ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় যে ‘বৈধ’ ভোটারদের নাম বাদ গিয়েছে, তাঁদের নাম ফেরানো এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবিতে জোড়া বিক্ষোভে তপ্ত হল কলকাতার রাজপথ।
আলাদা ভাবে শুক্রবার রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (সিইও) দফতর অভিযানের ডাক দিয়েছিল সিপিএমের মহিলা সংগঠন গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতি এবং প্রদেশ কংগ্রেস। প্রথমে ব্যারিকেড ভেঙে এগিয়ে বৌবাজারে পুলিশের বাধার মুখে বৌজারে রাস্তার উপরে ধর্নায় বসেছিলেন মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়, কনীনিকা ঘোষ, মোনালিসা সিন্হা, জাহানারা খানেরা। অন্য রাস্তা ধরে মহিলাদের একাংশ সিইও দফতরের দিকে এগোনোর চেষ্টা করলে সেখানে গোলমাল বাধে। প্রথম স্তরের ব্যারিকেড ভেঙে ফেলার পরে লাঠি উঁচিয়ে বিক্ষোভকারীদের তাড়া করে পুলিশ। পরে সেখানেই ছোট সভা করে সিউএ দফতরে দাবিপত্র দিতে গিয়েছিলেন সিপিএমের মহিলা নেতৃত্ব। ছিলেন এসআইআর-এর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আবেদনকারী, মুর্শিদাবাদের মোস্তারি বানু এবং আইনজীবী সায়ন বন্দ্যোপাধ্যায়ও। অন্য দিকে, বৌবাজারের আর এক দিকে রাস্তায় আগুন জ্বেলে জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন কংগ্রেসের কর্মী-সমর্থকেরা।
‘ভোটার তালিকায় আমার নাম ফিরিয়ে দাও’— এই স্লোগান সামনে রেখে ধর্মতলায় জমায়েত করেছিল মহিলা সমিতি। মিছিলে মহিলাদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতোই। রোদ-বৃষ্টির লুকোচুরির মধ্যে চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ ধরে মিছিল এগোনোর পরে গণেশচন্দ্র অ্যাভিনিউয়ের কাছে প্রথমে ব্যারিকেড ভেঙে ফেলেন মহিলা প্রতিবাদকারীরা। পরে বি বি গাঙ্গুলি স্ট্রিটে মিছিল আটকে দিলে সেখানেই রাস্তায় ধর্নায় বসে পড়েছিলেন সিপিএমের মহিলা নেতৃত্ব। সিইসি জ্ঞানেশে পদত্যাগ এবং এসআইআর-এর সময়ে রাজ্যের সিইও-র দায়িত্বে থাকা মনোজ আগরওয়ালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি করেছেন তাঁরা। মীনাক্ষীর বক্তব্য, ‘‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ত্রুটিপূর্ণ এসআইআর করা হয়েছে। অদ্ভুত সব কারণ দেখিয়ে বহু মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের নাম ভোটার তালিকায় ফেরাতে হবে।’’ তাঁর আরও দাবি, ‘‘আতঙ্কে, দুশ্চিন্তায় অনেকের মৃত্যু হয়েছে, কেউ কেউ আত্মহ্ত্যা করেছেন। তালিকায় নাম তোলার জন্য অসহায়, প্রান্তিক মানুষ এখানে ওখানে ছুটে বেড়াবেন আর জ্ঞানেশ নিশ্চিন্তে চেয়ারে বসে থাকবেন, এটা হতে পারে না! সিইও দফতকরে অনেক বার অভিযোগ জানানো হয়েছিল। তৎকালীন সিইও-র বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগে তদন্ত হওয়া উচিত।’’
পরে সিইও দফতরে দাবি জানিয়ে এসে সংগঠনের রাজ্য সম্পাদক মোনালিসা বলেছেন, ‘‘আগে থেকে সিইও-র (নীলম মিনা) কাছে দেখা করার জন্য সময় নেওয়া হলেও এ দিন তিনি কার্যালয়ে ছিলেন না। তাঁর সহকারীর কাছেই দাবিপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষ কোনও সদুত্তর পাওয়া যায়নি।’’ দাবির সুরাহা না-হলে ফের বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন মহিলা সমিতির নেতৃত্ব।
জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ চেয়ে কংগ্রেসের বিক্ষোভ। — নিজস্ব চিত্র।
জ্ঞানেশের অপসারণ, নইলে পদত্যাগের দাবিতে সব রাজ্যেই এ দিন পথে নেমেছিল কংগ্রেস। কলকাতায় প্রতিবাদে নেমে জ্ঞানেশের গ্রেফতারও দাবি করেছেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার। কলেজ স্কোয়ার থেকে শুরু হওয়া সিইও দফতরমুখী কংগ্রেসের মিছিল বি বি গাঙ্গুলি স্ট্রিট এবং চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউয়ের সংযোগস্থলের কাছে আটকে দিয়েছিল পুলিশ। সেখানেই জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন কংগ্রেসের কর্মী-সমর্থকেরা। মিছিলে ছিলেন এআইসিসি-র পর্যবেক্ষক প্রকাশ জোশী এবং দলের অন্য নেতারা। কমিশনের মধ্যে মতবিরোধের খবর প্রকাশ্যে আসার পরে কমিশনের তরফে যা বিবৃতি দেওয়া হয়েছে, তাকে কটাক্ষ করে প্রদেশ কংগ্রেস নেতা অমিতাভ চক্রবর্তীর মন্তব্য, ‘‘যেখানে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগই অগণতান্ত্রিক উপায়ে করা হয়, সেখানে জ্ঞানেশ কুমারের কোনও সিদ্ধান্ত গণতান্ত্রিক হতে পারে কি?’’
পশ্চিমবঙ্গে শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু বিধানসভা নির্বাচন করানোয় জ্ঞানেশকে কমপক্ষে ‘পদ্মভূষণ’ দেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। এআইসিসি-র মুখপাত্র সুপ্রিয়া শ্রীনতে এ দিন পাল্টা কটাক্ষ করেছেন, ‘‘জ্ঞানেশ কুমার কারচুপি করে বিজেপিকে বাংলায় জিতিয়েছেন। এখন বিজেপির রাজ্য সভপতি তাঁর জন্য পদ্মভূষণ চাইছেন!’’