতিগত প্রশ্ন। রাজনৈতিক প্রশ্নও আছে নেপথ্যে।

দীর্ঘ বিরতির পরে দেশে জনগণনা শুরু হয়েছে এখন। সেই প্রক্রিয়া শেষ হলে জনবসতির ঘনত্ব অনুযায়ী সীমানা পুনর্বিন্যাস হবে, এটাই যুক্তিগ্রাহ্য পদক্ষেপ হতে পারত। কলকাতা পুরসভার ভোট করে নতুন বোর্ড গড়ার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করার কথা ডিসেম্বরে। এর মধ্যে জনগণনার তথ্য না-এলে পুরনো ওয়ার্ডের হিসেবে নির্বাচন করাতে কোনও সমস্যা ছিল না বলেই বিরোধীদের দাবি। তবে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক শিবিরের একাংশের মতে, সমস্যা আসলে অন্যত্র। কলকাতা পুর-এলাকার বিদায়ী মানচিত্র ধরলে কম-বেশি ৪০টি ওয়ার্ডে সংখ্যালঘু বা মুসলিম ভোটের ভূমিকা জয়-পরাজয়ের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক বা নির্ণায়ক। সেই হিসেবে ধরলে রাজ্যে এখনকার শাসক দল বিজেপিকে কলকাতার শাসক হতে গেলে ১৪৪ নয়, আসলে ১০০ ওয়ার্ডের মধ্যে লড়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সংখ্যা ৭৩-এ পৌঁছতে হত। আর সেখানে মাঠ বড় করে নিলে নিজেদের যেমন সুবিধা, তেমনই বিরোধীদের ঘাঁটিকে ভোটে আগেই নাড়িয়ে দেওয়া যায়!

কলকাতার এক প্রাক্তন পুর-পারিষদ তথা তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়কের কথায়, ‘‘উত্তর, দক্ষিণ বা পশ্চিম দিকের সঙ্গে রাস্তার নাম উল্লেখ করে আপাতত নতুন ওয়ার্ডের তালিকা দেওয়া হয়েছে। বুথের হিসেব না-পেলে পরিষ্কার ছবি পাওয়া সম্ভব নয়। কলকাতার সব ওয়ার্ডে আমরা প্রার্থী দেওয়ার জায়গায় থাকব কি না, এখনই জানি না। তবে যেখানে বিরোধীদের পক্ষে সুবিধাজনক জায়গা ছিল, সেখানে যে ওয়ার্ড ভেঙে হিসেব পাল্টে দেওয়া হচ্ছে, এটা বোঝা যাচ্ছে।’’ তাঁর আরও সংযোজন, প্রাথমিক ভাবে মনে হচ্ছে, এমন ভাবে নতুন ওয়ার্ড সাজানো হচ্ছে, যেখানে বিজেপি তাদের ‘সুবিধা’র জায়গা থেকে বেশি পুর-প্রতিনিধি জিতিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবে।

পুরনো হিসেবে কলকাতার ৩৯ ও ৪৩ নম্বর ওয়ার্ড ছিল মুসলিম-অধ্যুযিত। পুরনো ৩৯ ওয়ার্ডের কলাবাগান এলাকা ভেঙে পুরনো, হিন্দু-প্রধান ৪০ নম্বর (কলেজ স্ট্রিট এলাকা) ওয়ার্ডে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে নতুন হিসেবে। সেই এলাকা এখন হবে নতুন ৫৫ নম্বর ওয়ার্ড। আর প্রদেশ কংগ্রেস দফতর বিধান ভবন যে রাস্তায়, সেই লালমোহন ভট্টাচার্য লেন ঢুকে যাবে ৬৯ নম্বর ওয়ার্ডে। এমন উদাহরণ আরও পাওয়া যাচ্ছে। এবং সে দিকে ইঙ্গিত করেই প্রদেশ কংগ্রেসের এক নেতার মন্তব্য, ‘‘মুসলিম ভোটে বিরোধীদের আসন পাওয়ার রাস্তা বিজেপি যথাসম্ভব কঠিন করতে চায়। মুসলিম পুর-প্রতিনিধির সংখ্যাও কমে আসবে।’’ সিপিএমের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর এক সদস্যের বক্তব্য, ‘‘বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশ‌োধনের (এসআইআর) মাধ্যমে বিজেপি আসলে ভোটার-ভিতটাই ওলট পালট করেছিল। পুরসভার ভোটের আগে সেই ভাবেই ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের ছক সাজানো হচ্ছে!’’

পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল বা বিজেপির বিধায়ক তথা প্রাক্তন পুর-প্রতিনিধি সজল ঘোষের ব্যাখ্যা, বড় বড় ওয়ার্ড থাকলে পরিষবা দিতে সমস্যা হয়। টাকা খরচেও টান পড়ে। পুনর্বিন্যাস হচ্ছে উন্নততর পরিষেবা দেওয়ার লক্ষ্যে। তবে রাজ্য বিজেপির এক শীর্ষ নেতার মন্তব্য, ‘‘সবটা হয়তো নিখুঁত অঙ্ক কষে হচ্ছে না। তবে শাসক দলে থাকার কিছু সুবিধা তো থাকবেই!’’

কলকাতা পুরসভার ওয়ার্ড ছড়িয়ে রয়েছে এমন ১৭টি বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে ১০টিই (কাশীপুর-বেলগাছিয়া, শ্যামপুকুর, মানিকতলা, জোড়াসাঁকো, রাসবিহারী, ভবানীপুর, টালিগঞ্জ, যাদবপুর, বেহালা পূর্ব ও পশ্চিম) এ বার জিতেছে বিজেপি। বাকি ৭টি ( চৌরঙ্গি, এন্টালি, বেলেঘাটা, বালিগঞ্জ, বন্দর, কসবা ও মেটিয়াবুরুজ) রয়েছে তৃণমূলের দখলে। ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের পরে বিধানসভা কেন্দ্রওয়াড়ি বিন্যাসও বদলাবে।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Howrah Municipal Corporation corporation

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy