প্রতিবাদের তেজ বাড়বে। তার পাশাপাশি সমস্যায় থাকা মানুষের জন্য সহায়তার হাত এগিয়ে দিয়ে রাজ্যের বিরোধী পরিসরে সক্রিয়তা বাড়াতে চাইছে সিপিএম। এই পর্বে তাদের হাতিয়ার মূলত ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) পরে ঝুলে থাকা মানুষ এবং ‘অন্নপূর্ণা’ যোজনায় টাকা না-পাওয়া মহিলাদের সমস্যা। এই দুই ক্ষেত্রেই যথাসম্ভব স্থানীয় স্তরে উদ্যোগী হয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তার কাজ করতে দল ও গণসংগঠনে বার্তা দিয়েছে সিপিএম।
রাজ্যে প্রথম বার বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে প্রায় ৪৬% ভোট পেয়ে। অর্থাৎ তার চেয়ে বেশি সংখ্যক ভোটার বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপিকে সমর্থন করেনি। নিবার্চনের সময়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসের ঝুলিতে গিয়েছিল প্রায় ৪১% ভোট। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরের তিন মাসে বেশ কিছু ঘটনা ও পদক্ষেপে জনমানসে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। তার পাশাপাশি তৃণমূল ক্রমশ বিদ্রোহ ও অন্তর্দ্বন্দ্বে জর্জরিত হয়েছে। বিধানসভায় ‘স্বীকৃত’ বিরোধী দল, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়দের তৃণমূলকে এখনও বিধানসভার বাইরে বৃহত্তর পরিসরে দেখাই যায়নি। আর মমতা নিজে যে কয়েক বার বাইরে পা রেখেছেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ‘চোর’ স্লোগান-সহ বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয়েছে তাঁকে। সরকারে থাকাকালীন দুর্নীতি, অপশাসন, গা-জোয়ারির ভূরি ভূরি অভিযোগ এখনও তৃণমূলকে তাড়া করছে। সেই সঙ্গে কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের সাংগঠনিক কাঠামোও এখন দুর্বল। এই পরিস্থিতিতে বিধানসভার ভিতরে অস্তিত্ব ক্ষীণ হলেও বাইরের রাজনীতিতে জমি শক্ত করতে চাইছে সিপিএম। যেমন, যাদবপুর-সহ শিক্ষা ক্ষেত্রে ‘গেরুয়া আগ্রাসনে’র বিরুদ্ধে মুখোমুখি লড়াইয়ে নেমেছে বামেরাই।
আর এক বিরোধী দল কংগ্রেসের প্রভাব মূলত মালদহ ও মুর্শিদাবাদ জেলায়। তাদের এক সাংসদ ও দুই বিধায়ক ওই দুই জেলা থেকেই। বহরমপুরের প্রাক্তন সাংসদ অধীর চৌধুরী এবং মালদহ দক্ষিণের সাংসদ ইশা খান চৌধুরী এসআইআর-এর ট্রাইবুনালে আটকে থাকা বিশাল সংখ্যক মানুষের সমস্যা নিয়ে আইনি লড়াইয়েও নেমেছেন। আর মুর্শিদাবাদ জেলায় তৃণমূলের নির্বাচিত তিন সাংসদই এনসিপিআই-এ চলে যাওয়ায় (যারা আবার এনডিএ-র সঙ্গে আছে) কংগ্রেসের জন্য রাস্তা খুলছে। বামেদের পাশাপাশি কংগ্রেসও এখন রাজ্যে বিজেপির ‘প্রকৃত বিরোধী’র পরিসর পেতে চাইছে।
তথ্যের অধিকার আইনে (আরটিআই) কংগ্রেস সাংসদ ইশারই তোলা প্রশ্নে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের তরফে জানানা হয়েছে, এসআইআর-এ ‘বিবেচনাধীন’ ছিলেন মোট ৬০ লক্ষ ৬ হাজার ৬৭৫ জন। তার মধ্যে ‘অযোগ্য’ চিহ্নিত হয়েছিল ২৭ লক্ষ ২৮ হাজার ৫০০। ট্রাইবুনালের আওতায় আছে ৩৮ লক্ষ ১০ হাজার ৬২০টি আবেদন। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্তির পাশাপাশি বাদ দেওয়ার আবেদনও আছে। আর গোটা রাজ্যে গত ৭ অগস্ট পর্যন্ত যে ৮২ হাজার ৭৮২টি আবেদনের নিষ্পত্তি হয়েছে, তার মধ্যে ৭৫ হাজার ৪৪৩টি ক্ষেত্রেই (অর্থাৎ নিষ্পত্তির ৯১.১৩%) ভোটার তালিকায় পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত হয়েছে। কংগ্রেসের মতে, এখনও পর্যন্ত নিষ্পত্তি হওয়া আবেদনের ৯১%-এর বেশি যদি ভোটার তালিকায় ফিরে আসে, তা হলে বুঝতে হবে বিধানসভা নির্বাচনে এঁদের ভোটাধিকার থেকে অন্যায় ভাবে বঞ্চিত করা হয়েছিল! ইশার দাবি, ‘‘ভোটার তালিকা হতে হবে নির্ভুল, স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। কোনও প্রকৃত ও যোগ্য নাগরিককে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা চলবে না।’’
একই দাবি সামনে রেখে বিভিন্ন জেলায় কনভেনশন ও শিবির শুরু করেছে সিপিএম। দলের সঙ্গে যুক্ত আইনজীবীরাও গিয়ে ভোটার তালিকা সংক্রান্ত আবেদনের পদ্ধতির খুঁটিনাটি ব্যাখ্যা করছেন। একই ভাবে মহিলা সমিতিকে বলা হয়েছে এলাকাভিত্তিতে অন্নপূর্ণায় যোজনায় টাকা না-পাওয়া মহিলাদের প্রকল্পের সুবিধা পাইয়ে দিতে সহায়তা করতে। তাঁদের সঙ্গে দল ও অন্য গণসংগঠনকেও সক্রিয় হতে বলা হয়েছে জেলায়। সিপিএম নেতৃত্বের মত, প্রতিবাদ-আন্দোলন হবেই। তার সঙ্গে মানুষের আস্থা অর্জনে পরিষেবার কাজে ‘ইতিবাচক’ ভূমিকাও নিতে হবে।
সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম বলছেন, ‘‘বিজেপি শাসনে সারা দেশেই ক্ষোভ বাড়ছে। হার্মাদ, শহুরে নকশাল, ‘দিমাগি নকশাল’ ইত্যাদি তকমা দিয়ে প্রতিবাদকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা হচ্ছে। এগুলো শুধু কয়েকটা শব্দ নয়, যাঁরা প্রতিবাদ-আন্দোলন করছেন, তাঁদের কোন দৃষ্টিভঙ্গিতে শাসক পক্ষ দেখাতে চাইছে, তার ইঙ্গিত। মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেই প্রতিরোধের লড়াই করতে হবে। বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তুলতে হবে, যাতে আরও অনেক ধরনের প্রতিবাদী ব্যক্তিত্ব, গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ মানুষকে শামিল করা যায়।’’ এই বিষয়ে আরও রূপরেখা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা আগামী ২৯-৩০ অগস্ট কল্যাণীতে সিপিএমের রাজ্য কমিটির বর্ধিত অধিবেশনে।