E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

আজ়াদের ৯১, মিলনের ২৯, পদ্মে কাঁটার খোঁজে বিরোধীরা

বিধানসভা ভোটে রেজিনগরে জয়ী হয়েছিলেন হুমায়ুনই। সংখ্যালঘু ভোটের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ তাঁর দিকে এসেছিল। উপনির্বাচনেও সংখ্যালঘুদের বড় অংশ হুমায়ুন-পুত্র আজ়াদকে সমর্থন করেছেন।

সন্দীপন চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ১১ অক্টোবর ২০২৬ ০৭:১৮
(বাঁ দিকে) নন্দীগ্রামে প্রচারে কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধান। এবং (রেজিনগরের এজেইউপি প্রার্থী গোলাম নবী আজাদ (রবীন)।

(বাঁ দিকে) নন্দীগ্রামে প্রচারে কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধান। এবং (রেজিনগরের এজেইউপি প্রার্থী গোলাম নবী আজাদ (রবীন)। — নিজস্ব চিত্র।

পরিসংখ্যান বলছে, বিরোধীদের দুরমুশ করে জোড়া জয় পেয়েছে শাসক বিজেপি। পরিসংখ্যানেরই গভীরে নামলে অন্য প্রবণতাও মিলছে।

রাজ্যে বিজেপির সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রে পুনর্নির্বাচনে শাসক দলের প্রার্থী দেবাংশু পণ্ডা জিতেছিলেন এক লক্ষ ৯ হাজার ভোটে। এ বার পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামে এক লক্ষ ২২ হাজার ৭৫৩ এবং মুর্শিদাবাদের রেজিনগরে ৭৫ হাজার ৮১৬ ভোটে জয়ী হয়েছেন বিজেপির দুই প্রার্থী যথাক্রমে হাসিরানী রথ এবং শাখারভ সরকার। এই তিন বিধানসভা কেন্দ্রেরই ‘কমন ফ্যাক্টর’ সংখ্যালঘু ভোট। রেজিনগরে সংখ্যালঘু ভোট অন্য দুই কেন্দ্রের চেয়ে অনেক বেশি। সংখ্যালঘু ভোটার উল্লেখযোগ্য, এমন তিন কেন্দ্রেই বিপুল জয় পশ্চিমবঙ্গে তাদের রাজনৈতিক কৌশলের ‘সাফল্য’ বলে বিজেপি শিবির উল্লসিত। তবে ফলতায় পুনর্নির্বাচন নিয়ে তেমন কোনও অভিযোগ ছিল না, জোড়া উপনির্বাচনে গা-জোয়ারির অভিযোগ আছে ভূরি ভূরি।

এই বৃহত্তর ছবির নীচে অন্য ক্ষুদ্র চিত্রও পাওয়া যাচ্ছে বুথ স্তরে গেলে। পুলিশ-প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে দুই বিধাসভা কেন্দ্রেই বহু বুথ দখল করা হয়েছে বলে বিরোধীদের অভিযোগ। উপনির্বাচনের দিন ভোটারদের একাংশও ভোট দিতে না-পেরে ফিরে আসার কথা বলেছেন। ভোটের নামে ‘ভূতের নাচে’র প্রতিফলন বুথভিত্তিক পরিসংখ্যানেও পাওয়া যাচ্ছে। তবে তারই মধ্যে রেজিনগরে ৯১টি বুথে ‘লিড’ পেয়েছেন আম জনতা উন্নয়ন পার্টির (এজেইউপি) গোলাম নবী আজ়াদ (রবীন)। আর নন্দীগ্রামে কংগ্রেসের মিলন প্রধান এগিয়ে আছেন ২৯টি বুথে। সব মিলিয়ে আজ়াদ ৫৪ হাজার এবং মিলন ৪১ হাজার ভোট পেয়েছেন নিজেদের কেন্দ্রে। বিরোধী শিবিরের বড় অংশেরই মত, বিজেপি-বিরোধী মানুষ যে এলাকায় যে দলের প্রার্থীকে বিজেপির মোকাবিলায় তুলনায় শক্তিশালী মনে করেছেন, তাঁকেই সমর্থন করতে চেয়েছেন। এই প্রবণতা জারি থাকলে আগামী দিনে বিজেপিকে রুখতে বিরোধী দলগুলির সমঝোতা করার ক্ষেত্র প্রস্তুত হতে পারে বলেই রাজনৈতিক শিবিরের একাংশের ধারণা।

বিধানসভা ভোটে রেজিনগরে জয়ী হয়েছিলেন হুমায়ুনই। সংখ্যালঘু ভোটের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ তাঁর দিকে এসেছিল। উপনির্বাচনেও সংখ্যালঘুদের বড় অংশ হুমায়ুন-পুত্র আজ়াদকে সমর্থন করেছেন। সুষ্ঠু ভোট যতটুকু‌ই হোক, কংগ্রেস, মমতা-তৃণমূল, সিপিএম বা গণতান্ত্রিক তৃণমূল কেউই সেখানে তেমন ভাগ বসাতে পারেনি। তবে হিন্দু ভোট এককাট্টা রাখার পাশাপাশি সংখ্যালঘু সমর্থনেরও একাংশ ঝুলিতে ভরে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে ভোট নিয়ে চলে গিয়েছে বিজেপি! হুমায়ুন এবং অন্য বিরোধীদের দাবি, এই ক্ষেত্রে ‘কাজ’ করে দিয়েছে পুলিশ-প্রশাসন।

নন্দীগ্রামে গত বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল এক লক্ষ ১৭ হাজার ভোট পেয়েছিল, কংগ্রেসের খাতায় ছিল ৭৯৪। পাঁচ মাস পরে উপনির্বাচনে মমতা-তৃণমূলের সমর্থন পেয়ে কংগ্রেসের ভোট ৪১ হাজারে পৌঁছেছে। বুথভিত্তিক তথ্য ঘাঁটলে দেখা যাচ্ছে— কালীচরণপুর, দাউদপুর, মহম্মদপুর, কেন্দামারি, নন্দীগ্রাম-সহ মূলত সংখ্যালঘু-অধ্যুষিত অঞ্চলের বুথেই কংগ্রেস প্রার্থী বিজেপির চেয়ে এগিয়ে আছেন। বয়াল ১ ও ২, ভেকুটিয়া, গোকুলনগর বা সোনাচূড়ায় একতরফা বিজেপি। সেই সঙ্গে আমদাবাদ ১ ও ২, সামসাবাদ-সহ সংখ্যালঘু অঞ্চলের বহু বুথেই বিজেপি ভাল ব্যবধানে জয়ী হয়েছে।

রাজনৈতিক সংগঠকদের কাছে বুথই সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। উপনির্বাচনের প্রচারে গিয়ে মমতা-তৃণমূলের বিধায়ক কুণাল ঘোষ সম্মিলিত ভাবে বুথ রক্ষার ডাক দিয়েছিলেন। ফল ঘোষণার পরেও তাঁর বক্তব্য, ‘‘ভোটার তালিকায় কারচুপি, ভোট ভাগ এবং শেষে নির্দিষ্ট অঙ্ক করে বুথ দখল— এটাই বিজেপির কৌশল। বিজেপি-বিরোধী শক্তির সমঝোতা করে নিলেই ভাল হত, সেটা নিয়ে আলোচনা আরও চলবে। আর বুথ রক্ষায় আরও জোর দিতেই হবে।’’ সিপিএমের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর এক সদস্যের মতে, ‘‘ফলতায় আমাদের দিকে কিছু বেশি ভোট এসেছিল, এই উপনির্বাচনে অন্য দু’টি দলের দিকে সেটা গিয়েছে। বোঝা যাচ্ছে, সংখ্যালঘু এবং বিজেপি-বিরোধী মানুষ শক্তিশালী প্রতিপক্ষ খুঁজছেন।’’

তৃণমূলের সমর্থনের প্রসঙ্গে না-গিয়েই রাজ্যে এআইসিসি-র পর্যবেক্ষক প্রকাশ জোশী ও প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার অবশ্য দাবি করছেন, বিধানসভা ভোটের পরে এই উপনির্বাচন থেকে তাঁদের দল নিজের পায়ে লড়াইয়ে আরও শক্তি সঞ্চয় করেছে! বিজেপির নেতারা যদিও সরকারের উন্নয়নমূলক কাজকর্মকেই সব অংশের মানুষের সমর্থন টানার সহায়ক বলে দাবি করছেন। রেজিনগরের জয়ী প্রার্থী শাখারভ সরকারের দাবি, ‘‘দলের নেতা-কর্মীরা লাগাতার কাজ করেছেন। মুখ্যমন্ত্রী রেজিনগরের বাসিন্দাদের উন্নয়নের কথা বলেছেন। তাঁরা সে আবেদনে সাড়া দিয়ে দু’হাত তুলে ভোট দিয়েছেন।’’ আর নন্দীগ্রামের হাসিরানীর কথায়, ‘‘বামফ্রন্ট ৩৪ বছরে বা তৃণমূল ১৫ বছরে যা করতে পারেনি, গত পাঁচ মাসে আমাদের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সেই উন্নয়ন করে দেখিয়েছেন। নন্দীগ্রামবাসী, বিশেষত সংখ্যালঘুদের একটা অংশ রাজ্য সরকারের সেই উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত হতে চেয়েছেন।’’

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Congress Mamata All India Trinamool Congress

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy