অপরাধী বেপরোয়া হলে সরকারও বেপরোয়া হবে! বিশেষত, মহিলাদের উপরে অত্যাচার বা নৃশংস হত্যার ঘটনা হলে তো বটেই। বিতর্ক যেমনই হোক, এই পথ বেছে নিয়েছে রাজ্যের নতুন সরকার। প্রশাসনিক মহলের একাংশে যাকে বলা হচ্ছে, ‘রেট্রিবিউশন মডেল’! অন্যায়ের প্রতিশোধের দায়িত্ব যেখানে প্রশাসনই তুলে নিচ্ছে।
রাজ্যে জমানা বদলের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক-সহ গোটা দর্শনই এখন বদলে গিয়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরের পরে যার ইঙ্গিত মিলছে উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটা এবং মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ানে একই দিনে জোড়া এনকাউন্টারের ঘটনায়। আদালতে অপরাধ প্রমাণিত এবং দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগে পুলিশই যেখানে অভিযুক্তকে ‘খরচ’ করে দিচ্ছে! বিজেপি-শাসিত উত্তরপ্রদেশে যা আগে থেকেই করে দেখাচ্ছে যোগী আদিত্যনাথের সরকার। শুধু এনকাউন্টারই নয়, বেহালার সরশুনায় প্রেম-ঘটিত একটি বিবাদে এক পরিবারের তিন জনকে নগ্ন করে হাঁটানোর অভিযোগ উঠেছে যে পরিবারের বিরুদ্ধে, সেই অভিযুক্তদের তিন জনকে খালি গায়ে কোমরে দড়ি দিয়ে এলাকায় ঘুরিয়েছে পুলিশই। বিরোধীরা সরব, নানা প্রশ্ন তুলে বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন ‘ক্যাঙ্গারু কোর্টে’র দৃষ্টান্ত টানছেন। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এত সব ঘটনার পরেও রাতে ভবানী ভবনে গিয়ে পুলিশকে ‘প্রয়োজন মতো’ হাত খুলে কাজ করতে নির্দেশ দিয়ে এসেছেন। সূত্রের খবর, তার আগে দিল্লিতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করে এসেছেন।
গাইঘাটা ও ধুলিয়ান এনকাউন্টার নিয়ে প্রাথমিক ভাবে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু বলেছেন, ‘‘এই নিয়ে আমার বক্তব্য রাখার কথা নয়। এনকাউন্টারের বিষয়টি আমার এক্তিয়ারের মধ্যে পড়ে না। বিষয়টি পুলিশ-সিআইডি দেখছে।’’ পরে তাঁর সংযোজন, ‘‘আইন হাতে তুলে নিলে পুলিশ যা করার, করবে। আইনের শাসন আমরা প্রতিষ্ঠা করব। বোন, দিদি, মায়েদের সঙ্গে কিছু ঘটলে পুলিশ নির্মম হবে। আমি পুলিশের পাশেই দাঁড়াব।’’
বিধানসভায় পাশ হয়ে গেলেও ‘গুন্ডা-দমন’ বিলের সব অংশ এখনও কার্যকর হয়নি। ধর্ষণের ঘটনার ক্ষেত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায় পাশ হওয়া ‘অপরাজিতা’ বিলও রাষ্ট্রপতির সম্মতি পায়নি। কিন্তু শুভেন্দুর সরকার বার্তা দিতে চাইছে, আইন-বিধি যা-ই থাক, গুন্ডা দমনে তারা কঠোরতম মনোভাব নেবে। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘‘আরও একটু সময় দিন, গোটা রাজ্য গুন্ডামুক্ত করে দেওয়া হবে!’’
এনকাউন্টারের ঘটনার প্রেক্ষিতে সরব হয়েছেন মমতা-তৃণমূলের সৌগত রায়, কুণাল ঘোষ, গণতান্ত্রিক তৃণমূলের মদন মিত্র, সিপিএমের মহম্মদ সেলিম, কংগ্রেসের অধীর চৌধুরী, এসইউসি-র চণ্ডীদাস ভট্টাচার্যেরা। গভীর রাতেই কেন ঘটনার পুনর্নির্মাণ, হেফাজতে থাকা অপরাধী কী ভাবে বারবার পুলিশের অস্ত্রের নাগাল পাচ্ছে, কেন ভিডিয়োগ্রাফি থাকছে না, অপরাধী পালানোর চেষ্টা করলেও পুলিশের গুলি কেন প্রাণঘাতীই হচ্ছে— প্রশ্ন বিস্তর। কিন্তু শাসক পক্ষ সে সবে আমল দিতে নারাজ।
রাজ্য প্রশাসনের এক কর্তার মতে, ‘‘সব রকম বিধি বা ‘প্রোটোকল’ মেনে ধর্ষণ-খুনের মতো ঘটনা মোকাবিলার চেষ্টা এত বছর ধরে হয়ে এসেছে। তার মধ্যে কামদুনির মতো ঘটনায় ফাঁক গলে অপরাধীদের বেরিয়ে যাওয়ার দৃষ্টান্তও আছে। এখন অন্য কায়দায় চেষ্টা করে দেখা হচ্ছে। সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েই প্রশ্ন বা বিতর্ক থাকে। এনকাউন্টারেও আছে। তবে এর জেরে সাধারণ, নিরীহ মানুষের ক্ষতি যাতে হয়, সেটা খেয়াল রেখে চললে কাজ হতে পারে। অন্য রাজ্যে অনেকটাই কাজ কিন্তু হয়েছে।’’
কেউ কেউ মনে করিয়ে দিচ্ছেন, নিউ ইয়র্কের টুইন টাওয়ারে জঙ্গি বিমান-হানার পরে ভাটপাড়ায় একটি সভার শেষে জ্যোতি বসু বলেছিলেন, ‘‘দ্য ইউএস ইজ় গেটিং এ টেস্ট ইফ ইটস ওন মেডিসিন!’’ তখন তিনি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। নন্দীগ্রাম-পর্বে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের মন্তব্য ছিল, ‘‘দে হ্যাভ বিন পেড ব্যাক ইন দেয়ার ওন কয়েন!’’ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু তাঁর মতো করে বলছেন ‘কর্মফল’। এবং সেই ফল ফলানোর দায়িত্ব প্রশাসনের হাতে তুলে দিয়েছেন।
অতীতে নানা ঘটনা এবং নানা মন্তব্য থাকলেও সে সব জমানায় এনকাউন্টার নিয়ে সরকারের কোনও সুনির্দিষ্ট অবস্থান ছিল না। জঙ্গলমহলে যৌথ বাহিনা মাওবাদী নেতা কিষেণজি’কে ঘিরে ফেললেও মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব চূড়ান্ত অভিযানের অনুমতি দেননি। কারণ, মাওবাদীদের হাতে অপহৃত সাঁকরাইল থানার ওসি অতীন দত্তের মা-কে তিনি ‘কথা’ দিয়েছিলেন, ছেলেকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনবেন। আবার ইউপিএ আমলে মাওবাদী নেতা আজ়াদের এনকাউন্টারে হত্যার প্রতিবাদে লালগড়ে গিয়ে সভা করলেও মুখ্যমন্ত্রী মমতার জমানার শুরুর দিকেই কিষেণজি’র এনকাউন্টার হয়েছিল। তাঁর সময়ে গত বছরই উত্তর দিনাজপুরে বিচারাধীন বন্দি গুলি চালিয়ে পালানোর চেষ্টা করেছিল বলে অভিযোগে এনকাউন্টার হয়েছিল। তৎকালীন ডিজি রাজীব কুমার পুলিশের পক্ষে জোরালো সওয়াল করেছিলেন। জমানা বদলের পরে বর্তমান সরকার বুঝিয়ে দিচ্ছে, বিতর্ক সত্ত্বেও তাদের মনোভাব স্পষ্ট।
মূল ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবারের লোকজন পুলিশের পদক্ষেপের প্রায় পক্ষেই দাঁড়ানোয় সরকারের ‘স্বস্তি’ও আছে। আর জি করে নিহত চিকিৎসকের মা ও বিজেপির বিধায়কও বলেছেন, ‘‘আমার মেয়ের ঘটনার সময়েও এই রকম হলে ভাল হত!’’ রাজ্যের মন্ত্রী দিলীপ ঘোষের কথায়, ‘‘অনেক তো হয়েছে। মানুশের ভরসা ফেরাতে কিছু অপ্রিয় কাজ পুলিশকে করতে হবে!’’