অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপ্ত সহায়ক সুমিত রায়কে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে এখন সিআইডি উদগ্রীব। কিন্তু অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংস্থা লিপ্স অ্যান্ড বাউন্ডস-এর মামলায় ইডি কেন হেফাজতে নিয়ে জেরা করতে গড়িমসি করেছিল, তা নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট প্রশ্ন তুলে দিল। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরাসরি নাম না করলেও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী বলেছেন, ওই সংস্থার ক্ষেত্রে ইডি অভিযুক্তদের হেফাজতে নিয়ে জেরা করতে গড়িমসি করেছিল। কখনও তদন্তকারী সংস্থা গড়িমসি করে, কখনও সক্রিয় হয়ে ওঠে।
সোমবার সুপ্রিম কোর্টে রাজ্য পুলিশের সিআইডি-র হয়ে কেন্দ্রের সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা ফের সুমিতকে হেফাজতে নিয়ে জেরার জন্য সওয়াল করেন। তাঁর অভিযোগ, শালবনির সরকারি জমি বেসরকারি জমি হিসেবে বেচে দেওয়ার টাকা সুমিত যে রাজনৈতিক দল (তৃণমূল কংগ্রেস)-এর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা করেছিলেন, তার প্রমাণ হিসেবে সুমিতের সই করা রসিদ তাঁদের কাছে রয়েছে। যে টাকা নগদে ব্যাঙ্কে জমা পড়েছে, তা মোট আর্থিক লেনদেনের হিমশৈলের চূড়া মাত্র। বাকিটা ‘কালো টাকা’, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা পড়েনি। গত ১৯ অগস্ট সিআইডি তদন্তের অগ্রগতির রিপোর্ট জমা দিয়েছিল। তার পরেও আরও ২ কোটি টাকা জমা পড়েছে। তা ছাড়া, রাজনৈতিক দলের থেকে লিপ্স অ্যান্ড বাউন্ডস নামের বেসরকারি সংস্থায় ৩০ কোটি টাকাসরানো হয়েছিল।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চে সলিসিটর জেনারেল মেহতা এ কথা বলতেই বিচারপতি বাগচী বলেন, লিপ্স অ্যান্ড বাউন্ডস-এর বিষয়ে যত কম বলা যায়, ততই ভাল। সে ক্ষেত্রে তদন্তকারী সংস্থা হেফাজতে নিয়ে জেরা করতে এত গড়িমসি করেছিল যে কলকাতা হাই কোর্টের একাধিক বিচারপতি হতাশা প্রকাশ করেছিলেন। তদন্তের ‘শ্লথ গতি’, জিজ্ঞাসাবাদের ‘গভীরতা’ নিয়েও তাঁরা প্রশ্ন তুলেছিলেন।
প্রসঙ্গত, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে কলকাতা হাই কোর্টের বিচারপতি অমৃতা সিংহ ও অন্য বিচারপতিরা একাধিকবার ওই সংস্থার বিরুদ্ধে আর্থিক নয়ছয়ের মামলায় ইডি-র তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। বিচারপতি বাগচী বলেন, ‘‘যেখানে একই জায়গায় অপরাধ থেকে আয়ের টাকার লেনদেনের একাধিক অভিযোগ রয়েছে, সেখানে কখনও তদন্তকারী সংস্থা গড়িমসি করে, অন্য সময়ে আবার সক্রিয় হয়ে যায়। ফলে তদন্তের স্বচ্ছতা, যুক্তিগ্রাহ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।’’ মেহতা যুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করেন, সে সময় তদন্তকারী সংস্থার উপরে অভিযুক্তের ‘প্রভাব’ ছিল। বিচারপতি বাগচী মনে করিয়ে দেন, ওই তদন্ত কেন্দ্রের সিবিআই এবং ইডি মিলে করছিল।
সুপ্রিম কোর্ট রাজ্য পুলিশের সিআইডি-কে বলেছে, সুমিত রায়ের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দল (তৃণমূল কংগ্রেস)-এর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা জমা করার অভিযোগ তুলছে সিআইডি। এখনও পর্যন্ত তাঁকে ভবানী ভবনে ডেকে যে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, সেখানে এই টাকার উৎস সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়েছে কি না, সিআইডি-কে তার প্রমাণে জিজ্ঞাসাবাদের ভিডিয়ো বা লিখিত রূপ জমা দিতে হবে।
সুমিতের আইনজীবী গোপাল শঙ্করনারায়ণন অভিযোগ তুলেছেন, ১১ দিন সকাল থেকে সন্ধ্যা জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও তাঁকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়নি। শুধুমাত্র রাজনৈতিক দলে কী ভাবে কর্মী নিয়োগ হত, কোথা থেকে তারা টাকা পায়, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। সুমিতের বিরুদ্ধে মাত্র একটি ক্ষেত্রে ১০ লক্ষ টাকা জমা করার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া কোনও রসিদ নেই। তাঁকে মূল অভিযুক্ত এবং একজন গাড়ির চালকের সামনে বসিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাঁরা সুমিতের বিরুদ্ধে কিছুই বলেননি। মেহতা বলেছেন, সুমিতকে টাকা জমা করার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলেও তিনি ‘কিছু মনে নেই’ বলে জানিয়েছেন। তাই হেফাজতে নিয়ে জেরাকরা প্রয়োজন।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, ‘‘আপনারা বলছেন, প্রতি দিন ৬০ লক্ষ, ৪০ লক্ষ করে কোটি কোটি টাকা জমা পড়েছে। সুমিত রায় সেই টাকা জমা করেছে কি না, টাকা কোথা থেকে পেয়েছে, কে দিয়েছে, কার নির্দেশে টাকা জমা পড়েছে, তা নিয়ে কি তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছে? তা করা হলে জিজ্ঞাসাবাদের সেই অংশের ভিডিয়ো রেকর্ড, অনুলিপি জমা দিন।’’ আগামী সোমবার ফের শুনানি হবে।