সংখ্যালঘুদের একটা বড় অংশ যে এখন বিজেপিকে সমর্থন করছেন, রেজিনগর এবং নন্দীগ্রামের উপনির্বাচন তা প্রমাণ করছে বলে দাবি করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেই সঙ্গেই ফের তাঁর ঘোষণা, আগামী লোকসভা নির্বাচনে রাজ্যের ৪২টি কেন্দ্রেই জিতবে বিজেপি! বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যে বিজেপি পেয়েছিল প্রায় ৪৬%ভোট, আগামী দিনে দলের ভোট পৌঁছবে ৬০%-এ। যা নিয়ে পাল্টা সরব বিরোধীরা।
উপনির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পরে শুক্রবার নবান্নে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, সংখ্যালঘুদের বোঝানো হয়েছিল, বিজেপি ক্ষমতায় এলে ধর্মাচরণে বাধা দেবে, তাঁদের বাংলাদেশে পাঠানো হবে। আটকে রাখা হবে ‘ডিটেনশন’ শিবিরে। ধর্মের স্বাধীনতা তাঁদের থাকবে না। কিন্তু গত পাঁচ মাসে এই সরকারের পরিচালনা দেখে সেই মানুষ বুঝেছেন, তাঁদের ভুলই বোঝানো হয়েছিল। শুভেন্দু বলেছেন, ‘‘বাঙালি মুসলিমদের বেশির ভাগ রাজ্যের উন্নয়ন যজ্ঞের সঙ্গে থাকতে চাইছেন। আগামী দিনে আমরা ৬০% ভোট পাব। সরকারের যত উন্নয়ন প্রকল্প, সেখানে মুসলিম দিদি-বোনেরা রয়েছেন। তাদের সমস্ত মিথ্যাচার গত পাঁচ মাসে মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ার কারণেই তারা মূল স্রোতে এসে সরকারের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে চান, বন্ধুত্ব করতে চান।’’ তাঁর ‘বন্ধুত্বে’র প্রস্তাবে সংখ্যালঘুদের বড় অংশই সাড়া দিয়েছেন বলে মুখ্যমন্ত্রীর দাহবি। তাঁর মতে, রেজিনগরে মুসলিম ভোটের ৬০% এবং নন্দীগ্রামে ৮০% পেয়েছে বিজেপি।
উপনির্বাচনের বিপুল জয়কে সামনে রেখেই মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা, “এই বছর হাওড়া-কলকাতা পুরসভা, আগামী বছর ১১০টি পুরসভা, ২০২৮ সালে পঞ্চায়েত ভোট এবং ২০২৯ সালে ৪২টিরমধ্যে ৪২টি লোকসভা আসন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে উপহার দিয়ে এ রাজ্যে রাষ্ট্রবাদী সরকারের বৃত্ত সম্পূর্ণ করা হবে।” প্রসঙ্গত, ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের তরফে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়দের মুখে ‘৪২-এ ৪২’-এর ডাক শোনা যেত।
নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে দেদার ‘ভোট লুট’ হয়েছে বলে অভিযোগ করে বিরোধীদের দাবি, এই ফল থেকে সংখ্যালঘুদের প্রকৃত সমর্থন মাপা যায় না। তা ছাড়া, সে দিন পর্যন্ত সংখ্যালঘুদের উদ্দেশে ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’-এর হুঁশিয়ারি দিয়ে আসা অমিত শাহ, শুভেন্দুদের ‘সংখ্যালঘু-বন্ধুত্ব’ বিশ্বাসযোগ্য কি না, সেই প্রশ্নও তুলছে তারা। দুই কেন্দ্রেই উপনির্বাচনে বিজয়ী বিজেপির চেয়ে অনেক পিছিয়ে বিরোধীরা। তবে তার মধ্যেও নন্দীগ্রামে মমতা-তৃণমূলের সমর্থিত কংগ্রেস দ্বিতীয়, সিপিআই তৃতীয় এবং গণতান্ত্রিক তৃণমূল চতুর্থ স্থান পেয়েছে। আর রেজিনগরে হুমায়ুন কবীরের আম জনতা উন্নয়ন পার্টি দ্বিতীয়, কংগ্রেস তৃতীয়, মমতা-তৃণমূল চতুর্থ, সিপিএম পঞ্চম এবং গণতান্ত্রিক তৃণমূল ষষ্ঠ স্থানে শেষ করেছে। দুই কেন্দ্রেই কংগ্রেস ও বামের ভোট বিধানসভা নির্বাচনের তুলনায় বেড়েছে। তবে যে ভাবে উপনির্বাচন হয়েছে, তার প্রেক্ষিতে এই পরিসংখ্যানকে নির্ণায়ক বলে ধরতে চাইছে না কোনও বিরোধী দলই।
সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের প্রশ্ন, ‘‘কোন বুথে কত ভোট পড়েছে, সেই সংক্রান্ত নথি এখনও নির্বাচন কমিশন দেয়নি। তা হলে মুখ্যমন্ত্রী নবান্নে বসে কী করে বুঝলেন কত মহিলা, কত হিন্দু, কত মুসলিম কাকে ভোট দিয়েছে! এই জন্যই আমরা বলছি নয়া ফ্যাসিবাদ। তা হলে কি আগে থেকেই সব ঠিক করে রেখেছিলেন?’’ প্রদেশ কংগ্রেস নেতা অমিতাভ চক্রবর্তীর মতে, ‘‘শাসকের সঙ্গে মাটির সংযোগ যখন কমে যায়, তখন সব শাসকের সুরই মিলে যায়! আগে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়েরা ৪২-এ ৪২ বলতেন, এখন কী পরিণতি হয়েছে, দেখাই যাচ্ছে। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীও একই কথা বলছেন। কিন্তু গণতন্ত্রে শেষ কথা বলেন মানুষই।’’ গণতান্ত্রিক তৃণমূলের নেতা তথা বিধানসভায় বিরোধী দলের সচেতক আখরুজ্জামানের দাবি, ‘‘যে দিন উপনির্বাচন হয়, সে দিন সকাল থেকেই বলেছিলাম, গণতন্ত্রের হত্যা হল। প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন, সরকার, বিজেপি মিলে-মিশে ভোট লুট করেছে।’’
এরই পাশাপাশি, উপনির্বাচনে জিতে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিশানা করে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনে (এসআইআর) যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতি নিয়েও খোঁচা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু। তাঁর বক্তব্য, “মৃত ও স্থানান্তরিত ভোটারদের নিয়ে বিতর্ক নেই। যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতির দায় তাঁর (মমতার)। তিনিই সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে হাজার হাজার বিচারককে এনেছিলেন।”