পুজোয় আমিষ খাওয়ার কারণে বাঙালিকে ‘পাখন্ডী’ (ভণ্ড) বলে সাব্যস্ত করে তিনি পশ্চিমবঙ্গ ছেড়েছেন। তবে ‘বাগেশ্বর বাবা’র নিরামিষ নিদানের জেরে বিতর্কের রেশ ফুরোয়নি।
শাসক দল বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য ‘বাগেশ্বর বাবা’র মন্তব্যের থেকে দূরত্ব স্পষ্ট করে দেওয়ার পরে এ বার মুখ খুলতে শুরু করেছেন একাধিক মন্ত্রী। বাঙালি তার ইচ্ছামতো আমিষ খাবে বলে জানিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি তাঁরা অবশ্য বিরোধীদের বিরুদ্ধে ‘রাজনীতির রুটি সেঁকা’র অভিযোগও তুলছেন। পাশাপাশি, বাংলা ও বাঙালিকে অপমান এবং ভাবাবেগে আঘাতের দায়ে ‘বাবা’র বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় অভিযোগ দায়ের করেছে কংগ্রেস। বিরোধীদের একযোগে দাবি, এমন ‘বিদ্বেষমূলক মন্তব্যে’র পরে সরকার ব্যবস্থা নেবে না কেন?
রাজ্যে ‘হনুমান কথা’ পড়তে এসে বাগেশ্বরধামের ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রী মন্তব্য করেছিলেন, দুর্গাপুজোর সময়ে এখানে ‘নোংরা নোংরা খাবার’ রান্না হয়! তাঁর মতে, পুজোর সময়ে যাঁরা আমিষ খান, তাঁরা ‘পাখন্ডী’ (ভণ্ড)। পুজোর দিনগুলিতে মাছ-মাংসের দোকান বন্ধ রাখার দাবিও তুলেছিলেন তিনি। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ‘বাগেশ্বরবাবা’র ওই নিদান নস্যাৎ করে বলেছিলেন, ‘‘এখানে স্বামী বিবেকানন্দের উপরে উঠলে বিপজ্জনক! বাগেশ্বর বাবা শুধু আবেদন করেছেন। বাঙালি কী খাবে, না-খাবে, তা বাঙালিই ঠিক করবে।’’ রাজ্যের মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ এবং অগ্নিমিত্রা পালও মঙ্গলবার ধীরেন্দ্রকৃষ্ণের নিরামিষ নিদান খারিজ করে দিয়েছেন। দিলীপ বলেছেন, ‘‘আমি মাছ ছাড়া অন্য কিছু খাই না। কিন্তু আমি কী খাই সেটা বড় কথা নয়, বাঙালির সংস্কৃতি পাঁঠা খাওয়া। এখানে পাঁঠা বলি হয়। দেবতার প্রসাদ হিসেবে পাঁঠার মাংস দেওয়া হয়। যার যেটা ইচ্ছে হয়, তিনি সেটা খাবেন।’’ ধীরেন্দ্রকৃষ্ণের বক্তব্যের সূত্রে দিলীপের মত, ‘‘উনি কি দাবি করতে পারবেন, ওঁর কাছে যাঁরা যান, সবাই নিরামিষাশী? সাধু-সন্তেরা তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নিরামিষ খাওয়ার কথা বলেন। কারণ, এতে শরীর-স্বাস্থ্য ভাল থাকে। কিন্তু বাঙালির সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমিষ খাওয়া। বিবেকানন্দ বলেছিলেন, যত দিন দেশ আছে, মা কালী মাংস খাবেন, শিব ডমরু বাজাবেন!’’
অগ্নিমিত্রা বলেছেন, ‘‘ভারতের অন্য প্রান্তে নবরাত্রির সময়ে নিরামিষ খাওয়াদাওয়া হয়। উনি হয়তো সেই কারণে বলেছেন। কিন্তু উনি বাঙালি সংস্কৃতি জানেন না। ফলে, উনি আমাদের বিষয়টা বুঝবেন না। বাঙালিরা সারা বছর টাকা জমায়। দুর্গাপুজোর চারটে দিন রেস্তোরাঁয় গিয়ে কব্জি ডুবিয়ে পাঁঠার মাংস, ইলিশ মাছ খাবে বলে।’’ সেই সঙ্গে বিরোধীদের উদ্দেশে তাঁর বার্তা, ‘‘আমাদের রাজ্য সভাপতি যা বলার স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন। এই বিষয়টা নিতে অযথা রাজনীতির রুটি সেঁকবেন না!’’ আর কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের বক্তব্য, ‘‘বাঙালি কী খাবে, তার ব্যাপার। এখানে কারও চাপিয়ে দেওয়া বা নিষেধাজ্ঞার কোনও প্রশ্ন নেই।’’
বিরোধীরা অবশ্য সরব। ‘বাগেশ্বর বাবা’র মন্তব্যে বাঙালিদের অপমান, ভাবাবেগে আঘাত এবং সমাজে বিভাজন ও অশান্তি সৃষ্টির চেষ্টা হয়েছে বলে পুলিশের দ্বারস্থ হয়েছে কংগ্রেস। উত্তর, মধ্য ও দক্ষিণ কলকাতা জেলা কংগ্রেসের তিন সভাপতি তারক পাল, মানস সরকার ও প্রদীপ প্রসাদের উদ্যোগে একাধিক থানায় এফআইআর-এর জন্য আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। হাওড়া পুলিশ কমিশনারেটের সাইবার অপরাধ শাখায় ‘বাগেশ্বর বাবা’র বিরুদ্ধে ‘ঘৃণা ভাষণে’র অভিযোগ পাঠিয়েছেন প্রদেশ কংগ্রেস নেতা প্রসেনজিৎ বসু। ভবানীপুরে কংগ্রেসের বিক্ষোভও হয়েছে। পুলিশ সূত্রের বক্তব্য, অভিযোগ-পত্র জমা পড়েছে। অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার বলেছেন, ‘‘তথাকথিত বাবা বাগেশ্বর যে ভাবে বাংলা ও বাঙালিকে অপমান করেছেন এবং বাঙালিকে ‘পাখন্ডী’ বলেছেন, তার তীব্র নিন্দা করছি। এই অপমানের বিরুদ্ধে প্রদেশ কংগ্রেসের কর্মী এবং সাধারণ মানুষের কাছে অনুরোধ করছি, রাজ্যের প্রতিটি থানায় বাগেশ্বর বাবার বিরুদ্ধে এফআইআর করুন।’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘এক দিকে বিজেপির রাজ্য সভাপতি বলছেন, বাঙালি কী খাবে সেটা বাঙালির ব্যাপার, অন্য দিকে মুখ্যমন্ত্রী সেই বাইরে থেকে আসা বাবাদের সামনে রেখে লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে রাখি উৎসবের নামে পংক্তি ভোজনের উৎসবে মেতে উঠছেন।’’ সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তীর দাবি, ‘‘কোনও দল-মতের ব্যাপার নয়, বাংলাকে অসম্মান করা হয়েছে। এই অসভ্যতা যাঁরা করেছেন এবং প্রশ্রয় দিয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।’’ কালীঘাটপন্থী তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক কুণাল ঘোষেরও মত, ‘‘বাংলার মানুষের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত!’’