তোলাবাজির জন্য তৃণমূল সরকারের বদনাম হয়েছিল। সেই একই রোগ যাতে তাঁদের দলেও বাসা না-বাঁধে, রাজ্যে সরকার গঠনের পরে প্রথম বার পশ্চিমবঙ্গ সফরে এসে এমনই বার্তা দিলেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীন। তাঁর উপস্থিতিতেই দলীয় বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী থেকে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যও আবার বার্তা দিয়েছেন, অনিয়মে দলের কেউ যুক্ত থাকলে রেয়াত করা হবে না। পাশাপাশি, নিতিন জোর দিয়েছেন সংগঠন-জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে আরও সমন্বয়েও।
নিতিন রবিবার সকালে শহরে এসে ‘মান কি বাত’ অনুষ্ঠান শুনেছেন এবং তিন পর্বে সাংগঠনিক বৈঠক করেছেন। প্রথমে রাজ্যে সংগঠনের পদাধিকারী ও জেলা সভাপতি, পরের ধাপে বিধায়ক ও সাংসদ এবং শেষ ধাপে রাজ্যের মন্ত্রীদের সঙ্গে আলাদা করে বৈঠক করেছেন নিতিন। তিনটি বৈঠকেই ছিলেন শুভেন্দু, শমীক। সূত্রের খবর, বৈঠকে বিজেপির নানা স্তরের নেতাদের বিরুদ্ধে যে তোলাবাজির অভিযোগ উঠছে, সেই প্রেক্ষিতে কড়া বার্তা দিয়েছেন নিতিন। তাঁর বার্তা, দলে থেকে তোলাবাজি চলবে না। আগের সরকারের ‘দুর্নাম’ হয়েছিল এই জন্য। বিজেপি-ও যাতে সেই দোষে দোষী না-হয়, সে বিষয়ে নেতা-কর্মীদের সতর্ক করে দিয়েছেন নিতিন। তাঁর উপস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রীও বলেছেন, ‘কেউ আবাসের নামে, সরকারি প্রকল্প পাইয়ে দেওয়ার নামে টাকা তুলবেন, এটা হবে না। এর সঙ্গে দলের কেউ যুক্ত থাকলেও, রেয়াত করা হবে না।’ উদাহরণ হিসাবে দক্ষিণ ২৪ পরগনা থেকে একটি মণ্ডলের সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে আবাসের বাড়ির বিনিময়ে এক লক্ষ টাকার অভিযোগ জমা পড়েছে জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর বার্তা, ‘বিধায়ককে দিয়ে অভিযোগ খতিয়ে দেখব। সত্যি হলে আজ রাতেই হাজতে পুরে দেওয়া হবে।’
সূত্রের খবর, প্রথম বৈঠকেই শুভেন্দু রাজ্য সরকারের প্রথম চার মাসের কাজের বিবরণ দিয়েছেন। জেলা সভাপতি ও রাজ্যে দলের পদাধিকারীরা সরকারের নানা প্রকল্পের প্রশংসা করেন। সূত্রের খবর, এই প্রেক্ষিতেই নিতিন বলেছেন, ‘জেলা সভাপতিরা সেলস্ম্যান নন। সরকারি প্রকল্পের প্রশংসা করা তাঁদের কাজ নয়। তাঁদের কাজ সরকারি প্রকল্পকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং তার পরে মানুষের প্রতিক্রিয়া জেনে দলকে জানানো।’ সূত্রের দাবি, প্রতি দিন গুচ্ছ গুচ্ছ অভিযোগের চিঠি কেন তাঁর, প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি তথা সাংসদ রাহুল সিন্হা এবং দলের শৃঙ্খলা-রক্ষা কমিটির দায়িত্বে থাকা প্রতাপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে জমা পড়ছে কেন, তা জানতে চান বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক। এর পরেই তিনি জানিয়েছেন, কোথায় কী হচ্ছে, সব ফাইল তাঁর, পশ্চিমবঙ্গে দলের পর্যবেক্ষক সুনীল বনসল, নিতিনের কাছে আছে। তাই নিজেকে ও দলকে বাঁচাতে বাস্তব তুলে ধরতে হবে। এই অবস্থায় দল-সরকারের সমন্বয়ের কথাও বলেছেন বিজেপি সভাপতি। সূত্রের খবর, নিতিনের বক্তব্য, ‘অনেক সময় দেখা যাচ্ছে, দলের পদাধিকারী এবং জনপ্রতিনিধি সমান্তরাল সংগঠন চালাচ্ছেন। এটা উচিত নয়। দল এবং জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয় রেখে চলতে হবে। কেউ নির্বাচনে জিতেছেন মানে তিনি ঈশ্বর নন। তাঁকে মণ্ডল সভাপতি-সহ পদাধিকারীদের নিয়েই কাজ করতে হবে।’
সূত্রের দাবি, একই সঙ্গে, ৩৪ বছর ক্ষমতায় থাকার পরে ১৫ বছর বিরোধী পরিসরে থাকা সিপিএম এখনও তাদের পতাকা দৃশ্যমান রাখতে পারছে, এই ‘দৃষ্টান্ত’ তুলে ধরে বিজেপির নেতা-কর্মীদের আত্মসমীক্ষা’র বার্তা দিয়েছেন নিতিন।
পরে দলীয় বৈঠক প্রসঙ্গে শমীক বলেছেন, “নতুন সরকার মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী কতটা কাজ করতে পারছে, সেই সব আলোচনা হয়েছে। জনপ্রতিনিধিরা সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করবেন। কোথায় যাবেন, কতটা কী কাজ করবেন, দলকে জানাতে হবে। আবার দল অহেতুক সরকারের কাজে নাক গলাবে না। মন্ত্রীদের বিরক্ত করবে না।”