রাজ্যে গণপরিবহণের ভাড়াবৃদ্ধির দাবিতে সরব হলেন বেসরকারি বাস ও মিনিবাস মালিকেরা। তাঁদের দাবি, ২০১৮ সালের পর রাজ্যে আর সরকারি ভাবে বাসভাড়া বাড়েনি। ফলে লাগাতার আর্থিক লোকসানের মুখে পড়ে রাজ্যের বেশির ভাগ বেসরকারি গণপরিবহণ ব্যবস্থা কার্যত ‘কোমা’য় চলে গিয়েছে। এই ‘অচলাবস্থা’ কাটাতে ভাড়া পুনর্নির্ধারণের আর্জি জানিয়ে রাজ্যের পরিবহণমন্ত্রী অর্জুন সিংহকে চিঠি দিল ‘জয়েন্ট কাউন্সিল অফ বাস সিন্ডিকেটস’। কলকাতায় সাধারণ বাসের ন্যূনতম ভাড়া ১৮ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে ওই চিঠিতে।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক তপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেওয়া ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, গত আট বছরে পরিস্থিতি অনেকটাই বদলেছে। একাধিক বার পরিবহণমন্ত্রী বদল হলেও ভাড়া বৃদ্ধির দীর্ঘদিনের দাবি অধরাই থেকে গিয়েছে। করোনা অতিমারির ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং রক্ষণাবেক্ষণের খরচের চাপে বেসরকারি বাস চালানো দায় হয়ে পড়েছে মালিকদের। চিঠিতে বলা হয়েছে, গত ১৪ সেপ্টেম্বর ৯ দফা দাবি সংবলিত একটি স্মারকলিপি পরিবহণ দফতরে জমা দেওয়া হয়েছিল। সেই সময় পরিবহণমন্ত্রীর তরফে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল যে, দুর্গাপুজোর পরেই ভাড়া সংক্রান্ত বিষয়ে সরকার ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবে। সেই আশ্বাসের কথা মনে করিয়ে দিয়েই ফের নতুন প্রস্তাব জানানো হয়েছে।
সংগঠনের প্রস্তাবিত ভাড়ার খসড়া অনুযায়ী, কলকাতায় সাধারণ বাসের ক্ষেত্রে প্রথম ৪ কিলোমিটার পর্যন্ত ভাড়া ১৮ টাকা ধার্য করার কথা বলা হয়েছে। এর পর ৪ থেকে ৬ কিলোমিটারে ২০ টাকা, ৬ থেকে ৮ কিলোমিটারে ২২ টাকা, ৮ থেকে ১২ কিলোমিটারে ২৪ টাকা, ১২ থেকে ১৬ কিলিমিটারে ২৬ টাকা, ১৬ থেকে ২০ কিলোমিটারে ২৮ টাকা এবং ২০ থেকে ২২ কিলোমিটারে ৩০ টাকা ভাড়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন:
অন্য দিকে, জেলার ক্ষেত্রে সাধারণ বাসে প্রথম ৪ কিলোমিটারে ২০ টাকা এবং পরবর্তী প্রতি কিলোমিটারে ১ টাকা ২০ পয়সা হারে ভাড়া দাবি করা হয়েছে। এক্সপ্রেস বাসে প্রথম ৪ কিলিমিটারে ২৫ টাকা এবং পরবর্তী প্রতি কিলোমিটারে ১ টাকা ৫০ পয়সা, সাধারণ এসি বাসে প্রথম ৪ কিলোমিটারে ৪০ টাকা এবং ভলভো বাসে প্রথম ২ কিলোমিটারে ৫০ টাকা ভাড়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। হাওড়া, দুর্গাপুর, আসানসোল, মালদহ এবং দার্জিলিঙের মতো পাহাড়ি ও জেলাভিত্তিক এলাকার মিনিবাসের ভাড়াও দ্রুত পুনর্বিন্যাস করার দাবি জানানো হয়েছে।
বাসমালিকদের যুক্তি, বছরে গড়ে মাত্র ২৭০ দিন বাস রাস্তায় চালানো সম্ভব হয়। অথচ জ্বালানি, কর্মীদের বেতন, পুলিশ কেস ও টায়ার ভাড়ার মতো দৈনিক খরচ ছাড়াও রয়েছে ব্যাঙ্কের ইএমআই, তিন মাসের রোড ট্যাক্স এবং বার্ষিক ফিটনেস সার্টিফিকেট ও বিমার বিপুল ব্যয়। সংগঠনের বক্তব্য, এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে গেলে এবং মালিক বা পরিচালকদের ন্যূনতম আয়ের সংস্থান নিশ্চিত করতে হলে বিজ্ঞানসম্মত ভাড়া বৃদ্ধি ছাড়া অন্য কোনও পথ খোলা নেই। সরকারের তরফে অবশ্য এখনও এই প্রস্তাব নিয়ে কোনও প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।
তবে পরিবহণ দফতরের একাংশের মতে, ভাড়া বাড়ানোর অনুমতি না দিলেও, বেসরকারি বাসমালিকেরা নিজেরাই বাসভাড়া বৃদ্ধি করেছেন। ন্যূনতম ভাড়া ১৫ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। তার পর দূরত্বের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ১৮ টাকা পর্যন্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। এই তথ্য রাজ্য সরকারের জানা। তাই পরিবেশ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেই ভাড়ার নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন পরিবহণমন্ত্রী। প্রসঙ্গত, পুজোর আগে পরিবহণমন্ত্রী অর্জুন জানিয়েছিলেন, ভাড়াবৃদ্ধি নিয়ে পুজোর পর আলোচনা শুরু করবে রাজ্য। তাই লক্ষ্মীপুজোর পরেই ভাড়া বৃদ্ধির প্রস্তাব জমা পড়ল তাঁর দফতরে।
সরকারি ভাবে এখনও কলকাতায় বাসের ন্যূনতম ভাড়া ৭ টাকা। এর আগে তৃণমূলের আমলে বাসভাড়ার দাবি ওঠে একাধিক বার। বিষয়টি শেষপর্যন্ত আদালত অবধি যায়। আদালত তখন রাজ্যের কাছে জানতে চেয়েছিল, বাসের ন্যূনতম ভাড়া কত? রাজ্য হলফনামা দিয়ে আদালতকে জানায়, সরকারি ভাবে বাসের ন্যূনতম ভাড়া ৭ টাকা। এর বেশি কোথাও ভাড়া নেওয়া হচ্ছে বলে সরকারের জানা নেই বলেও ওই হলফনামায় জানানো হয়। বাস ভাড়া কত হবে তা সরকারই নির্ধারণ করে দেয়। যদিও তৃণমূলের আমলে, করোনার পর বাসমালিকদের সংগঠন নিজেরাই ভাড়া বাড়িয়ে ন্যূনতম ১০ টাকা করে নেয়। সরকার যদিও তার পর কোনও পদক্ষেপ করেনি। উল্টে আদালতে হলফনামা জমা দিয়ে ৭ টাকার কথা জানায়।