E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

ওঠ ছুঁড়ি তোর বিয়ে, বদল নেই প্রচারের পরেও

নাবালিকা মাতৃত্বের সমস্যা বাড়ছেই রাজ্যে। কেন? নাবালিকা মাতৃত্বের নিরিখে রাজ্যে উপরের দিকে থাকা তিন জেলায় তার উত্তর সন্ধান।

জয়ন্ত সেন

শেষ আপডেট: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ ০৭:৩৬

—প্রতীকী চিত্র।

মালদহ জেলা সদর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে গ্রাম। সেখানেই থাকে ১৬ বছরের কিশোরী। সাংসারিক ঝামেলার জেরে মা-বাবা আলাদা থাকেন। মায়ের কাছে থাকত মেয়ে। আবাসিক স্কুলে একাদশ শ্রেণিতে বিজ্ঞান নিয়ে পড়ছিল। হঠাৎ স্কুলে হাজির মা। কিছু কেনাকাটার কথা বলে স্কুল থেকে মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন তিনি। তবে বাজারে নয়, মেয়েকে নিয়ে বাড়ি চলে আসেন। সন্ধ্যায় মেয়েকে নিয়ে যাওয়া হয় পাশের গ্রামে। মেয়েকে জানানো হয়, সে দিনই তার বিয়ে।

বিয়েতে রাজি ছিল না মেয়ে। কিন্তু আপত্তি ধোঁপে টেকেনি। রাতেই বিয়ে হয়। পাত্র বছর পঁচিশের পঞ্চায়েত সদস্য। কাজি বিয়ে দেন। সেই কাজি আবার শিক্ষকও। বিয়ের খবর পুলিশ-প্রশাসনে পৌঁছলে মেয়েটিকে হোমে পাঠানো হয়। মাকে আটক করে পুলিশ। পাত্র ও কাজি— সেই থেকে বেপাত্তা। তবে মায়ের দাবি, মেয়ের বিয়ে হয়নি। কিশোরীও প্রথমে বিয়ের কথা অস্বীকার করে। পরে জানায়, হয়েছিল তার বিয়ে। যে গ্রামে বিয়ে হয়েছিল, তার বাসিন্দারা, যাঁরা বিয়ের ভোজ খেয়েছেন— সবাই নীরব।

মাসখানেক আগে মালদহেরই একটি ব্লকে নবম শ্রেণির ছাত্রীকে বিবাহিত যুবকের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিলেন তার মা। বিয়ের ছ’দিনের মাথায় শ্বশুরবাড়িতে শুরু হয় নির্যাতন। থানায় এসে পুলিশের কাছে স্বামী ও মায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়েছিল নাবালিকা। পুলিশ রাতেই গ্রেফতার করে স্বামীকে। নাবালিকার মা পলাতক। নাবালিকার মা-বাবার কাছ থেকে পুলিশ-প্রশাসন ১৮ বছরের আগে মেয়ের বিয়ে না দেওয়ার মুচলেকা লিখে নেওয়ার পরেও বিয়ে দেওয়ার নজির রয়েছে।

জোর করে পাত্রস্থ করায় বা প্রেমের জেরে নাবালিকাদের স্বেচ্ছায় ঘর ছাড়ার ঘটনাও মেলে আকছার। তাই জেলায় কৈশোরকালীন মাতৃত্বও বাড়ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে এ বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত জেলায় নাবালিকা-মাতৃত্বের সংখ্যা (১৯ বছর বয়স পর্যন্ত) ১৩ হাজার ৭৮১, যা জেলার মোট প্রসবের ১৩.০৮ শতাংশ এবং চলতি বছরের এপ্রিল থেকে এখনও পর্যন্ত ১২.৫ শতাংশ।

গত অগস্টের পয়লা তারিখ থেকে ২৭ তারিখ পর্যন্ত মালদহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৮৯টি নবজাতকের মৃত্যু ঘটেছিল। সেই শিশুদের মধ্যে কম ওজন নিয়ে জন্মানো, অপুষ্টিতে ভোগা শিশুও ছিল। সেই শিশুদের মায়েদের অনেকেই নাবালিকা। মাতৃত্ব কৈশোরে। প্রসূতি রোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, ‘‘দেহ ও প্রজনন অঙ্গ সম্পূর্ণ পরিণত হওয়ার আগেই গর্ভধারণ হলে মায়ের রক্তাল্পতা, অপুষ্টি, উচ্চ রক্তচাপ-সহ নানা জটিলতার ঝুঁকি বাড়ে। একই সঙ্গে, অপরিণত বা কম ওজনের শিশু জন্মানোর আশঙ্কাও থাকে। তাই নাবালিকা-মাতৃত্ব শুধু সামাজিক অপরাধ নয়, গুরুতর স্বাস্থ্য-ঝুঁকিরও জন্ম দেয়।’’

সে সাবধানবাণী শোনে কে? তাই মালদহের গ্রামেগঞ্জে এ ভাবেই আড়ালে-আবডালে বাল্যবিবাহ চলছে। পুলিশ-প্রশাসন, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও চাইল্ডলাইন যে সব ঘটনার খবর পাচ্ছে, সে সব বিয়ে রোখা যাচ্ছে। বাকি আড়ালেই হয়ে যাচ্ছে। একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সম্পাদক বিশ্বজিৎ বসু মনে করছেন, কোভিডের সময় থেকে হাতে মোবাইল চলে আসার সূত্রে অনেক নাবালিকা অচেনাদের সঙ্গে সম্পর্কে জড়াচ্ছে। মোবাইলের জগতে বুঁদ হয়ে থাকছে। সে সব প্রবণতার কারণে পরিবার অনেক সময় বিয়ে দিতে তাড়াহুড়ো করছে। তিনি বলেন, ‘‘জেলা থেকে ভিন্‌ রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া পরিযায়ী শ্রমিকদের একাংশের রোজগার এলাকার বাসিন্দাদের চেয়ে বেশি। তাই তাঁদের ভাল পাত্র ভেবে এলাকায় থাকাকালীন তড়িঘড়ি বিয়ে দেওয়ার মানসিকতাও রয়েছে। তাই সরকারি-বেসরকারি স্তরে সচেতনতার প্রচারেও কাজ হচ্ছে না।’’ আশা কর্মী মেহবুবা খাতুনের আক্ষেপ, ‘‘মোবাইল ফোনের অপব্যবহারের কারণে কিছু মেয়ে লেখাপড়া ছেড়ে পালিয়ে বিয়ে করছে। হয়তো বরও নাবালক। এমন বিয়ের ফল কী মারাত্মক হতে পারে, তা ভাবাই হচ্ছে না।’’ যদিও এ কথা শুনে ফুঁসে ওঠে এক নাবালিকা বধূ। তার কথায়, ‘‘বাপেরবাড়িতে অনেকগুলো পেট। আমার বিয়ে হওয়ায়, ওদের খরচ কমেছে।’’ মালদহের একটি ব্লক প্রশাসনের কর্তার অভিজ্ঞতা, ‘‘বাল্যবিবাহ রুখতে গিয়ে খেয়াল করেছি, এর পিছনে পারিবারিক আর্থসামাজিক অবস্থা এবং মোবাইল ফোন আর সমাজমাধ্যমের অপব্যবহারও বড় কারণ।’’

কী ভাবে বিয়ে হচ্ছে নাবালিকাদের? জেলার পুলিশ-প্রশাসনের কর্তাদের বক্তব্য, কিছু ক্ষেত্রে বয়সের জাল শংসাপত্র বানিয়ে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। আবার সমাজকর্মী এবং আশা কর্মীদের একাংশ এ ধরনের বিয়ের জন্য কাজি, ইমাম, পুরোহিতদের একাংশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন। মালদহের জেলা ইমাম জাহাঙ্গির আলম বলেন, ‘‘বাল্যবিবাহের কুফল নিয়ে ইমামেরা যাতে লাগাতার প্রচার চালান, সে ব্যাপারে বৈঠক করছি। কাজিদের বলেছি, যেন নাবালিকার বিয়ে না দেন।’’ পুরোহিত অমল মিশ্র বলেন, ‘‘১৮ বছরের নীচে মেয়ের বিয়ে দেওয়া অপরাধ। কিন্তু অনেক সময় পরিবারের পক্ষ থেকে বয়স নিয়ে ভুল তথ্য দেওয়া হয়। নাবালিকার বিয়ে দেওয়ার জন্য পুরোহিতদের কোনও চাপের কাছে নতি স্বীকার করা উচিত নয়।’’

তবে শুধু প্রশাসনকে দেখানো নয়, ব্যক্তিগত ভাবেও নাবালিকা বিয়ে রোখার লড়াই চালাচ্ছেন অনেকে। হবিবপুরের দাল্লা বিদ্যামন্দিরের প্রধান শিক্ষক জয়দেব লাহিড়ী বলেন, ‘‘বাল্যবিবাহ সামাজিক অভিশাপ, যা কৈশোরকালীন মাতৃত্ব ডেকে আনছে। আমরা নাবালিকা বিয়ে এবং কৈশোরকালীন মাতৃত্বের কুফল নিয়ে স্কুলে নিয়মিত আলোচনা, নাটক, কর্মশালা করছি। প্রশাসনের সহযোগিতায় বাল্যবিবাহ বন্ধের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’’ তাঁর অভিজ্ঞতা, বহু ক্ষেত্রেই বিয়েতে আপত্তি করে নাবালিকারা। মালদহ জেলা সদর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরের গ্রামের ১৬ বছরের কিশোরীর মতো সে আপত্তি কেউ কানে তোলে না।

(চলবে)

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Teenage Mother Child Marriage

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy