মাথার উপরে খাঁড়ার মতোই ঝুলছে একের পর এক ‘বিপজ্জনক’ হিমবাহ হ্রদ। ভূবিজ্ঞানীরা বলছেন, মধ্য এবং পূর্ব হিমালয়ে ছড়িয়ে থাকা এই হ্রদগুলি থেকে যে কোনও সময়ে নেমে আসতে পারে কালান্তক হড়পা বান। তছনছ করে দিতে পারে পার্বত্য এবং তরাইয়ের এলাকা। নেপালে যা হয়েছে, তা ঘটতে পারে পশ্চিমবঙ্গ, সিকিম-সহ দেশের হিমালয় পার্বত্য এবং পর্বতের পাদদেশে থাকা রাজ্যগুলিতেও। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট (ইসিমড) ২০২০ সালে একটি সমীক্ষায় দেখিয়েছিল যে, মধ্য এবং পূর্ব হিমালয়ে ৪৭টি বিপজ্জনক হ্রদ আছে, যার মধ্যে ২১টি নেপালে, ২৫টি তিব্বত-নেপাল জুড়ে এবং একটি ভারতে। ভূবিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু বদলের প্রভাব হিমালয়ের মধ্য এবং পূর্ব এলাকায় তো আছেই। এই অঞ্চলের ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যও হড়পা বানের বিপদ ডেকে আনতে পারে।
এই বিপদ অবশ্য বছর তিনেক আগেই এক বার আঁচ করা গিয়েছিল। ২০২৩ সালের ৪ অক্টোবর সিকিমের সাউথ লোনাক হ্রদ ভেঙে হড়পা বান নেমেছিল। সিকিমের চুংথাঙে তিস্তার বাঁধ গুঁড়িয়ে সেই প্লাবন নেমে এসেছিল নদীখাত বেয়ে। পশ্চিমবঙ্গের তিস্তাবাজার, সেবকে তার আঁচ পড়েছিল।
ভূবিজ্ঞানীরা জানান, অক্টোবরে সিকিমে মেঘভাঙা বৃষ্টির জেরে হ্রদের দেওয়াল ভেঙে গিয়েছিল বলেই মনে করা হয়। যদিও ওই হড়পা বান সার্বিক বিপর্যয়ের উদাহরণ বলেই মনে করছেন ভূবিজ্ঞানীদের অনেকে। তাঁদের মতে, দার্জিলিং-সিকিমে এমন বিপদ আগামী দিনেও আসতে পারে। নেপালের ঘটনা দেখে ইতিমধ্যেই টনক নড়েছে উত্তরাখণ্ড প্রশাসনের। হিমবাহের জলে সৃষ্ট উত্তরাখণ্ডের ১৩টি হ্রদে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিংহ ধামী।
কেন মধ্য এবং পূর্ব হিমালয়ের শিয়রে বিপদ, তারও ব্যাখ্যা দিয়েছেন ভূবিজ্ঞানীরা। তাঁদের মতে, উষ্ণায়ন, বৃষ্টির চরিত্র বদল, ঘনঘন মেঘভাঙা বৃষ্টির মতো ঘটনা, ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য—সব মিলিয়ে বিপদের ঘণ্টা বাজছে। পশ্চিমবঙ্গের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূবিজ্ঞান ও রিমোট সেন্সিং বিভাগের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর তথা হিমবাহবিদ অতনু ভট্টাচার্যের মতে, জলবায়ুর চরিত্রগত তফাতে পশ্চিম হিমালয়ের হিমবাহের থেকে পূর্ব হিমালয়ের হিমবাহ আলাদা। পূর্ব হিমালয়ের হিমবাহে অনেক বেশি নুড়ি, পাথর মিশে থাকে। এই নুড়িপাথরের ফলে হিমবাহের সামনে হ্রদের সৃষ্টি হয়। তিনি বলছেন, “পরিষ্কার হিমবাহের থেকে নুড়িপাথরে ঢাকা হিমবাহের চরিত্র ভিন্ন। কিছু নুড়িপাথর তাপরোধক হিসেবে কাজ করলেও এর জন্য বহু সময় হিমবাহের ক্ষতিও হয়। নুড়িপাথরের এই স্তূপের ঘনত্ব যাচাই করা জরুরি। গাণিতিক নিয়মে তা করা হলেও অনেক সময়ে তা বাস্তবের থেকে অনেক ভিন্ন হয়।”
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ঈশিতা দাসও বলছেন, মধ্য এবং পূর্ব হিমালয়ে বর্ষায় প্রবল বৃষ্টি হয় যা হিমবাহকে অনেক বেশি গলিয়ে দেয় এবং সেই জল জমে হ্রদ তৈরি হয়। এই এলাকার হিমবাহগুলি নুড়িপাথরে ঢাকা। পাহাড়ের ঢাল খাড়া এবং ভূকম্পপ্রবণ। সব মিলিয়ে তুষারধসের প্রবণতা বাড়ে। এ ছাড়া, ঈশিতার কথায়, “উষ্ণায়নের জেরে হিমবাহ গলে হ্রদ তৈরি হচ্ছে। এই হ্রদগুলির চারপাশে আলগা নুড়িপাথরের দেওয়াল (মোরেন) থাকে, যা চাপ বাড়লে আচমকা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা থাকে। জলবায়ু বদলের জেরে অল্প সময়ে তীব্র বৃষ্টি, মেঘভাঙা বৃষ্টির মতো দুর্যোগ ঘটছে। তা বিপর্যয়ের আশঙ্কা আরও বাড়াচ্ছে।”
ভূবিজ্ঞানের গবেষক অঙ্কিতা পাল বলছেন, “গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে ২০০০ সালের পর থেকে হিমালয়ে হিমবাহের গলনের হার প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছে। ২০১০ সালের পর থেকে তা আরও বেড়েছে। হিমালয়ে ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বাড়লে হিমবাহের গলনের হার প্রায় ৩০ শতাংশ বাড়তে পারে। ওই ক্ষতি ফের তুষারপাত দিয়ে পূরণ করা সম্ভব হবে না। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে এমন বিপর্যয়ের সংখ্যা বাড়বে।”