চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়! সেই আপ্তবাক্যই রাজনীতির আঙিনায় ফিরে ফিরে আসে বারবার। ফের এল সোমেন মিত্রের মৃত্যুদিনেও।
কর্মীদের আগলে রেখে সংগঠন চালানোই ছিল সোমেনের রাজনীতির মূল মন্ত্র। কলকাতার মহারাষ্ট্র নিবাস হলে ১৯৯২ সালে কংগ্রেসের সাংগঠনিক নির্বাচনে সোমেন ও মমতা বন্দোপাধ্যায়ের দ্বৈরথ ছিল ঐক্যবদ্ধ কংগ্রেসের কফিনে শেষ পেরেক। ভোটে জিতে সোমেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি হয়েছিলেন, পরে কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেছিলেন মমতা। এখন বঙ্গ রাজনাতিতে কংগ্রেস, তৃণমূল ও বিজেপিতে ছড়িয়ে থাকা অনেকেই সোমেনের শিয্য। কিছু সময়ের জন্য সোমেনও মমতার দলে গিয়েছিলেন, আবার ফিরেছিলেন কংগ্রেসে। আর রাজ্যে ক্ষমতায় এসে তৃণমূলের বিরুদ্ধে বারবার অভিযোগ উঠেছে কংগ্রেস ভাঙানোর। সোমেনের মৃত্যু-দিবসে সেই তর্কই আবার উঠল দিল্লি ওবং কলকাতায়!
ক্ষমতাচ্যুত তৃণমূলে এখন বিদ্রোহ ও ভাঙনের পালা। তাদের ২০ জন সাংসদ তৃণমূল ছেড়ে এনসিপিআই নামক অনামী দলে যোগ দিয়েছেন। আর সেই ২০ জন দলত্যাগী সাংসদের ছবি নিয়ে ‘গদ্দার’ লিখে সংসদ চত্বরে ঘুরে ঘুরে একক বিক্ষোভ করছেন অধিবেশন থেকে নিলম্বিত (সাসপন্ড) সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। ব্যানার গায়ে জড়িয়ে সংসদের মকর দ্বারের সামনে বৃহস্পতিবার বিক্ষোভরত কল্যাণকে দেখে এগিয়ে এসেছিলেন কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়ঙ্কা গান্ধী বঢরা। আরও কয়েক জন কংগ্রেস সাংসদ, নির্দল সাংসদ পাপ্পু যাদবও হাজির হন সেখানে। হাসিমুখেই প্রিয়ঙ্কা কল্যাণকে স্মরণ করিয়ে দেন, “আমাদের দল থেকে আপনাদের দলে গিয়েছিলেন, সেখান থেকেও ওঁরা চলে গিয়েছেন!” জবাবে কল্যাণ বলেন, “এঁরা কিন্তু কংগ্রেসের টিকিটে জিতে লোকসভায় আসেননি। তৃণমূলের টিকিটে জিতে এসেছিলেন।” প্রিয়ঙ্কার পাশে দাঁড়িয়ে পাপ্পু বলে ওঠেন, “ওঁরা সকলেই কিন্তু এক সময় কংগ্রেসে ছিলেন।”
কল্যাণ আবার বলেন, “আমি নিজেও তো কংগ্রেসি ছিলাম। যুব কংগ্রেসের সহ-সভাপতি ছিলাম আমি। আপনারা দিদিকে (মমতা) কংগ্রেস থেকে তাড়িয়েছিলেন। সেটা নিয়েও কথা বলুন… দিদিকে না-তাড়ালে আজ কংগ্রেসের এই অবস্থা হত না!” প্রিয়ঙ্কা মৃদু হেসেই বলেন, “রাজীব গান্ধী বরাবর দিদিকে সম্মান করতেন, স্নেহ করতেন।” কল্যাণ তখন বলেন, “হ্যাঁ সেটা আমি মানি, রাজীব গান্ধী দিদিকে ভালবাসতেন, সম্মান করতেন। কিন্তু পরবর্তী কালে কংগ্রেস সিপিএমের সঙ্গে হাত মেলায়। আমাদের লড়াইটাই ছিল সিপিএমের বিরুদ্ধে।” তাঁর মন্তব্য, “প্রিয়দা (প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি), এমনকি প্রণবদাও (প্রণব মুখোপাধ্যায়) সিপিএমের সঙ্গে এক হয়ে গিয়েছিলেন। তখন দিদি যা বলত, আমরা শুনতাম।” এর পরেই হাসতে হাসতে সংসদ ভবনের দিকে পা বাড়ান প্রিয়ঙ্কা। যাওয়ার আগে পাপ্পু জানতে চান, ‘‘কংগ্রেস এখন সঙ্গে আছে তো?’’ ইতিবাচক জবাব দেন কল্যাণ।
কলকাতায় সোমেনের প্রয়াণ দিবস পালন করতে গিয়ে কংগ্রেস নেতারা ডাক দিয়েছেন, যাঁদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ নেই, তৃণমূলের সেই নেতা-কর্মীরা কংগ্রেসে এসে বিজেপি-বিরোধী লড়াইয়ে শামিল হতে পারেন। সোমেন কী ভাবে সংগঠনকে শক্তিশালী করেছিলেন, কর্মীদের পাশে থাকতেন, সেই কথা স্মরণ করেছেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার, প্রাক্তন সভাপতি অধীর চৌধুরীরা। তারই মধ্যে এসে পড়ে প্রিয়ঙ্কা-কল্যাণ সংলাপের সংবাদ। যার প্রেক্ষিতে প্রদেশ কংগ্রেস নেতা অমিতাভ চক্রবর্তী মনে করিয়ে দিয়েছেন, ‘‘মমতা অবশ্যই কংগ্রেসের জনপ্রিয় নেত্রী ছিলেন। কিন্তু কংগ্রেস, বিশেষ ভাবে রাজীব গান্ধী তাঁর পিছনে না-থাকলে, তিনি নেতা হয়ে ওঠার সুযোগ পেতেন কি? প্রিয়ঙ্কা সংসদে কল্যাণকে এই সত্যি কথাটাই বলেছেন। কংগ্রেস পিছনে না-থাকলে, কল্যাণ বন্দোপাধ্যায়েরও রাজনীতিতে জন্ম হত না!’’ রাজ্যে ২০০১ সালে মহাজোটের নির্বাচনে কংগ্রেসের আগের বারের জেতা আসানসোলের আসন থেকে কংগ্রেসেরই সমর্থনে কল্যাণের বিধায়ক হওয়ার ইতিহাস স্মরণ করিয়ে অমিতাভের আরও মন্তব্য, ‘‘ওঁদের নেত্রী থেকে শুরু করে সবাই যে কংগ্রেসের দাক্ষিণ্যে নেতা হয়েছেন, সেই কংগ্রেসকেই ভেঙে দুর্বল করেছেন। সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত আজ করতেই হবে!’’