বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের জাল নথি তৈরির জন্য কাজ করত আস্ত চক্র। সেই চক্রকে টাকা জোগাতে তৈরি করা হয়েছিল স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। সেখানে যে অনুদান জমা পড়ত, তা দিয়েও চলত কাজ। ‘জাল নথির হাব’-এর সূত্র সন্ধানে এ রাজ্য, হরিয়ানা, দিল্লি, উত্তরপ্রদেশের ১৬টি জায়গায় শুক্রবার হানা দিল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। বাজেয়াপ্ত করল বেআইনি নগদ ৪০ লক্ষ টাকা, ১৮ ভরি সোনা (যার মূল্য প্রায় ২৪ লক্ষ টাকা), ডিজিটাল এবং ব্যাঙ্কের নথি। মুর্শিদাবাদের ডোমকলে আটক করে জেরা করা হল আদিল উল রহমানকে, যিনি আদতে বাংলাদেশের বাসিন্দা।
আদিলকে ২০২৩ সালে উত্তরপ্রদেশের দেওবন্দ থেকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তাঁর সঙ্গেই গ্রেফতার হয়েছিলেন নাজিবুল শেখ, আবু হুরারা। ইডি সূত্রে খবর, এই আদিল ঢাকার বাসিন্দা। অভিযোগ, নাদিবুল এবং আবু— দু’জনের মাধ্যমে অনুপ্রবেশকারীদের জাল নথি তৈরি করাতেন তিনি। বাকি দু’জনও বাংলাদেশের বাসিন্দা। ওই তিন জনকে জেরা করেই সে সময় একটি চক্রের হদিস মিলেছিল। অভিযোগ, তাঁরা এক একটি ধর্মীয় স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা চালাতেন। ২০২৩ সালে উত্তরপ্রদেশ পুলিশ এনজিও-র অ্যাকাউন্টে বেআইনি ২০ কোটি টাকা হদিস পায়। তদন্তের সূত্রে জানা যায়, ‘জাল নথির হাব’-এর জন্য প্রয়োজনীয় টাকা অনুদানে আসত। পরে জামিনে ছাড়া পেয়ে গিয়েছিলেন আদিল। তদন্তকারীদের সন্দেহ, তার পরে আবার সেই চক্র চালু করেন তিনি।
সেই সূত্র ধরেই বৃহস্পতিবার সকালে মুর্শিদাবাদের রঘুনাথপুরের টুলটুলি পাড়ায় মীর রাকিব আলির বাড়িতে হানা দেয় ইডির একটি দল। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সূত্রে খবর, দীর্ঘ দিন ধরে একটি সুসংগঠিত চক্র ভারতের সীমান্ত পেরিয়ে আসা অনুপ্রবেশকারীদের ভুয়ো ভারতীয় পরিচয় পত্র তৈরি করে দিচ্ছিল। মোটা টাকার বিনিময়ে ভোটার পরিচয়পত্র, প্যান কার্ড, ই শ্রম কার্ড-সহ বিভিন্ন জাল সরকারি নথি জোগাড় করে দিত চক্রটি। আর সেই জাল নথির জোরেই দালালদের মাধ্যমে ভিন্দেশি নাগরিকদের ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে পাঠিয়ে দেওয়া হত।
মুর্শিদাবাদ পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, বছর চারেক আগে রঘুনাথপুরের বাসিন্দা মীর রাকিব আলির বাড়িতে গিয়েছিলেন আদিল। নিজেকে ‘অনাথ’ এবং ‘মাদ্রাসার ছাত্র’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে ওই পরিবারের সহানুভূতি ও বিশ্বাস অর্জন করেন তিনি। তিনি দাবি করেছিলেন, মাদ্রাসায় পড়তে পড়তে দিল্লিতে চলে যাওয়ায় তাঁর কোনও পরিচয়পত্র তৈরি করা সম্ভব হয়নি। রাকিবের মেয়েকে বিয়ে করেন আদিল।
বিয়ের পর তিনি উত্তরপ্রদেশে পাড়ি দিয়েছিলেন। সেখান থেকেই তাঁকে প্রথম বার গ্রেফতার করে উত্তরপ্রদেশ পুলিশ। তিন বছর পর জামিনে ছাড়া পেয়ে ফের মুর্শিদাবাদের শ্বশুরবাড়িতে ফিরে আসেন আদিল। পরিজনদের দাবি, কলকাতায় কাজ আছে বলে প্রায়ই যাতায়াত করতে তিনি। দিন পাঁচেক আগে হঠাৎই অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাঁকে ডোমকল মহকুমা সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। বৃহস্পতিবার সকালে হাসপাতাল থেকে তাঁকে সরাসরি নিজেদের হেফাজতে নেয় ইডি। তার পর টুলটুলিপাড়ায় শ্বশুরবাড়িতে এনে শুরু হয় ম্যারাথন জেরা।
সম্প্রতি উত্তরপ্রদেশ পুলিশের স্পেশ্যাল টাস্ক ফোর্স মানবপাচার নিয়ে তদন্ত শুরু করে। সেই তদন্তের সূত্র ধরেই খাস কলকাতায় চক্রের এক পান্ডার হদিস পায়। উত্তরপ্রদেশ পুলিশের তদন্তেই উঠে আসে, কলকাতা লাগোয়া উত্তর ২৪ পরগনা এবং মুর্শিদাবাদে অনুপ্রবেশকারীদের জাল নথি তৈরির বড় চক্র সক্রিয়।
পশ্চিমবঙ্গ থেকে শ্রমিক সরবরাহের আড়লে দালালেরা অনুপ্রবেশকারীদের জাল নথি দিয়ে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেয় বলে আদালতে জানিয়েছে উত্তরপ্রদেশ পুলিশ।
ইডির প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে রাজ্যের একাধিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার নাম। তদন্তকারীদের ইঙ্গিত, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার আড়ালে মানবপাচার চক্রের নথি তৈরি থেকে শুরু করে বিপুল টাকার আর্থিক লেনদেনের হদিস মিলেছে। অনেক ক্ষেত্রেই মূল চক্রকে আড়াল করতে ‘ভাড়ার অ্যাকাউন্ট’ ব্যবহার করা হয়েছে। ছোট ছোট অঙ্কের লেনদেন কিন্তু তা করা হয়েছে বহু অ্যাকাউন্ট থেকে।
ইডির দাবি, এই মানবপাচারকে ঘিরে বহু কোটি টাকার অবৈধ ব্যবসা চলছে যার শিকড় লুকিয়ে এই রাজ্যেই। তারই হদিস পেতে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ইডি তল্লাশি।
এর আগে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ) বাংলাদেশ থেকে মহিলা এবং নাবালিকা পাচারের একটি চক্রের সন্ধানে রাজ্যের সীমান্তবর্তী বনগাঁ এলাকায় তল্লাশি চালিয়েছিল। সেই সময়ও তদন্তে উঠে এসেছিল একটি সংগঠিত জাল নথি তৈরির চক্রের অস্তিত্ব, যারা আন্তর্জাতিক পাচারচক্রের সঙ্গে কাজ করে।