কর্মক্ষম অবস্থায় দু’টি মন্ত্র তিনি আগাগোড়া সামনে রেখেছিলেন। সব বিষয়ে পার্টি বা দল ঢুকবে না! মানুষ যে ভাবে চান, সে ভাবে দলকে গড়ে তুলতে হবে এবং নতুন প্রজন্মকে গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রয়াত প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের জীবন ও শিক্ষা মাথায় রেখে তাঁর নামাঙ্কিত কেন্দ্রের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে সংযোগ বাড়াতে প্রয়াসী হচ্ছে সিপিএম। সরাসরি দলীয় কাঠামো মেনে নয়। সাংস্কৃতিক নানা উদ্যোগের মাধ্যমেই এই চেষ্টায় নামছে ‘বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কালচারাল সেন্টার’ (বিবিসিসি)। পরিকল্পনা সাজানো দায়িত্বেও রাখা হচ্ছে সিপিএমের তরুণ প্রজন্মের নানা মুখকে।
রাজ্যে ৩৪ বছরের বাম জমানায় দুই মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, একই সঙ্গে তাঁরা ছিলেন সিপিএম তথা বামফ্রন্টের শীর্ষ নেতা। তাঁদের মধ্যে প্রথম জন, প্রয়াত জ্যোতি বসুর নামে গবেষণা কেন্দ্র হয়েছে নিউ টাউনে। দলের তরফে তার দায়িত্ব সামলাচ্ছেন বিমান বসু ও রবীন দেব। ওই উদ্যোগ মূলত শিক্ষা ও গবেষণা সংক্রান্ত এবং পুরোপুরি সিপিএমের দলীয় তরফে। কিন্তু বুদ্ধদেবের নামাঙ্কিত সংস্কৃতি কেন্দ্রকে দলের গণ্ডির বাইরে নিয়ে যেতে চাইছে সিপিএম। রাজনীতিক বুদ্ধদেবের সংস্কৃতি জগতেও অবাধ বিচরণ ছিল। মনোযোগী পাঠক ছিলেন, দেশ-বিদেশের বইয়ের খবর রাখতেন। রাজ্যে শিল্প, সাহিত্য, নাটক ও চলচ্চিত্র জগতের ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে ছিল তাঁর সহজ মেলামেশা। বুদ্ধদেবের সেই জীবনকে স্মরণে রেখেই সাংস্কৃতিক পরিসরে সক্রিয়তা বাড়াতে চাইছে সিপিএম। যার নেপথ্যে অবশ্যই রয়েছে রাজনৈতিক চিন্তা।
বঙ্গ সিপিএমের প্রয়াত পাঁচ নেতা প্রমোদ দাশগুপ্ত, জ্যোতি বসু, সরোজ মুখোপাধ্যায়, অনিল বিশ্বাস ও বুদ্ধদেব, প্রত্যেকের নামেই আলাদা প্রকল্প রেখেছে সিপিএম। তা ছাড়াও রয়েছে ‘সীতারাম ইয়েচুরি ক্যাডারশিপ প্রোগ্রাম’। দলীয় সূত্রের ব্যাখ্যা, বাংলায় সাম্প্রতিক পালাবদলের পরে স্বাধীন চিন্তার উপরে আঘাত এবং শিক্ষা, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক-সহ সব ক্ষেত্রেই নাক গলানো বা সংখ্যাগুরুর মত চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (আরএসএস) ও বিজেপির সঙ্গে বাম রাজনীতি তথা মতাদর্শের সরাসরি সংঘাত বেধেছে। এই পরিস্থিতিতে কেবল রাজনৈতিক স্লোগান বা কর্মসূচিই নয়, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলেও বাংলার নিজস্ব ঐতিহ্য রক্ষা করে বাঙালির মন ও চিন্তাকে ছুঁয়ে থাকার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে বলে সিপিএম নেতৃত্বের মত। বিবিসিসি-র মাধ্যমে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড করে তরুণ প্রজন্মকেও কাছে টানার চেষ্টা হবে। বারাসতে আগামী ১০ সেপ্টেম্বরই ‘প্রজন্মের ডাক’ নামে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতে চলেছে প্রতিরোধের ভাবনায় শাণ দিয়ে, যার পিছনে আছে বিবিসিসি।
সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের কথায়, ‘‘শুধু দল নয়, তার বাইরেও উদার, সংস্কৃতিমনস্ক যে বহু মানুষ আছেন, তাঁদের বুদ্ধদা’র নামে সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত করতে চাওয়া হচ্ছে। ভার্চুয়াল এবং সাংস্কৃতিক নানা অনুষ্ঠান করে এগোনো হবে। প্রতি মাসে একটা করে ওই ধরনের অনুষ্ঠানের লক্ষ্য রয়েছে। এই কেন্দ্রের হয়ে পরিকল্পনা ও কর্মসূচি সাজানোর ক্ষেত্রে তরুণ ছেলে-মেয়েদেরও ভূমিকা থাকছে।’’ দলেরই একটি সূত্রের মত, আর জি কর আন্দোলনের সময়ে বাম সাংস্কৃতিক প্রতিবাদে যে সাড়া এসেছিল, সেই পথেই এগোনোর ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি, শুধু সরকার নয়, গোটা শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভ সিজেপি-র আন্দোলন দেখিয়ে দিয়েছে। সেই প্রেক্ষিতেও সাংস্কৃতিক উদ্যোগ বাড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে। বিবিসিসি-র এই উদ্যোগে শামিল করা হচ্ছে দীপ্সিতা ধর, আফরীন বেগমদের মতো সিপিএমের তরুণ অংশকে।
সিপিএমেরই এক তরুণ নেতার মতে, ‘‘অনেক দিন শাসক বাম ছিলাম। তখন অনেকের সঙ্গেই অবাঞ্ছিত দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। এখন লড়াকু বাম হয়ে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল বিস্তৃত করতে চাইছি।’’