প্রাক্তন মন্ত্রী ও ডেপুটি স্পিকার আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পরে শীর্ষ নেতৃত্বের অনুপস্থিতি ঘিরে কালীঘাটপন্থী তৃণমূল কংগ্রেসেও গুঞ্জন শুরু হয়েছে। দলের অনেকেই মনে করছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘অন্ধ’ অনুগামী আশিসের মৃত্যুর পরে দলনেত্রীর পৌঁছনো প্রয়োজন ছিল। রাজ্য জুড়ে বিপর্যস্ত দলে তা ইতিবাচক বার্তা হয়ে উঠতে পারত। পক্ষান্তরে, আশিসের দেহ উদ্ধারের পরেই রবিবার রামপুরহাটে তাঁর বাড়ি ঘুরে এসে বিদ্রোহী তৃণমূলের নেতা তথা বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চেয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে চিঠি দিয়েছেন। তৃণমূল ছেড়ে এনসিপিআই-এ চলে গেলেও আশিসের মৃত্যুর খবরে তাঁর বাড়িতে গিয়েছিলেন বীরূম জেলার দুই লোকসভা সাংসদ শতাব্দী রায় ও অসিত মালও।
হাজার অভিযোগে বিধ্বস্ত দলে ব্যক্তিগত ভাবে পরিচ্ছন্ন হিসেবেই পরিচিত ছিলেন রামপুরহাটের প্রাক্তন বিধায়ক আশিস। পাঁচ বারের বিধায়ক গত নির্বাচনে হেরে গেলেও সরাসরি তাঁর বিরুদ্ধে কোনও দুর্নীতির অভিযোগ আনতে পারেনি বিজেপি। সেই নেতার আত্মহত্যার ঘটনায় কিছুটা থমকে গিয়েছে রাজনৈতিক শিবির। ভোটের ফল প্রকাশের পরে বিদ্রোহীদের শিবিরে যোগ দিলেও দলের বড় অংশই মনে করেন ‘আশিসদা’ তাঁর মমতাকে মন থেকে ছাড়তে পারেননি। তাই মৃত্যুর খবর পেয়ে মমতা না-যাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে কালীঘাটপন্থী অনেকের মনেই প্রশ্ন উঠেছে। দলের এক নেতার কথায়, ‘‘এই সময় মমতাদি গেলে অন্যত্রও নেতা-কর্মীরা মনে বল পেতেন।’’
দলগত ভাবে তৃণমূল অবশ্য এই মূল্যায়নে আমল দিচ্ছে না। তৃণমূলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক কুণাল ঘোষের বক্তব্য, ‘‘মমতাদি যাননি মানেই যাবেন না, তা তো নয়! পরিস্থিতি বুঝেই যাবেন। পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছেন।’’
প্রাক্তন মন্ত্রী, ডেপুটি স্পিকার তথা সজ্জন হিসেবে পরিচিত আশিসের অপমৃত্যুতে দলে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করেছে। খবর পাওয়ার পরেই শীর্ষ নেতৃত্বের পরামর্শে প্রয়াত নেতার বাড়িতে গিয়েছিলেন তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ সামিরুল ইসলাম। এই প্রসঙ্গে কুণাল বলেন, ‘‘কেন এই ঘটনা ঘটল, তার এই উপযুক্ত তদন্ত করতে হবে।’’ তদন্তের দাবি করে এ দিন মুখ্যমন্ত্রীকে দেওয়া চিঠিতে বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত লিখেছেন, ‘এই মৃত্যু অনেকগুলি অপ্রিয় প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে। ট্রাডা-র (তারাপীঠ-রামপুরহাট উন্নয়ন পর্ষদ) টেন্ডারকে কেন্দ্র করে ওঁকে (আশিস) কোনও হুমকির সম্মুখীন হতে হয়েছিল কিনা, তা তদন্ত করে দেখা হোক’। প্রসঙ্গত, আশিসের দেহের সঙ্গে যে ‘নোট’ পাওয়া গিয়েছে, তাতে ট্রাডা’র টেন্ডারের সঙ্গে নিজের যোগাযোগের কথা পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন প্রয়াত নেতা। সেই সঙ্গেই বিজেপির এক নেতার যে হুমকি-ভিডিয়ো সামনে এসেছে, তারও তদন্ত চেয়েছেন ঋতব্রতেরা। বিরোধী নেতার কথায়, ‘‘আমাদের মনে হয়েছে, এটা প্রাতিষ্ঠানিক হত্যা। আশিসদা’র ছেলেও তা-ই বলেছেন। সত্য উদঘাটনের জন্য যাদের প্রয়োজন, তাদের সকলকে তদন্তের আওতায় আনা হোক।’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘নানা জায়গার টেন্ডারই কলকাতা থেকে নিয়ন্ত্রিত হত বলে অভিযোগ আছে।’’
কালীঘাট তৃণমূল অবশ্য ঘুরিয়ে বিজেপি ও ঋতব্রত শিবিরের দিকেই আঙুল তুলেছে! কুণাল এ দিনও বলেন, ‘‘দল বেঁধে বাড়ি গেলেই কিছু প্রমাণ হয় না। বিজেপির কথাতেই এঁরা সাততাড়াতাড়ি ছুটেছেন, তা-ও হতে পারে! তাই এই তদন্ত যেন নিরপেক্ষ হয়। আশিসদা’র মতো মানুষকে ভয় দেখিয়ে শিবির বদল করানো হয়েছে কি না, সেটা জানা জরুরি। তাঁর অফিস-বাড়িতে মমতাদি’র ছবি তিনি সরাননি।’’ এরই মধ্যে আগামী ২৮ অগস্ট তৃণমূল ছাত্র পরিষদের ‘প্রতিষ্ঠা দিবসে’ মেয়ো রোডে সভা করতে চেয়ে পুলিশকে চিঠি দিয়েছে দলের দুই শিবিরই। কালীঘাট তৃণমূল আদালতেরও দ্বারস্থ হয়েছে।