E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

বিষাদের পুজোয় অচেনা অষ্টমী, ভিড় কমেছে রাস্তাতেও

চোরবাগান সর্বজনীনের চেহারাও বদলে গিয়েছে। গলিতে ঢোকার মুখ বন্ধ করে পুলিশি পাহারা। কেউ এসে দাঁড়ালে পুলিশকর্মীরাই বলছেন, ‘‘পুজো বন্ধ, এগিয়ে যান।’’

কুন্তক চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২০ অক্টোবর ২০২৬ ০৫:৩৭

—প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।

অষ্টমীর সকালে শ্যামনগর থেকে শিয়ালদহমুখী ট্রেনে চাপার আগে সুমন ভট্টাচার্য ধরেই নিয়েছিলেন, ঠাসা ভিড় হবে। কিন্তু কোথায় কী! দিব্যি ফাঁকা ট্রেনে চেপেই পৌঁছন গন্তব্যে। সোমবার ভরদুপুরে রাস্তাঘাট অন্য বছরের তুলনায় ফাঁকা। বিকেলেও মেট্রোয় সেই উপচে পড়া ভিড় নেই। চোরবাগানের মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যুর পর এ বার অষ্টমী যেন ‘অন্য রকম’। কিছুটা অচেনাও বটে!

চোরবাগান সর্বজনীনের চেহারাও বদলে গিয়েছে। গলিতে ঢোকার মুখ বন্ধ করে পুলিশি পাহারা। কেউ এসে দাঁড়ালে পুলিশকর্মীরাই বলছেন, ‘‘পুজো বন্ধ, এগিয়ে যান।’’ যে রাস্তায় দু’দিন আগেও ছিল মানুষের ঢল, অষ্টমীর সকালে সেখানে ‘অঘোষিত বন্‌ধ’-এর চেহারা। এলাকাও থমথমে। মণ্ডপের সামনের অংশ ঘেরা। ক্লাব কর্তৃপক্ষের কাউকে দেখা যায়নি। আশেপাশের দোকানপাট খোলা থাকলেও, সবার মুখেই বিপর্যয়ের দিনের কথা। এলাকাবাসীরা বলছেন, তাঁরা ভুলতে পারছেন না গোটা ঘটনা!

সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ থেকে মুক্তারামবাবু স্ট্রিটে বড় গাড়ি ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। জমায়েতও কার্যত নিষিদ্ধ। আগরপাড়া থেকে সপরিবার ঠাকুর দেখতে এসেছিলেন এক দর্শনার্থী। পুজো বন্ধ দেখে তিনি বলেন, ‘‘এখানে এসে শুনলাম, এই প্যান্ডেল আর খোলাই হবে না।’’ এলাকার এক বাসিন্দার কথায়, ‘‘এমন অষ্টমী আগে দেখিনি! মানুষের ভিড় উধাও। চারদিকে শুধু পুলিশ।’’ তবে পুজো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। মণ্ডপের ভিতরে পুজোর আচার পালন করা হচ্ছে বলে জানালেন এক পুলিশকর্মী।

এই বিপর্যয়ের ছাপ পড়েছে গোটা শহরেই। প্রতি বছর অষ্টমীর দুপুর থেকেই মেট্রো, রেল স্টেশন থেকে কাতারে কাতারে নেমে আসা মানুষের ভিড় সামলাতে নাকাল হয় পুলিশ। এ দিন বেলা সওয়া দুটোয় শ্রদ্ধানন্দ পার্ক থেকে বি বি গাঙ্গুলি স্ট্রিট পর্যন্ত দু’পাশের ব্যারিকেড ফাঁকা! উত্তর শহরতলি থেকে ধর্মতলা পৌঁছতে মেরেকেটে ৪৫ মিনিট লেগেছে। বিকেলে লালবাজারের এক অফিসার বলছিলেন, ‘‘উত্তর কলকাতার রাস্তাঘাট অন্য বছরের তুলনায় বেশি সচল। দক্ষিণেও তেমন ভিড় নেই।’’ লেকটাউন ভিআইপি রোডের চেনা যানজটও উধাও। মহানগরের বহু পুজো ভিআইপি পাস বাতিল করেছে। সবাইকে এক লাইন দিয়েই মণ্ডপে ঢোকানো হচ্ছে।

বিপর্যয়ের পর শিক্ষা নিয়ে অভিজ্ঞ পুলিশ অফিসারদের পথে নামিয়েছে প্রশাসন। ফলে কোথাও ভিড় জমলেও মাত্রাছাড়া হতে পারেনি। ষষ্ঠী পর্যন্ত মণ্ডপে ভিড় জমানোর হুজুগ ছিল সর্বজনীন-কর্তাদের। উত্তর কলকাতার এক পুজো-কর্তা এ দিন বলেন, ‘‘ভালয়-ভালয় পুজো মিটলে বাঁচি!’’

দক্ষিণের এক পুজো-কর্তা বলছিলেন, ‘‘মণ্ডপের ভিতরে ঢুকে মোবাইলে ছবি তোলা, রিল তৈরি করা বিপজ্জনক। মুখে আপত্তি করলেও নিখরচে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারের জন্য অনেক পুজো-কমিটি দর্শনার্থীদের রিল তোলায় আপত্তি করত না। এ বারের বিপর্যয় দেখে তা-ও বন্ধ হয়েছে।’’ পুলিশ জানিয়েছে, মণ্ডপে রিল তোলা, দাঁড়িয়ে ছবি তোলা নিষেধ করতে প্রতি পুজো কমিটিকে অডিয়ো ক্লিপ পাঠানো হয়েছে। তা মণ্ডপে বাজাতেও বলা হয়েছে। সপ্তমীর রাত থেকেই অনেক পুজোয় রিল তোলা ঠেকাতে দর্শনার্থীদের মোবাইল আটক করে পুলিশের হাতে জমা দেওয়া শুরু হয়েছে। এ দিন শহরের বিভিন্ন মণ্ডপে নিষেধ অমান্য করে রিল তৈরি করলে মোবাইল বাজেয়াপ্তর ‘হুঁশিয়ারি’ দেওয়া হয়েছে। ভিড় কমেছে তরুণ প্রজন্মের একাংশেরও। মধ্যমগ্রাম থেকে শোভাবাজারে আসা এক ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়া বলছেন, ‘‘এ বার মণ্ডপে ঘুরব না। কোথাও ফাঁকায় বসে আড্ডা দিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরব।’’

রাত পেরোলেই নবমী। উৎসবের শেষ রাত। সে রাতে ভিড় আবার জমবে কি না, সেটাই দেখার।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Durga Puja

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy