প্রশ্ন উঠছে, বাংলা কি ‘খতরেঁ মে’ বা বিপন্ন? না কি পালাবদলের বাংলায় এই উৎসবের আমেজে হিন্দিগন্ধী উৎকট বাংলাই নবযুগের‘পুজোর হিড়িক’!
কলকাতা পুরসভার পুজোর বিজ্ঞাপনের গভীর বাণীতে এখন এ ভাবেই তোলপাড় দেবীপক্ষের বাংলা। যে বিজ্ঞাপনে মহালয়া থেকে বিজয়া দশমী পর্যন্ত শহর জুড়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ‘মায়ের করবো স্বচ্ছতা সে স্বাগত’! নেট-জগতে তুমুল ঠাট্টা ও নিন্দার ধাক্কায় অবশ্য পরে এই হিন্দির ছোঁয়াচ মুছে বাংলা লেখার চেষ্টা হয়। বিজ্ঞাপনটির নবরূপে বলা হয়েছে, ‘স্বচ্ছতার সঙ্গে মা’কে স্বাগত জানাই’!
এই বাংলা বা হিন্দি-বিভ্রাট নিয়ে জানতে চেয়ে কলকাতা পুরসভার প্রশাসক তথা পুর কমিশনারকে ফোন করা হলে তা বেজে যায়। ওয়টস্যাপে এবং এসএমএসে পাঠানো বার্তার উত্তরও মেলেনি। কড়া সমালোচনার মুখে দ্রুত হিন্দি ঘেঁষা বাংলা শুধরনোর চেষ্টা হলেও ওই বিজ্ঞাপনের বাংলাটুকুও খানিক অগোছালো ও খটোমটো থেকে গিয়েছে বলেই অনেকের মত।
ডাবল ইঞ্জিন সরকারের আমলে বা তার কিছুটা আগে থেকেই এ রাজ্যে হিন্দির বাংলার খুব কাছাকাছি আসার নিদর্শন অবশ্য চোখে পড়ছে। প্রশাসনিক কাজে বাংলা বাধ্যতামূলক করার নির্দেশে জোর দিয়েছে রাজ্যের বিজেপি সরকারও। কিন্তু নানা ছিদ্রপথে হিন্দির প্রবেশ ঘটছে মহাসমারোহেই। গত যোগ দিবসে কেন্দ্রীয় প্রকল্পের আওতায় শহর পরিচ্ছন্নতা অভিযান কর্মসূচি হিসেবে ‘স্বচ্ছতা সে স্বাগত’ শব্দবন্ধটির আমদানি ঘটে। নানা অনুষ্ঠানে বাংলা লিপিতে হিন্দি বার্তাটি লেখা হতে থাকে। তখনও কয়েকটি মহলে প্রশ্ন উঠেছিল, হিন্দি নাম না রেখে দেশের বহুত্বের সঙ্গে সঙ্গতি বজায় রেখে কর্মসূচিটির নামের বাংলা তর্জমা কেন করা হচ্ছে না।
অনেকের মনে হচ্ছে, এ বারও পুর-বিজ্ঞাপনে হিন্দিকে বহন করতে গিয়েই যত বিপত্তি। এ রাজ্যে বিজেপি শিবিরের বাংলায় এখন নমস্কার বা প্রণামকে ‘নমন’, খবর বা বার্তাকে ‘সূচনার’ মতো ‘বাংলা’ বহু চর্চিত হয়ে উঠেছে। সাধারণ বাঙালি তাতে অতটা অভ্যস্ত নয়। কিন্তু তার থেকেও চোখে বা কানে লাগছে বাংলার বাক্যে হিন্দি মেশানো কিছু অদ্ভুত প্রয়োগের প্রবণতা। যেমন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর প্রশাসক জীবনের ২৫ বছর উপলক্ষে কলেজে, স্কুলে একটি নাটক করার ফরমান জারি হয়। তার সংলাপেও ছিল বাংলা, হিন্দির অদ্ভুত মিশেল। খোদ মোদীর চরিত্রের মুখের সংলাপেই ছিল, ‘সৌগন্ধ আমাকে এই মাটির, আমি দেশ মিটতে দেব না, আমি দেশ ঝুঁকতে দেব না’! এর পরে পুরসভার বিজ্ঞাপনেও অদ্ভুতবাংলার স্পর্শ।
বিষয়টি নিয়ে সমাজমাধ্যমে সরব অনেকেই। আজকাল এআই বা কৃত্রিম মেধার তর্জমাতেও হিন্দি বা ইংরেজি থেকে বাংলা ভাষান্তর অনেক উন্নততর। প্রশ্ন উঠছে, তার পরেও বাংলা বিজ্ঞাপন এতটা হিন্দি-প্রভাবিত কেন? তৃণমূলের কুণাল ঘোষ বাংলাকে বিকৃত করা নিয়ে সমাজমাধ্যমেসরব হয়েছেন।
কারও কারও মনে হচ্ছে,হিন্দিকে ঔপনিবেশিক ভাষারমতো বাংলা বা অন্য ভাষার উপরে চাপানোর চেষ্টা থেকে এই সব গোলযোগ। প্রাক্তন সাংসদ ও অবসরপ্রাপ্ত সংস্কৃতি সচিব জহর সরকারের কথায়, “হিন্দিকরণটাই কেন্দ্রের শাসক দলের লক্ষ্য। ঘুরপথে হিন্দি চাপাতে জাতীয় শিক্ষা নীতির ত্রিভাষা চর্চার অভিসন্ধি। এদের চাপেই ঔপনিবেশিক ঢঙে বাংলা ভাষাতেও হিন্দি মেশানো হচ্ছে।” আক্ষেপেও ‘হামরা বঙ্গালি আছি’ বলে নেটরঙ্গে মেতেছে বাঙালি।