দক্ষিণ কলকাতার অপ্রশস্ত গলিতে আগাছা সাফ করছিলেন এক বৃদ্ধ। সঞ্জয় পূততুন্ডের বাড়ি জানতে চাওয়ায় বললেন যে, তিনিই স্বয়ং। অঞ্চলে আগাছা বাড়ছে, বলতে বলতে এগোলেন। সঞ্জয়বাবুরা যখন বরিশালের মূলাদী থেকে কলকাতায় আসেন, তখন আগাছা নয়, এ দিকটা ছিল জঙ্গল। সঞ্জয়বাবু তখন বছর চারেকের, সেটা ১৯৫০।
“স্কুলে পড়তে পড়তে কী ভাবে যে কমিউনিস্ট হয়ে গেলাম, বলা মুশকিল।” গড়িয়া থেকে কসবা পর্যন্ত যদি একটা আঁকাবাঁকা রেখা টানা যায়, তবে তার পূর্ব প্রান্তের জমির মালিকদের উচ্ছেদে বড় ভূমিকা ছিল সিপিএমের ‘হোলটাইমার’ সঞ্জয় পূততুন্ডের।
“অঞ্চলটা ছিল বড় ও ছোট জমিদারের দখলে। সাংগঠনিক কাজ করতে গেলেই পেটাত লেঠেল বাহিনী।” যুক্তফ্রন্ট সরকার ’৬৭ সালে ক্ষমতায় আসার আগে এবং পরে কৃষকদের মধ্যে থেকে জমি দখল কী ভাবে তাঁরা করতেন, তা নিয়ে উপন্যাস হয়ে যায়। সঞ্জয়বাবু লিখেওছেন একটি পুস্তিকা। লেখার গতি বেড়েছে সিপিএম একটু ঘুরে দাঁড়ানোয়।
“চোখে নয়, বুকের ভিতর থেকে দেখতে পাচ্ছি দল ফিরতে শুরু করেছে। তবে বিরোধী ‘স্পেস’টা ধরতে হবে আগে,” পরামর্শ সঞ্জয় পূততুন্ডের।
সাম্প্রতিক নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে বিজেপি, অপর দিকে খুলে গিয়েছে বিরোধী ‘স্পেস’। এই বিরোধী-বৃত্তেরই নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসের, কিন্তু তা তিন টুকরো হয়ে গিয়েছে। মমতাপন্থী ছাড়াও রয়েছেন ঋতব্রতপন্থীরা, রয়েছে অপরিচিত দল ন্যাশনালিস্ট সিটিজ়েনস পার্টি অফ ইন্ডিয়া, দিল্লিতে। পুরনো দুই দল সিপিএম এবং কংগ্রেসে আশার সঞ্চার হয়েছে।
কার ভাগ্যে ছিঁড়বে শিকে?
গত ২১ জুলাইয়ের শহিদ দিবস আর ২৪ তারিখের বাম-ছাত্র সমাবেশের পরে এক দিকে তৃণমূল কংগ্রেস (মমতা) আর অন্য দিকে সিপিএম-নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট বিরোধী-বৃত্ত দখলের লড়াইয়ে অন্যদের থেকে কিছুটা এগিয়ে রয়েছে বলে ’২৬-এর বর্ষায় মনে করা হচ্ছে।
এই দুই পক্ষের মধ্যে মমতাপন্থীরা শহিদ দিবসের আগে সাংঘাতিক চাপে ছিলেন। নানান প্রতিকূলতার মধ্যে সভা করতে পারবেন কি না, পারলে আদৌ সমর্থকেরা আসবেন কি না— সব নিয়েই সন্দেহ ছিল। যে কারণে ২০ জুলাই সভাস্থলে রাত কাটিয়েছেন মমতা-সহ অবশিষ্ট নেতানেত্রী। সাংসদ দোলা সেনের কথায় “একটা মর মর অগ্নিপরীক্ষা চলছিল।”
আরও পড়ুন:
পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন তাঁরা, বলছে দলীয় সমীক্ষা থেকে প্রচারমাধ্যম। এটা কী ভাবে হল, বিশেষত শোচনীয় পরাজয়ের আড়াই মাস পরে? এর কারণ— আবারও— মমতা, মত দোলার।
“বাম বা ডানপন্থার বাইরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের যে নিজস্ব রাজনীতি, মানুষের সঙ্গে ‘কানেক্ট’ করার যে ক্ষমতা— তাতে এখনও বিশ্বাস অপরিসীম, সেটাই দেখাল একুশে’র ভিড়।” এর ফলে দলের দ্রুত উত্থান হবে এমন আশা অবশ্য কেউই করছেন না। এমনকি টাকাপয়সা, প্রতীক বা দলের নামও ধরে রাখতে পারবেন কি না তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। এই মুহূর্তে তাঁদের ভরসার জায়গাটা অবশ্য ভবিষ্যৎ নয়, অতীত; নিজেদের নয়, কংগ্রেসের। কংগ্রেস তাদের গোড়ার প্রতীক ‘জোড়া বলদ’ খুইয়ে ‘গাই বাছুর’ হয়ে ধরেছিল ‘হাত’, হাত রয়ে গিয়েছে। প্রতীকের সঙ্গে পাল্টেছে নামও।
“তাতে কি কংগ্রেস ও ইন্দিরা গান্ধীকে আটকানো গিয়েছিল?” প্রশ্ন দোলার, উত্তরও তাঁরই। “কেউ যদি একবার লিডার হিসেবে গৃহীত হন, তবে তিনি যে নাম বা প্রতীকই দিন না কেন, মানুষ তা গ্রহণ করে।” গোটা বিশ্বে ক্ষমতায় থাকা সব দলেরই একটা সময় মাথাভারী হয়ে যায়, তখন সিনিয়রদের ‘মার্গদর্শক মণ্ডলী’তে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কংগ্রেসে হয়েছে, বিজেপিতেও। চিনা কমিউনিস্ট পার্টির প্রেক্ষিতে সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, ‘পার্জিং’— শুদ্ধিকরণ। পার্টির মেদ ঝরে, গতি বাড়ে। তৃণমূলে অনিচ্ছাকৃত ‘পার্জিং’ চলছে, গতি বাড়ে কি না, সেটাই দেখার।
গতি বাড়ানোর ক্ষেত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বয়স একটা প্রতিবন্ধক বলে অবশ্য মনে করছেন না তাঁর ঘনিষ্ঠেরা। তাঁদের বক্তব্য, হার-জনিত হতাশা দ্রুত কাটিয়ে উঠেছেন নেত্রী, শারীরিক ভাবে সুস্থ, চেষ্টা করছেন কংগ্রেস-নেতৃত্বাধীন জাতীয় জোটের সঙ্গে ছন্দ মেলাতে। বস্তুত, কংগ্রেসের সঙ্গে আম আদমি পার্টি এবং ডিএমকে’র সম্পর্ক সূক্ষ্ম সুতোয় এখনও যে টিকে রয়েছে, তার কারণ মমতা, দাবি নেতৃত্বের। এর পরে, নেত্রীর জেলা সফর শুরু হলে ‘খেলা ঘুরবে’।
“তাঁকে আটকানোর চেষ্টা হবে, কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আটকানো সম্ভব?” মন্তব্য দোলা সেনের। খেলা ঘুরবে কি না এখনই বলা যাচ্ছে না, যেটা বলা যাচ্ছে সেটা হল, যাঁরা ভেবেছিলেন তৃণমূল কংগ্রেস বিদায়ের পরে শান্তি ফিরবে, তাঁদের আশা আপাতত পূর্ণ হচ্ছে না।
১৯৫২ সালে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম বিধানসভা নির্বাচনে ২৩৮টি আসনের মধ্যে কংগ্রেস পেয়েছিল ১৫০। আজকের মতোই নানান ভাগে বিভক্ত ছিল বিরোধীরা, এক দিকে ছিল বামজোট, অন্য দিকে দক্ষিণপন্থীরা। বস্তুত, হিন্দু মহাসভা এবং জনসঙ্ঘ সে বারে ভালই আসন পেয়েছিল— মোট তেরোটি। সব রঙের বিরোধীদের আসন ছিল কংগ্রেসের অর্ধেক, কিন্তু ভোট ছিল অনেকটাই বেশি। এটাই পশ্চিমবঙ্গে বিরোধী রাজনীতির ট্রেন্ড। বিরোধীদের ভোট অনেক সময়ই ক্ষমতাসীন দলের থেকে বেশি থাকে বা হয়তো সামান্য কম। ফলে বাংলায় ক্ষমতাসীন দলের স্বস্তিতে থাকা মুশকিল— যদি না বিপদ বাড়ার আগে তারা প্রধান বিরোধীকে জ্যোতি বসুর ‘ফর্মুলায়’ ভাঙতে পারে।
জ্যোতিবাবুর এই গল্প তিন দশক আগে আনন্দবাজার পত্রিকার প্রবীণ চিফ রিপোর্টারেরা বলতেন। কংগ্রেস ১৯৯৬-এর নির্বাচনে সিপিএমের থেকে দেড় শতাংশ বেশি ভোট পেয়ে বসল। জ্যোতিবাবু বুঝলেন, পরের নির্বাচনে কংগ্রেস আরও বাড়লে শরিকদের নিয়ে সরকার চালানো মুশকিল হবে। কিন্তু কাজটা সরল হয় যদি কংগ্রেসের ভোট ভাঙা যায়, সেটা করতে কংগ্রেস ঘরানার নতুন দল দরকার। ইতিমধ্যে কংগ্রেস মমতাকে বাদ দিয়ে মিছিল-সম্মেলন করতে শুরু করেছে, যাকে বলা হচ্ছে ‘ইনডোর-আউটডোর’, অর্থাৎ মমতাকে বাদ দিয়ে প্রেক্ষাগৃহে সভা করছে কংগ্রেস আর ‘আউটডোরে’ পৃথক সভা করছেন মমতা। রাগে ফুঁসছেন, চেষ্টা করছেন নতুন দল করার, অর্থ অকুলান। “ফোন লাগালেন জ্যোতিবাবু”, বলেছিলেন এক চিফ রিপোর্টার, “এক প্রবীণ শিল্পপতিকে বললেন, মেয়েটিকে একটু দেখুন।”
তিনি দেখলেন, তৃণমূল কংগ্রেস তৈরি হল, ২০০১-এ কংগ্রেসের ভোট নেমে গেল আট শতাংশে, ৩১ শতাংশ ভোট পেয়ে নতুন দল হয়ে গেল প্রধান বিরোধী। বামফ্রন্ট টিকল আরও ১০ বছর। অর্থাৎ, নিজের ভোট কমলেও বিরোধী ভোট ভেঙে ক্ষমতায় থাকা যায়, ভারতে এটাই ‘থাম্ব রুল’, শাসনের অঘোষিত আইন।
“সেই ‘থাম্ব রুল’ই তো ভাঙলেন মমতা,” একটু যেন আক্ষেপই করলেন সুখেন্দুশেখর রায়, যাঁর রাজনৈতিক জীবন ৫৯ বছরে পূর্ণ করল সম্প্রতি। সুখেন্দুশেখর বলছিলেন, বিধানসভা বিরোধীশূন্য করতে মমতা বামেদের আক্রমণ করলেন। “জায়গাটা নিল বিজেপি। রাজনৈতিক হঠকারিতার মূল্য দিচ্ছেন তৃণমূল নেত্রী,” মন্তব্য প্রাক্তন তৃণমূল সাংসদের। তবে, তাঁর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সুখেন্দুশেখর বলতে চাইলেন না, বিরোধী-বৃত্ত কারা অধিকার করবেন। বললেন, তিনি ভবিষ্যদ্দ্রষ্টা নন।
সিপিএমের সম্ভাবনা কতটা?
প্রবীণ সিপিএম নেতা সঞ্জয় পূততুন্ড বলেছিলেন, দরজাটা সামান্য খুলেছে, সামান্য আলো দেখতে পাচ্ছেন। এর প্রধান কারণ, তৃণমূল কংগ্রেসের আমলে যে ‘বাইনারি’ ছিল সেটা ভাঙা গিয়েছে বলে মনে করেন রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম।
“একটা বাইনারি ছিল— হয় তুমি তৃণমূল, না হলে বিজেপি— এটা ভেঙেছে,” তবে সেলিম সতর্ক, “তার মানে এই নয় যে, বিরোধী জায়গা দখলের কাজ সহজ হবে, আক্রমণ শুরু হয়েছে। দক্ষিণপন্থী পত্রপত্রিকাতে নিয়মিত বলা হচ্ছে, বামেরা বেশি বিপজ্জনক। এটা মাথায় রেখেই এগোতে হবে যে, আক্রমণ হবে, তবে লড়াইটা শুরু হয়েছে।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্কসবাদী তাত্ত্বিক বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল দেখতে দেখতে বললেন, “রাজনীতি ফুটবলের মতো, সারাক্ষণ অপর পক্ষের পেনাল্টি বক্সে পৌঁছে গোলের মুখ খোলার চেষ্টা করতে হয়। প্রতিবারই গোল হবে না, কিন্তু চেষ্টা না-করলে কোনও দিনই হবে না।”
ফুটবলের মতোই বল নিয়ে ওঠার কায়দা একেক দলের একেক রকম। বামফ্রন্টের ক্ষেত্রে যে চেষ্টা করা হয়েছে এবং হচ্ছে সেটা হল, সব ধারার সংসদীয় বাম সংগঠনকে নিয়ে এগোনো— সেলিমের কথায় ‘লেফট অল্টারনেটিভ’ তৈরি করা। অতীতে নানান বৃত্তে বামপন্থীদের বড় প্রভাব ছিল, সেই আবহ তৈরির চেষ্টা হচ্ছে।
“এই ‘লেফট অল্টারনেটিভ’ একটা বাম ‘ইকো সিস্টেম’ তৈরির চেষ্টাও বটে। রাজনৈতিক লেফটের বাইরে সামাজিক, সাংস্কৃতিক যে বাম, সেটাকে ধরার লক্ষ্যে আমরা একাধিক প্রোগ্রাম করছি,” মন্তব্য সেলিমের।
একই সঙ্গে, সংগঠনের ‘লাস্ট মাইলে’— সদস্য-সমর্থকদের বাড়ি পৌঁছোনো ও সক্রিয় করার কাজ শুরু হয়েছে। “এই ‘লাস্ট মাইলে’ সংগঠন ধ্বংস করার চেষ্টা হয়েছিল, বলা হয়েছিল বামেদের সংগঠন নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। সেটা হয়নি।” নির্বাচনের পরে যখন বর্তমানে “তৃণমূল কংগ্রেস মাঠ-পর্যায়ে নেই, বিজেপির সংগঠন তৈরি হয়নি। আমাদের যে সংগঠন এখনও রয়েছে, তাকে সক্রিয় করার এটাই সময়, প্রধান কাজও,” বললেন সেলিম।
তবে কিছুটা বাম-ঘেঁষা ‘একটি গোষ্ঠীকে’ ধারেকাছে আসতে দেবে না সিপিএম। কয়েক জনের নাম করেই সেলিম বললেন, ‘আরবান সিভিল সোসাইটি’ থেকে দূরে থাকতে হবে। “এঁরা তৃণমূলে থেকে বামেদের ধ্বংসের চেষ্টা করেছেন, এ বারে বিজেপিতে যাবেন। এঁদের মধ্যে দু’-এক জন ছাড়া বাকিদের বর্জন করতে হবে,” হেসেই বললেন সেলিম।
তৃতীয় শক্তি তৃণমূল কংগ্রেস (ঋ) কোথায় দাঁড়িয়ে?
বিরোধী-বৃত্ত দখলের চেষ্টায় ‘কালো ঘোড়া’ বলে যাঁরা বিবেচনায় রয়েছেন তাঁরা হলেন, ঋতব্রতপন্থী তৃণমূল কংগ্রেস। অনেকে ইংরেজিতে লিখছেন, তৃণমূল কংগ্রেস ‘আর’ বা ‘ঋ’। এই তৃণমূল (ঋ) যেন এক শতক আগে সোভিয়েত ইউনিয়নের স্ট্যালিন-বিরোধী লিয়ঁ ট্রটস্কির ‘অপজিশন ব্লক’— ডান, মধ্য, বাম, সব ধরনের ছোট-বড়-মাঝারি নেতারা সেখানে ভিড় করেছিলেন— যেমন করেছেন ঋ-তে। বছর কয়েকের বেশি ট্রটস্কির ব্লক টিকতে পারেনি; তৃণমূল (ঋ) বলছেন তাঁরা টিকবেন, কারণ তাঁরাই ‘আসল’।
ঋতব্রতপন্থী তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান মুখপাত্র এবং মালদহ জেলা সভাপতি প্রসূন বন্দোপাধ্যায় অনেকটা সময় নিয়ে বোঝালেন যে, নির্বাচন কমিশন ও আদালতে পেশ করা তাঁদের কাগজপত্র নিখুঁত, আইন মেনে যে কর্মসমিতি গঠন করা হয়েছে তা-ও নিখুঁত (আদি অবশ্য অবশ্য এটা মানে না), বাকিরা ‘দূরদৃষ্টিহীন, শক্তিহীন’।
“ফলে বিধানসভার ভিতরে বিরোধী ‘স্পেস’ পুরোপুরি আমাদের ‘মনোপলি’,” মন্তব্য প্রসূনের। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভার ভিতরের থেকে বাইরের লড়াই বরাবরই প্রখর। বাইরের লড়াইয়েও তাঁরাই এগিয়ে, বললেন প্রসূনবাবু।
“মানুষ আর বিধানসভা ভাঙচুর, ‘ওয়েলে’ নেমে কাগজ ছোড়ার মতো বিরোধী রাজনীতি বা কেন্দ্রের সঙ্গে নিয়মিত ঝগড়া চায় না। এই নেতিবাচক বিরোধী রাজনীতির দিন শেষ হয়ে গিয়েছে,” বললেন প্রসূনবাবু। সে ক্ষেত্রে, কি তৃণমূল কংগ্রেস (ঋ) হিংসাভিত্তিক বিরোধী রাজনীতি— যার দীর্ঘ ইতিহাস পশ্চিমবঙ্গে রয়েছে— তা অবসানের চেষ্টা করছে?
“বলতে পারেন। এই হিংসার রাজনীতি আমরা ভাঙতে চাইছি, গঠনমূলক সমালোচনা করতে চাইছি। সরকারের নীতির বিরুদ্ধে বলব না, তা নয়। কিন্তু সেটা হবে হিংসা এড়িয়ে, উন্নয়নের প্রশ্ন, নিরাপত্তার প্রশ্ন মাথায় রেখে,” বললেন প্রসূন। এই পথেই সাফল্য আসবে, বিশ্বাস প্রসূনবাবুর। তেমন হলে হয়তো তাঁরাই এক দিন আসবেন ক্ষমতায়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও তো এ ভাবেই এসেছিলেন।
মুসলমান ভোট: এই ‘স্পেস’ কার?
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষমতায় আসার একটা ফ্যাক্টর ছিল মুসলমান ভোট। “সেটা ভাঙতে শুরু করেছে,” কড়া চিনি দেওয়া চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন নওশাদ আলম। খিদিরপুরের ফ্যান্সি মার্কেটের পাশের ঘিঞ্জি গলিতে জাহাজের ‘কন্টেনার’ মেরামতির ব্যবসা নওশাদের। এক সময় করতেন ফরওয়ার্ড ব্লক, এখন কংগ্রেস। বললেন, মুসলমান সমাজে বিরোধী রাজনীতির চরিত্র পাল্টাচ্ছে।
“মুসলমানেরা আর স্থানীয় দল তৃণমূল কংগ্রেস বা সিপিএমের উপরে ভরসা রাখতে পারছেন না। তাঁদের হয়তো এখন মনে হচ্ছে বিজেপি-বিরোধী কোনও জাতীয় দলের পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন।”
সম্প্রতি দক্ষিণ কলকাতার বিজয়গড়ে ছোট এক প্রেক্ষাগৃহে সম্মেলন করেছে কংগ্রেস। সেখানে ‘উপচে পড়া ভিড়ে’ যেমন হিন্দুরা ছিলেন, তেমনই ছিলেন মুসলমানেরাও। এই ভোট আগামী দিনে অনেকটাই কংগ্রেসে আসবে, মনে করছেন নওশাদ। অন্য দিকে, তৃণমূল কংগ্রেস বা সিপিএমের নেতারা মুসলমান ভোটের প্রতি বাড়তি উৎসাহ এখনই দেখাচ্ছেন না— হয়তো এই আশঙ্কায় যে, হিন্দু ভোট আরও সরে যাবে। কারণ, মুসলমান ভোট ‘অপ্রয়োজনীয়’ করে দিতে পেরেছে বিজেপি।
বিজেপি রাজ্যে এই প্রথম কোনও মুসলমানকে মনোনয়ন দেয়নি। মুসলমান ভোট ছাড়াও যে নির্বাচন জেতা যায় সেটা স্বাধীনোত্তর বাংলায় প্রথম প্রমাণ করেছে বিজেপি। কিন্তু মুসলমান ভোট— যা কিনা মোট ভোটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ— তা উবে যাচ্ছে না।
সেটা কোন দিকে যাবে?
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আব্দুল মতিন গবেষণা করেছেন রাজেন্দ্র সাচার কমিটি গঠনের পরবর্তী পর্যায়ে পশ্চিমবঙ্গে মুসলমান রাজনীতির গতিপ্রকৃতি নিয়ে। মুসলমান ভোটের ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে তরুণ অধ্যাপক বললেন, পরিস্থিতি ঘেঁটে রয়েছে।
“কমবেশি সবারই একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তৃণমুল কংগ্রেসের উপরে মুসলমান সমাজের বিশ্বাস কমেছে, কিন্তু একেবারে সরে যায়নি।” মতিনের মতে, তৃণমূল কংগ্রেস (মমতা) ইস্যু ধরে রাস্তায় নামলে, সংখ্যালঘু ভোট তাদের হেফাজতে থাকারই সম্ভাবনা। তবে আবার বামফ্রন্টেরও একটা জায়গা তৈরি হচ্ছে।
“সম্ভবত, বামেদের সমর্থনও একটু বাড়বে, কিন্তু আবার এতটাও নয় যে, সেটা একটা ফ্যাক্টর হবে,” বক্তব্য অধ্যাপক মতিনের।
দু’টি মুসলিম প্রধান দলের একটি হুমায়ুন কবীরের আমজনতা উন্নয়ন পার্টির ভবিষ্যৎ খুব একটা উজ্জ্বল না-হলেও নওশাদ সিদ্দিকীর অল ইন্ডিয়া সেকুলার ফ্রন্টের (আইএসএফ) একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, মনে করেন মতিন।
“সংগঠনকে তৃণমূল পর্যায়ে শক্তিশালী করে বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আন্দোলনে যেতে হবে। সাধারণ মুসলমানের যা চাহিদা— ব্যবসার সুরক্ষা, চাকরি বা উচ্ছেদ— সে সব নিয়ে পথে নামা প্রয়োজন।” এটা বলা যতটা সহজ, কাজে অবশ্যই নয়। “আইএসএফের মাঠ পর্যায়ের সংগঠন এখনও অত্যন্ত দুর্বল,” পর্যবেক্ষণ মতিনের।
তবে, সংগঠন ছাড়াই আইএসএফের ভোট সামান্য বেড়ে ১.৫০ শতাংশ হয়েছে। নিঃসন্দেহে এই হার খুবই সামান্য। কিন্তু যেখানে সিপিএমের ভোট পাঁচ শতাংশের কম এবং কংগ্রেসের দুই শতাংশের কিছু বেশি, সেখানে এটা আবার খুব কম ভোটও নয়; বিশেষ করে যখন একক ভাবে মাত্র ২৯টি আসনে লড়েছিল আইএসএফ। এর মধ্যে ১৫টি আসনে আইএসএফের ভোট মার্জিনের থেকে বেশি। পাঁচ বছর পরে ২৯৪ আসনে আইএসএফ প্রার্থী দিয়ে দিলে, বিজেপি বিরোধীরা বড় বিপদে পড়বেন— যেমন সিপিএম ত্রিপুরায় পড়েছে সংখ্যালঘু উপজাতি সমাজের দল টিপ্রা মোথা অধিকাংশ আসনে প্রার্থী দিয়ে দেওয়ায়, বা এত দিন কংগ্রেস পড়েছে অসমে বদরুদ্দিন আজমলের ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট বাঙালি মুসলমানের ভোট টানার কারণে। এটা বিজেপির জন্য আদর্শ— বাংলায় জ্যোতিবাবুর ফর্মুলা।
তবে, আইএসএফ ব্যর্থ হলে সিপিএম বা কংগ্রেস বা দু’জনেরই মুসলমান ভোট বাড়ার সম্ভাবনা। “সে ক্ষেত্রে, ভাল রকম রাজনৈতিক সংঘর্ষের আশঙ্কাও রয়েছে, বিশেষ করে আইএসএফের সঙ্গে সিপিএমের। কারণ, তারা দু’জনেই জোরদার ঝাঁপাবে ওই মুসলমান ‘স্পেসে’র জন্য”, পর্যবেক্ষণ অধ্যাপক আব্দুল মতিনের।
বুলফাইটের গোলাকার রিং ‘রুয়েদো’, সেখানে দাঁড়িয়ে মাতাদোর চোখের কোণ দিয়ে ষাঁড়কে মাপেন, ষাঁড়ও মাপে। এই মাপামাপি চলছে বাংলায়। আজ না-হয় কাল সরকার ও বিরোধীরা ধেয়ে যাবেন পরস্পরের দিকে। আর লড়াই শুরু হওয়ার সামান্য সময়ের মধ্যে বুলফাইটের মতোই পরিষ্কার হয়ে যাবে প্রধান বিরোধী কারা, বাংলার ‘রুয়েদো’য়।