দুর্গা পুজো না কি শারদোৎসব থেকে বুক স্টল— চলমান বিতর্কের রেশ ছড়াল গণেশ চতুর্থীর মঞ্চেও। গণেশ পুজো উপলক্ষে উদ্বোধন-সহ নানা কর্মসূচিতে কয়েক দিন ধরেই ব্যস্ত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। তবে যে সব বিষয়গুলি নিয়ে বিতর্ক, তা নিয়ে সোমবার ভিন্ন সুর শোনা গেল সরকার ও দলের দুই শীর্ষ নেতার গলায়। এরই মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী এ বার জানালেন, ‘শারদোৎসব’ করা যেতে পারে, কিন্তু তা যেন হয় শাস্ত্র মতে।
শারদ-উৎসব নয়, দুর্গা পুজো লিখতে হবে, তা না-হলে বই বিক্রির স্টল দেওয়া যাবে না বলে বামেদের হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। তার রেশ ধরেই এ দিন বালিগঞ্জে ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের গণেশ পুজোয় যোগ দিয়ে শুভেন্দু বলেছেন, “আমি দুর্গা পুজো লিখতে হবে বলেছি বলে কমিউনিস্টদের খুব রাগ। খুব গালাগালি দিচ্ছে আমাকে। কমিউনিস্ট নেতাদের বলছি, নবান্নে বহু বছর ধরে বিশ্বকর্মা পুজো হচ্ছে। আমি এই বছর কর্মীদের সঙ্গে পুষ্পাঞ্জলি দেব। আপনারাও আসুন, আমার সঙ্গে পুষ্পাঞ্জলি দেবেন। পরিবর্তনের স্বাদ উপভোগ করুন।” এর পরেই চেতলার গণেশ পুজোর মঞ্চ থেকে শুভেন্দু অবশ্য বলেছেন, “হ্যাঁ, শারদোৎসব করুন! সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, গান-বাজনা করুন। কিন্তু পুজোটা যেন পঞ্জিকায় যেমন বলা আছে, তেমন ভাবে হয়।”
গণেশ পুজোয় বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। নাগেরবাজারে।
যদিও পুজোর সময়ে সিপিএমের বইয়ের স্টল প্রসঙ্গে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক বলেছেন, “কেউ যদি বইয়ের স্টল করতে চান, করবেন। অনুমতি নিয়ে করবেন। যদি পুজো কমিটিগুলি অনুমতি দেয়, তা হলে আপত্তি কোথায়।” তাঁর সংযোজন, “যেটা নিয়ে মূল বিতর্ক, তার জবাব স্বামী বিবেকানন্দ দিয়ে গিয়েছেন। আগে বলা হত, যিনি ধর্ম বিশ্বাস করেন না, তিনি নাস্তিক। আধুনিক ধর্ম বলছে, যিনি নিজেকে বিশ্বাস করেন না, তিনি নাস্তিক।”
এই আবহে টানা সরব সিপিএম-ও। দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তীর বক্তব্য, “পুজোর সময়ে আমরা যেমন বই বিক্রয় কেন্দ্র করি, তেমনই করব। বাড়তি বা কম কিছু করব না। ওই বিক্রয় কেন্দ্রে মার্ক্সীয় সাহিত্য ছাড়াও নানা রকম বই পাওয়া যায়। তাই-ই মিলবে। এই নিয়ে শুভেন্দুবাবু, শমীকবাবুদের মাথা না-ঘামালেও চলবে!” পাশাপাশি, নবান্নে মুখ্যমন্ত্রীর পুজো-‘আমন্ত্রণ’ নিয়ে সুজনের কটাক্ষ, “বিশ্বকর্মা পুজোকে তো বিশ্বকর্মা পুজোই বলা হয়। এখানে শারদ-উৎসব বিতর্ক টানার মানে নেই। কল-কারখানায় এই পুজো হয়। সেখানে আমরা গিয়েও থাকি। হঠাৎ নবান্নে যাব কেন?”
প্রসঙ্গত, বাঙালির সংস্কৃতিতে দীর্ঘ দিন ধরে গণেশ-আরাধনার চল ছিল পয়লা বৈশাখের দিনে। গত তৃণমূল এবং বর্তমান বিজেপি আমলে কয়েক বছর ধরে রাজ্যে গণেশ পুজোর সংখ্যা দৃশ্যমান ভাবে বেড়েছে। এই আবহে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু ‘প্রদেশ-ভিত্তিক বিভাজনে’র সীমা ভাঙার বার্তা দিয়েছেন। বলেছেন, “আগে বলা হত গণেশ মরাঠিদের দেবতা। আমরা দেওয়ালটা ভেঙে দিয়েছি। এটাই হিন্দু-ঐক্য। বিহারী, গুজরাতি, মরাঠি কেউ ‘বাহারি’ নন। এখন কোজাগরীর মতো ঘরে ঘরে গণেশ পুজো হচ্ছে।”
এরই মধ্যে গণেশ পুজোর সঙ্গে রাজ্যে শিল্পায়নের প্রশ্নটিকে এক সূত্রে বাঁধতে চেয়েছেন বিজেপি নেতৃত্ব। শমীকের দাবি, “গণেশ পুজোর সংখ্যা বেড়েছে। সুখ, সমৃদ্ধি, শিল্পায়নের সুযোগ বাড়ছে। রাশিয়ার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ‘ডেটা সেন্টার’ তৈরি হবে। হয়তো একটা বছর সময় লাগবে।” মুখ্যমন্ত্রীও বলেছেন, “একাধিক শিল্প ইতিমধ্যে পশ্চিমবঙ্গে এসেছে। আদানি গোষ্ঠীও ২৪ সেপ্টেম্বর কলকাতায় আসবে।” পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালেরও দাবি, “বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরে রাজ্যে প্রচুর শিল্প এসেছে। তাই গণেশ পুজোও হচ্ছে।”