বিড়ম্বনা বিস্তর! তবে বৃহত্তর আন্দোলনের স্বার্থে আপাতত কাঁটা হজম করে চলারই সিদ্ধান্ত নিল সিপিএম।
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবিতে এবং ‘ভোট চুরি’র প্রতিবাদে রাজধানীতে লাগাতার আন্দোলনে নেমেছে ‘ইন্ডিয়া’ মঞ্চ। সেই মঞ্চে শুরু থেকেই কংগ্রেসের পাশাপাশি আছে সিপিএম এবং এই রাজ্যের সাবেক তৃণমূল কংগ্রেস। তবে জ্ঞানেশ-প্রশ্নে নতুন উদ্যমে প্রতিবাদ শুরু হওয়ার পরে আলাদা করে ‘নৈকট্য’ দেখা যাচ্ছে সিপিএমের সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। এতে যে রাজ্যে দলের ভিতরে-বাইরে প্রশ্ন উঠছে, সেই চর্চা উঠল সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটিতে। তারই পাশাপাশি, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) প্রভাব তাঁদের রাজ্যে নির্বাচনে কেমন পড়েছে এবং কংগ্রেসের ভূমিকা সেখানে কেমন ছিল, সেই প্রশ্নে দ্বিমত পোষণ করছেন সিপিএমের কেরলের নেতারা। তবে সূত্রের খবর, রাজ্যভিত্তিক মতপার্থক্য সরিয়ে রেখেই বিজেপি-বিরোধী আন্দোলন সংগঠিত করে চলতে চাইছেন সিপিএমের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব।
জ্ঞানেশ-প্রশ্নে ‘ইন্ডিয়া’ মঞ্চ এবং ছাত্র-যুবদের প্রতিবাদে দিল্লি যখন উত্তাল, সেই সময়েই রাজধানী শহরে ছিল সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক। তবে সিজেপি-র ডাকে যন্তর মন্তর অভিযানে শামিল হওয়ার জন্য শনিবার, দ্বিতীয় দিনের বৈঠক মুলতুবি রাখা হয়েছিল। ওই দিনই আলাদা জায়গায় একই প্রতিবাদে যোগ দিয়ে দিল্লি পুলিশের হাতে আটক হয়েছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা, সিপিএমের দুই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন ও মানিক সরকার-সহ দলের বঙ্গীয় নেতারাও। সূত্রের খবর, কেন্দ্রীয় কমিটির সংক্ষিপ্ত আলোচনার সুযোগেই এ রাজ্যের নেতারা জানিয়েছেন, সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবির চিঠি পেয়ে মমতার ফোন এবং তার পরে ‘ভোট চুরি’র প্রতিবাদে দু’পক্ষের রাস্তা মিলে যাওয়া নানা মহলে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। দলের নিচু তলার কর্মী এবং সমর্থকদের মধ্যেও প্রশ্ন আছে। কারণ, মুখ্যমন্ত্রী মমতার জমানায় ভোট লুট, দেদার কারচুপি এবং ভোটার তালিকায় ‘ভূত’ নিয়ে টানা সরব ছিল সিপিএম। সেই অতীত এত দ্রুত মুছে যায় না! ফলে, বিজেপি-বিরোধী আন্দোলনের ক্ষতি না-করেও বিষয়টি নিয়ে ‘সচেতন’ থাকার আর্জি জানিয়েছেন তাঁরা। দলের এক নেতার কথায়, ‘‘কংগ্রেস এবং আমাদের উদ্যোগে মমতা নিজে থেকে ঢুকে যাচ্ছেন। আমাদের কাছে ওঁর বিষয়টা শাঁখের করাতের মতো!’’
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরে বিরোধী পরিসরে এখন সুস্থিতি আসেনি। এমতাবস্থায় মমতা-তৃণমূল ও সিপিএমকে এক বন্ধনীতে বসিয়ে আক্রমণ শুরু করে দিয়েছে বিজেপি। ‘জামাতপন্থী’ তৃণমূলের বরাবরই ‘বি টিম’ সিপিএম, এই ভাষ্য সামনে আনছেন বিজেপির নেতারা। দলের প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি ও কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার যেমন বলছেন, ‘‘রাজ্যে দীর্ঘ দিন ক্ষমতায় থাকার পরে বামপন্থীরা এখন রাজনৈতিক ভাবে অপ্রাসঙ্গিক। আর তৃণমূল বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পরে সাংগঠনিক ভাবে দুর্বল। তারা একসঙ্গে চলতে চাইছে। বাইরে রাজনৈতিক বিরোধিতা দেখা গেলেও আড়ালে দু’দলের মধ্যে বোঝাপড়ার কথা বিজেপি দীর্ঘ দিন ধরেই বলে আসছে।’’
ঘরে-বাইরে অস্বস্তি সামাল দিয়েই সিপিএম নেতৃত্বকে এখন মধ্যপন্থা খুঁজতে হচ্ছে! দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তীর মতে, ‘‘বেশ কয়েক বছর ধরেই কংগ্রেস এবং সিপিএম উদ্যোগী হয়ে বিজেপির ফ্যাসিবাদী রাজনীতির প্রতিবাদকে বৃহত্তর চেহারা দিতে চেষ্টা করছে। তখন বোঝেননি, এমন এনেকে এখন আসতে চাইছেন। তখন তাঁরা হয় বোঝেননি, নয় মোদীর হাতে খেলেছেন! তবে তার মানে এটা নয় যে, এক জনের সঙ্গে আমাদের বিরোধ আছে বলে তিনি আক্রান্ত হলে খুশি হব!’’ দিল্লির বৈঠকে যোগ দিতে গিয়ে প্রবীণ নেতা বিমান বসুও ব্যাখ্যা দিয়েছেন, ‘ভিন্নতা-অভিন্নতা’ নিয়েই ‘ইন্ডিয়া’র শরিকেরা বৃহত্তর স্বার্থে আন্দোলনে থাকবে। রাজ্যে নির্বাচনী সমঝোতার সঙ্গে এই প্রশ্নকে এক করে ফেলা উচিত নয়।
অবস্থানের ‘ভিন্নতা’ বজায় রাখতেই কেরলের তিরুঅনন্তপুরম ও কোঝিকোঢ়ে ‘একেজি সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড স্টাডিজে’র উদ্যোগে ইডি-র ভূমিকা সংক্রান্ত আলোচনা-সভায় আপ নেতা অরবিন্দ কেজরীওয়ালকে আমন্ত্রণ করা হয়েছে, রাহুল গান্ধীকে নয়। সিপিএমের রাজ্য নেতৃত্বের যুক্তি, বিধানসভা ভোটের সময়ে কেরলে গিয়ে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিজয়নের বিরুদ্ধে কেন ইডি কিছু করছে না, সেই সওয়াল করে এসেছিলেন রাহুল!