E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

৬ ফেল ডাক্তারি ছাত্রকে পাশ করাতে ‘নির্দেশ’

বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজের সুপারের বিরুদ্ধে কিছু নথি-সহ এমনই অভিযোগ লিখিত ভাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে জানিয়েছেন ওই শিক্ষক-চিকিৎসক তথা বিভাগীয় প্রধান।

শান্তনু ঘোষ

শেষ আপডেট: ০১ অগস্ট ২০২৬ ০৭:৫৪
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

অভিযোগ, হুমকি দিয়েছেন সুপার। দেখিয়েছেন ছাত্র আন্দোলনের ভয়ও। এমনকি, সেই আন্দোলনের খবর নাকি জেলাশাসকের কাছেও রয়েছে। তাই, ফেল করানো যাবে না ছ’জন ডাক্তারি পড়ুয়াকে। অগত্যা অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নের পরীক্ষার ‘ট্যাবুলেশন শিট’-এ ওই ছ’জনের প্রাপ্ত নম্বর এবং উপস্থিতির হার পেন দিয়ে কেটে বদল করতে হয়েছে এক শিক্ষক-চিকিৎসককে!

বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজের সুপারের বিরুদ্ধে কিছু নথি-সহ এমনই অভিযোগ লিখিত ভাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে জানিয়েছেন ওই শিক্ষক-চিকিৎসক তথা বিভাগীয় প্রধান। বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় চলছে স্বাস্থ্য শিবিরের অন্দরেই। অনেকেই বলছেন, তৃণমূল আমলে ‘নির্মল ছোঁয়া’-এ ফেল করা ছাত্রছাত্রীকে পাশ করানোর অভিযোগ একাধিক বার সামনে এসেছে। কিন্তু রাজ্যে পালাবদলের পরেও সেই সংস্কৃতির যে বদল হয়নি, সেটাই কি ফের প্রমাণ করছে বর্ধমানের এই ঘটনা? পাশাপাশি, হুমকি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে আর জি কর আন্দোলনের সময়ে এত প্রতিবাদ হলেও, সেটিও যে বহাল তবিয়তে চলছে, তারও প্রমাণ সুুপারের এই ‘নির্দেশ’, মত খোদ চিকিৎসকদের। সুপার তাপস ঘোষ অবশ্য এ নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাননি। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘‘কথা বলা বারণ আছে।’’

ন্যাশনাল মেডিক্যাল কমিশনের নিয়মানুযায়ী কলেজের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে থিয়োরি ও প্র্যাক্টিক্যাল মিলিয়ে মোট যত নম্বরের পরীক্ষা, তার অন্তত ৫০ শতাংশ পেতে হবে। এবং আলাদা করে থিয়োরি ও প্র্যাক্টিক্যালে অন্তত ৪০ শতাংশ পেতে হবে। পাশাপাশি থিয়োরি ক্লাসে অন্তত ৭৫ ও প্র্যাক্টিক্যালে অন্তত ৮০% উপস্থিতির হার থাকতে হবে। সূত্রের খবর, বর্ধমান মেডিক্যালের এমবিবিএসের তৃতীয় প্রফেশনাল (থার্ড প্রফ)-এর পার্ট-১ পরীক্ষায় একটি বিষয়ে বেশ কয়েক জন পরীক্ষার্থীর নম্বর ৪০% এবং আরও কয়েক জনের নম্বর ৩০ শতাংশের কম ছিল। তখন ওই পড়ুয়াদের ‘রেমেডিয়াল’ ক্লাসের পাশাপাশি ফের পরীক্ষা নেওয়া হয়। দেখা যায়, ৩০%-র কম নম্বর থাকা পরীক্ষার্থীরা ফের একই ভাবে খারাপ ফল করেছেন। তৃতীয় বার পরীক্ষার ব্যবস্থা করেন ওই বিভাগীয় প্রধান। প্রথম বার পরীক্ষায় যে প্রশ্ন হয়েছিল, সেই প্রশ্নতেই পরের দু’টি পরীক্ষা নেওয়া হয়। তাতেও ছ’জন পড়ুয়া এনএমসি নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করতে পারেননি। এমনকি, ‘রেমেডিয়াল’ ক্লাসের পরেও তাঁদের উপস্থিতির হার এনএমসির নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী হয়নি। গত ২৩ জুলাই চূড়ান্ত ‘ট্যাবুলেশন শিট’ অধ্যক্ষের কাছে জমা দেন ওই চিকিৎসক। ওই ছয় পড়ুয়াকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় বসার অনুমতি না দিয়ে ছ’মাস পরে সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষার পরামর্শ দেওয়া হয়। ওই দিনই অধ্যক্ষের বদলির নির্দেশ আসে।

বিষয়টি এখানেই থামেনি। অভিযোগ, ২৪ জুলাই নতুন অধ্যক্ষ দায়িত্ব নেওয়ার পরে তাঁর ঘরে ওই চিকিৎসককে ডেকে পাঠান সুপার তাপস ঘোষ। সেখানে ওই চিকিৎসককে সুপার জানান, ঠিক মতো পরীক্ষা নেওয়া হয়নি। তাই অকৃতকার্য পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা আবার নেওয়া হবে। তবে সেই পরীক্ষা ওই বিভাগীয় প্রধান চিকিৎসক নেবেন না। বদলে পরীক্ষক ঠিক করবেন সুপার নিজেই। আরও অভিযোগ, রীতিমতো হুমকির সুরে তাপস জানান, এই ফলের জন্য বৃহত্তর ছাত্র আন্দোলন হলে, তার দায় ওই চিকিৎসককে নিতে হবে। তাই নম্বরের বিষয়টি যেন তিনি বুঝে নেন।

নতুন অধ্যক্ষ সব্যসাচী দাস বলেন, ‘‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার এর ঘণ্টার মধ্যে ঘটনাটি ঘটেছে। ফলে এখনও বিষয়টি বুঝে উঠতে পারিনি।’’

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে অভিযোগে ওই চিকিৎসক দাবি করেছেন, এ হেন ভয়ভীতির কারণে তিনি ওই পড়ুয়াদের নম্বর ও উপস্থিতির হার বদল করতে বাধ্য হন। পেন দিয়ে কাটাকুটি করা ‘ট্যাবুলেশন শিট’-ও প্রামাণ্য নথি হিসেবে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে পাঠিয়েছেন। তবে তাপসের বিরুদ্ধে এখানেই অভিযোগের শেষ নয়। মন্ত্রীকে চিঠিতে ওই চিকিৎসক অভিযোগ করেছেন, ২০২২-এ মেডিক্যাল কাউন্সিল নির্বাচনের সময়ে তাঁকে ফাঁকা ব্যালট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন তাপস। এখনও তাপস কাউন্সিলের সদস্য।

আবার, ২০২৪ সালে সিল করা প্যাকেট থেকে দু’টি উত্তরপত্র উধাও হয়ে যাওয়ার বিষয়টি পরীক্ষা নিয়ামককে জানিয়েছিলেন ওই চিকিৎসক। সেই জন্য তাপসের কথা মতো তাঁকেই শো-কজ় করেন তৎকালীন অধ্যক্ষ। ওই চিকিৎসককে ঝাড়গ্রাম মেডিক্যালে বদলি করা হলেও, আর জি করের আন্দোলনের পরে সেই নির্দেশ প্রত্যাহার করা হয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে পাঠানো চিঠিতে এ-ও অভিযোগ করা হয়েছে, ২৪ জুলাই বর্ধমান মেডিক্যালের ডিনকেও চাপ দিয়ে পদত্যাগ করিয়েছেন তাপস। ওই হাসপাতালেরই সিনিয়র চিকিৎসকদের একাংশের কথায়, ‘‘ক্যামেরা বন্ধ করে পরীক্ষায় টোকাটুকি ও প্রশ্নপত্র ফাঁস কড়া হাতে বন্ধের চেষ্টা করেন ডিন।’’

চিকিৎসক মহলের একাংশের অভিযোগ, দীর্ঘ দিন ধরে সুপার পদে থাকা তাপস উত্তরবঙ্গ গোষ্ঠীর সদস্য, বিতর্কিত চিকিৎসক অভীক দে-রও অতি ঘনিষ্ঠ। চিকিৎসক মহলের একাংশের দাবি, ‘‘এখন আবার কেন্দ্রের এক নেতৃত্বের সহযোগীর ঘনিষ্ঠ হয়েছেন বলে শোনা যায়।’’ ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টরস ফোরাম’-এর সভাপতি কৌশিক চাকী বলেন, ‘‘প্রায় ১০ বছর ধরে স্বাস্থ্যের বেনিয়ম, চিকিৎসক বিরোধী নীতির প্রতিবাদ ও বিভিন্ন আন্দোলনে বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী আমাদের সহযোদ্ধা। আগামীতেও থাকবেন বলে বিশ্বাস। তাই এখন কেউ জার্সি বদল করে বিভ্রান্তি ওবিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করলে, তিনি নিরপেক্ষ তদন্ত করে পদক্ষেপ করবেন আশা করি।’’

স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘জেলা সফরে আছি। বিষয়টি তদন্ত করে দেখতে হবে।’’

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Bardhaman

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy