Advertisement
E-Paper

চিন্ময়কৃষ্ণের প্রসঙ্গ তুলে শুভেন্দু বিঁধলেন বামেদের! উমর খলিদ, স্ট্যানস্বামীর কথা মনে করিয়ে পাল্টা আক্রমণ সিপিএমের

সিপিএম নেতা কলতান দাশগুপ্তের কটাক্ষ, ‘‘বিজেপি দ্বিচারী। ওখানে চিন্ময়কৃষ্ণকে যে ভাবে দেশদ্রোহী বলে বন্দি রাখা হয়েছে, এখানে একই ভাবে উমর খলিদও বন্দি। দেশদ্রোহী তকমা দিয়ে স্ট্যান স্বামীকে জেলে রাখা হয়েছে। তাঁকে কারাগারেই মরতে হয়েছে।’’

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৫:০২
মায়ের শেষকৃত্যে ভেঙে পড়েছেন চিন্ময়কৃষ্ণ দাস। শুভেন্দু অধিকারী (ইনসেটে)।

মায়ের শেষকৃত্যে ভেঙে পড়েছেন চিন্ময়কৃষ্ণ দাস। শুভেন্দু অধিকারী (ইনসেটে)। — ফাইল চিত্র।

পশ্চিমবঙ্গ তৈরি না-হলে এখানকার বাঙালিদের অবস্থাও চিন্ময়কৃষ্ণ দাসের মতো হত। গণেশপুজোর উদ্বোধনে গিয়ে শনিবার ফের বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের অবস্থা নিয়ে সরব হলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। জানান, চিন্ময়কৃষ্ণের মায়ের শেষকৃত্যের সেই ছবি গোটা পৃথিবীর ‘সনাতনী’দের নাড়িয়ে দিয়েছে। আর এই প্রসঙ্গে তিনি মনে করিয়েছেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং স্বামী প্রণবানন্দের অবদানের কথা। শুভেন্দুর কটাক্ষ, পূর্বতন বাম এবং তৃণমূল সরকার সেই অবদান ভুলিয়ে দিতে চেয়েছে। পাল্টা বামেরা এ দেশে সংখ্যালঘুদের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। তুলে ধরেছে উমর খলিদ থেকে স্ট্যান স্বামীর বন্দিত্বের কথা।

২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে বাংলাদেশে জেলবন্দি সন্ন্যাসী চিন্ময়কৃষ্ণ। গত বৃহস্পতিবার তাঁর মায়ের মৃত্যু হয়। সেই কথা বিবেচনা করে তাঁকে পাঁচ ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তির নির্দেশ দেয় চট্টগ্রামের আদালত। মা সন্ধ্যারানি ধরের শেষকৃত্যে হাজির হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা যায় চিন্ময়কৃষ্ণকে। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মৃত্যুর আগে চিন্ময়কৃষ্ণের মায়ের শেষ ইচ্ছা ছিল কারাবন্দি ছেলেকে দেখার। কিন্তু আবেদন করেও চিন্ময়কৃষ্ণ জামিন পাননি বলে অভিযোগ। সেই প্রসঙ্গই উঠে এসেছে শুভেন্দুর মুখে। তিনি শনিবার রাজারহাট গোপালপুরে একটি গণেশপুজোর উদ্বোধনে গিয়ে বলেন, ‘‘ও পার বাংলার চিন্ময় প্রভুর চোখের জল গোটা পৃথিবীর সনাতনীদের হৃদয় নাড়িয়ে দিয়ে গিয়েছে।’’ তার পরেই তিনি বলেন, ‘‘ওই চোখের জল দেখতে দেখতে ভাবছিলাম, আমরা যদি সেই দিন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বা স্বামী প্রণবানন্দের লড়াইয়ের মাধ্যমে ভারতভুক্তি না-পেতাম, আজ আমাদের অবস্থাও হয়তো চিন্ময় প্রভুর মতো হত।’’

এই প্রথম নয়, রাজ্য বিধানসভার বিরোধী দলনেতা থাকার সময়েও বাংলাদেশের ময়মনসিংহে দীপু দাসের হত্যার পরে সুর চড়িয়েছিলেন শুভেন্দু। গত বছরের ডিসেম্বরে সেই ঘটনার পরে আন্দোলনের ডাকও দিয়েছিলেন তিনি। শুভেন্দু বলেছিলেন, ‘‘যত দিন না বাংলাদেশ উপদূতাবাস থেকে সদুত্তর পাওয়া যাচ্ছে, বাংলাদেশে দীপু দাসের হত‍্যাকারীদের বিরুদ্ধে কী ব‍্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, হিন্দুদের নিরাপত্তার জন‍্য কী ব‍্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, এই বিষয়ে যতক্ষণ না স্পষ্ট করে আমাদের জানানো হচ্ছে, ততক্ষণ আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হবে।’’ এ বার তিনি চিন্ময়কৃষ্ণের বিষয়েও সরব হয়েছেন। আর তা করতেই গিয়েই মনে করিয়েছেন শ্যামাপ্রসাদ, প্রণবানন্দের অবদান। তাঁর কটাক্ষ, বিগত বাম এবং তৃণমূল সরকার তাঁদের অবদানকে ভুলিয়ে দিতে চেয়েছিল। তাঁর কথায়, ‘‘বাঙালি হিন্দুর হোমল্যান্ড তৈরির দাবি আদায়ের জন্য শ্যামাপ্রসাদ, স্বামী প্রণবানন্দের যে লড়াই, ভূমিকা, তাকে এই রাজ্যে ভুলিয়ে দিতে চেয়েছিল (বাম, তৃণমূল)। সেই ঐতিহ্য, পরম্পরা ফিরিয়ে আনতে চাই।’’

এ বিষয়ে সিপিএম নেতা কলতান দাশগুপ্ত স্পষ্ট করে দিয়েছেন নিজেদের অবস্থা। তিনি বলেন, ‘‘আমরা বামপন্থীরা সব সময়েই দেশের সীমানার ঊর্ধ্বে গিয়ে সংখ্যালঘুদের অধিকারের পক্ষে এবং সংখ্যাগুরুর আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে, সেটা বাংলাদেশ, ভারত বা প্যালেস্টাইন সর্বত্র।’’ তার পরেই কলতান আঙুল তুলেছেন বিজেপির দিকে। তাঁর কথায়, ‘‘বিজেপি এ ব্যাপারে দ্বিচারী। ওখানে চিন্ময়কৃষ্ণকে যে ভাবে দেশদ্রোহী বলে বন্দি রাখা হয়েছে, এখানে একই ভাবে উমর খলিদও বন্দি। দেশদ্রোহী তকমা দিয়ে স্ট্যান স্বামীকে জেলে রাখা হয়েছে। তাঁকে কারাগারেই মরতে হয়েছে। বিজেপির দ্বিচারিতা ক্রমশ প্রকট হচ্ছে মানুষের সামনে।’’

৮৪ বছরের স্ট্যানকে ২০২০ সালে অতিমারির সময় গ্রেফতার করেছিল জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ)। তাঁকে ইউএপিএ আইনে এনআইএ গ্রেফতার করলেও এক দিনের জন্যও নিজেদের হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করেনি। পারকিনসন্সে আক্রান্ত ছিলেন আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে আন্দোলনকারী স্ট্যান। তা-ও মেলেনি জামিন। অসুস্থ মায়ের দেখভাল করার জন্য জামিনের আবেদন করেছিলেন জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রনেতা উমর। শুধু তা-ই নয়, তাঁর কাকার মৃত্যু-পরবর্তী আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথাও তাঁর আবেদনে ছিল। যদিও দিল্লির আদালত জানায়, এই মর্মে কখনওই জামিনের আবেদন ম়ঞ্জুর করা যায় না। দিল্লি হিংসা মামলায় ২০২০ সাল থেকে জেল খাটছেন তিনি। চিন্ময়কে নিয়ে শুভেন্দুর মন্তব্যের পরে সিপিএম নেতা কলতান সেই প্রসঙ্গই তুলে ধরেছেন।

গণেশপুজোর উদ্বোধনে গিয়ে বামেদের আবার কটাক্ষ করেছেন শুভেন্দু। তিনি জানিয়েছেন, গত ৩৪ বছর ধরে বামেরা ঐতিহ্য ভুলিয়ে দিয়েছিল। তাঁর কথায়, ‘‘৩৪ বছর আমাদের পঞ্জিকা, শাস্ত্র, ঐতিহ্য, পুরোহিত, আরতি, পুষ্পাঞ্জলি— সব ভুলিয়ে দিয়েছিল লাল রাজত্ব। তারা দুর্গাপুজো লিখবে না। মহালয়া শুনবে না। তারা মণ্ডপে মাকে আরতি করবে না। হাতে ফুল নিয়ে মন্ত্র বলবে না।’’ এর পরেই তিনি আবার বামেদের মণ্ডপের বাইরে বইয়ের স্টল নিয়ে কটাক্ষ করেছেন। মুখ্যমন্ত্রী জানান, ‘প্যান্ডেল থেকে দূরে লাল শালু লাগিয়ে বসত। সেখানে বিবেকানন্দ, লোকেশ্বরানন্দ, উদ্বোধন প্রকাশকের বই পাওয়া যায় না। ভারত সেবাশ্রমের বই পাওয়া যায় না। পশ্চিমবঙ্গ তৈরির ইতিহাস রয়েছে, এমন বই মেলে না। দ্বিজাতি তত্বের ভিত্তিতে ভারত ভাগ হয়েছিল, সে বই মেলে না। বিদেশি কার্ল মার্ক্সের বই থাকে। গীতা, হনুমান চল্লিশা থাকে না। এখানেই থামেননি শুভেন্দু। তিনি বলেন, ‘‘সেখানে (বইয়ের স্টলে) পরিষ্কার লেখা আছে, আমরা ধর্ম মানি না, ধর্ম আফিম।’’ তিনি একযোগে কটাক্ষ করেছেন তৃণমূলকেও। তাঁর কথায়, ‘‘বামেদের পরে ১৫ বছর (তৃণমূল জমানা) প্রথম দিকে না-হলেও শেষ দিকে বাংলাকে জামাতিকরণ করার সম্পূর্ণ চেষ্টা হয়েছে। এক বছর প্রতিমা নিরঞ্জনের দিনও বদলানো হয়েছিল।’’ কিন্তু এ বছর তা হবে না, স্পষ্ট করেছেন শুভেন্দু। তিনি জানিয়েছেন, পঞ্জিকা মেনে পুজো হবে। নিরঞ্জন হবে। পিতৃপক্ষে পুজোর উদ্বোধন হবে না। অষ্টমীতে বন্ধ থাকবে সব মদের দোকান।

এই প্রসঙ্গে সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী বলেন, ‘‘মুখ্যমন্ত্রী রবীন্দ্রনাথের শারদোৎসবকেও পছন্দ করছেন না, আবার বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের আশ্বিনের শারদপ্রাতেও অস্বীকার করছেন। শারদ শুনলে বোধহয় ওঁর নারদ মনে পড়ে যাচ্ছে। কেউ মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন বলেই তিনি ঠিক করতে পারেন না, কে কী বই পড়বে, কে কী খাবে। যেমন হত, তেমনই এ বার হবে।’’

দুর্গাপুজোর মণ্ডপের পাশে মার্কসীয় সাহিত্যের বইয়ের স্টল বসাতে গেলে ‘দুর্গাপুজো’ শব্দটিই লিখতে হবে। শারদোৎসব লিখলে চলবে না। গত বৃহস্পতিবার বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু বাম দলগুলির জন্য এমন ‘শর্ত বেঁধে দেওয়ার’ নিদান দিয়েছেন। সেই নিয়েও সরব হয়েছে বামেরা। এ বার সিপিএম স্পষ্ট করল, যেমন ভাবে এত বছর পুজো হয়েছে, তেমনই হবে।

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy