ইতিহাস মন্থনে শুধুই কি হিংসা বা বিভাজনের বিষ ছেঁচে আনা এখন লক্ষ্য? রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, স্কুলে লোকভবনের তরফে একটি বিশেষ প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা আয়োজনের জেরে এমনই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। দানা বাঁধছে বিতর্কও।
সদ্য নির্দেশিকা বেরিয়েছে, দু’টি প্রবন্ধেরই বিষয়, ১৯৪৬-এর গোষ্ঠী সংঘর্ষ সংক্রান্ত। দশম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির পড়ুয়াদের লিখতে হবে ‘১৯৪৬ সালের কলকাতার গণহত্যাযজ্ঞ, কারণ ও ফলাফলসমূহ’। শব্দসীমা ৩০০০-৪০০০। কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের বিষয়, ‘অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস, ভারতের চিরায়ত সভ্যতার ভিত্তির ওপর এক মারাত্মক আক্রমণ’। শব্দসীমা ৫০০০-৬০০০। বাংলা ও ইংরেজিতে আলাদা প্রতিযোগিতায় প্রথম তিন জন করে পুরস্কার পাবেন। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে পুরস্কারমূল্য এক লক্ষ, ৭৫ হাজার ও ৫০ হাজার টাকা। স্কুল স্তরে ৫০ হাজার, ৩৫ হাজার ও ২৫ হাজার করে। ১৫ নভেম্বরের মধ্যে লেখা পাঠাতে হবে। ২৬ জানুয়ারি পুরস্কার দেওয়া হবে লোকভবনে।
রাজ্যের সরকারি, সরকার-পোষিত, বেসরকারি যে কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পড়ুয়াই নাম লেখাতে পারবেন। শিক্ষা দফতর মারফত নানা স্কুল, কলেজে ইতিমধ্যে নির্দেশটি চলে গিয়েছে। অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষকেরা মনে করতে পারছেন না, আগে কখনও ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট ঘটনা নিয়ে কোনও রাজ্যপাল বা আচার্য প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা আহ্বান করেছেন কি না! নানা কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় মহলের খবর, পড়ুয়াদের কাছে নির্দেশটি পৌঁছনো হবে। ইচ্ছুকরা প্রতিযোগিতায় শামিল হতে পারেন।
মাস দেড়েক আগে ১৯৪৬-এর অগস্টের ঘটনাবলি নিয়েই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে আচার্য তথা রাজ্যপাল রবীন্দ্র নারায়ণ রবির বক্তৃতা বিতর্কের খোরাক জোগায়। ১৯৪৬-এর হিংসা নিয়ে স্বাধীন ভারতের বিভিন্ন সরকার এবং শিক্ষাবিদদের বিরুদ্ধে নীরবতার অভিযোগ এনে রবি তখন বলেন, ‘১৯৪৬-এর ঘটনা দুটো গোষ্ঠীর সংঘাত নয়। অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী সুরাবর্দী ও তাঁর ধাঁচের লোকজন এটা করেছিল। ১৬-১৯ অগস্ট চার দিনে দশ হাজার হিন্দু মারা যায়। হিন্দুদের উপরে মুসলিম লীগ সরকারের এই হিংসা পরে দেশ ভাগ করে। এটা ভারতীয় সভ্যতার উপরে নিষ্ঠুর হামলা।’ অনেকটাই একই ভাবে ১৯৪৬-এর কলকাতায় বেছে-বেছে একটি সম্প্রদায়ের উপরে হামলার তত্ত্ব সম্প্রতি তুলে ধরেছেন রাজ্যের শাসক দলের রাজনীতিবিদেরাও। কলকাতা ও যাদবপুরের প্রাক্তন উপাচার্য সুরঞ্জন দাশ-সহ বিভিন্ন ইতিহাসবিদের গবেষণার কথা উল্লেখ করে যা খণ্ডন করছেন ইতিহাসবিদেরা। দেখা যাচ্ছে রাজ্যের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপরে চাপানো প্রবন্ধ প্রতিযোগিতাও রাজ্যপাল বা আচার্যের সাম্প্রতিক বক্তৃতার নির্যাসটিই তুলে ধরছে।
রাজ্যপালের বক্তৃতার পরে ইতিহাসবিদেরা অনেকেই রাজ্যপাল প্রচারিত একপেশে বয়ানের নিন্দা করেন। গোষ্ঠী সংঘর্ষে মৃতের ধর্ম-পরিচয় খোঁজায় তিনি বিশ্বাসী নন বলে জানিয়ে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ইতিহাসবিদ সুগত বসু বলেছিলেন, ‘১৯৪৬-এর হিংসায় যেখানে যাঁরা কমজোর, তাঁরাই মারা গিয়েছিলেন। প্রথম দিকে হয়তো হিন্দুরা মারা যান, কিন্তু চার দিনের শেষে বেশি মারা গিয়েছিলেন মুসলিমেরাই।’ প্রবন্ধ প্রতিযোগিতাটি ঘোষণার পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের এক অধ্যাপক বলেছেন, “কোনও প্রবন্ধ প্রতিযোগিতার প্রতিপাদ্য বিষয়ে একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি থাকতেই পারে। কিন্তু ইতিহাসচর্চায় নানা মত উঠে আসে। প্রতিযোগী পড়ুয়াদের নিজস্ব মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কি আদৌ থাকবে? যে ভাবে ১৯৪৬ নিয়ে একটি নির্দিষ্ট মতামত তুলে আনতে শাসক-শিবির তৎপর, তাতে অন্য কোনও মত প্রকাশের সাহস প্রতিযোগীরা পাবেন কি না, সন্দেহের!”
প্রবন্ধ প্রতিযোগিতার নির্দেশিকায় অবশ্য গবেষণার গভীরতা, নিখুঁত তথ্য, ভাবনার মৌলিকতা ইত্যাদিতে জোর দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, প্রতিযোগীদের জন্য একটি অঙ্গীকারপত্রে তাঁরা সূত্র নির্দেশ ছাড়া নকল করেননি বা এআইয়ের সাহায্য নেননি বলেও জানাতে হবে। সারা ভারত সেভ এডুকেশন কমিটির সাধারণ সম্পাদক তরুণকান্তি নস্কর বলেন, “এমন বিষয় নিয়ে প্রবন্ধ লিখতে বলা লোকভবনের মর্যাদার সঙ্গে মেলে না। যে বিভাজনের জন্য ১৯৪৬-এর সংঘর্ষ বেধেছিল, এতে তা-ই উস্কে দেওয়া হবে।”