E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাই ধর্ম, ভাসান পথে মায়ের সঙ্গী আব্দুলরা

আব্দুল বলছিলেন, ‘‘ঠাকুর তো মুটিয়ারাই ভাসানের গাড়িতে তোলেন। কিন্তু আমাদের তো পুজোর পণ্ডিত ছাড়া প্রায় সকলেই মুসলমান। যে যা পারি, নিয়ম মেনে চলি।’’

ঋজু বসু

শেষ আপডেট: ২৩ অক্টোবর ২০২৬ ০৭:১৩

—প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।

বিজয়া দশমীর সন্ধ্যায় বাজে কদমতলা ঘাটে ভাসান দিতে এসে তাজ্জব দক্ষিণ কলকাতার প্রবীণ পুজোকর্তা। ক্রেনে করে বিসর্জনের রীতি বদলে মুটিয়াদের কাঁধে ঠাকুরের জলস্পর্শের মুহূর্তে মনে পড়ছিল মুখ্যমন্ত্রীর নিদান। এত মানুষের ভিড়ে কে সনাতনী, কে নয়, তা কারা খোঁজ রাখে কে জানে!

ঠিক তখনই উত্তর কলকাতার বেলগাছিয়া মেট্রো স্টেশনের পাশের কেন্দ্রীয় সর্বজনীন দুর্গোৎসবের পুজোকর্তারা স্থানীয় আমন কমিটির মঞ্চে ওয়াসিম ভাই, মাস্টারজি শওকত সাহেব, আনোয়ার সাহেবদের কাছে মিষ্টির বাক্স নিয়ে হাজির! এটা বচ্ছরকার রীতি! পুজো সভাপতি, স্থানীয় ডাক্তারবাবু প্রসূন ঘোষ অতীতে তৃণমূল করতেন। এখন বিজেপি-শিবিরভুক্ত। তিনি বলছেন, ‘‘আমন কমিটিকে বলে এসেছি, শুক্রবার আমাদের ভাসানের দিন, ওঁদের ক্যাম্প কিন্তু থাকা চাই! তা না হলে রাস্তার ভিড়, জানজট সামলে বাগবাজার ঘাট পর্যন্ত ঠাকুর নিয়ে যেতে নাভিশ্বাস উঠবে।’’ পুজোর সেক্রেটারি অজয় মণ্ডলেরও এক কথা। ‘‘আমন কমিটির স্বেচ্ছাসেবীদের সঙ্গে আমাদের পুজোর সম্পর্ক গত ৪০ বছরের। পুজোর সন্ধ্যায় বেলগাছিয়া, টালাপার্কের এ তল্লাটে বড় পুজোর ভিড় সামলানো থেকে বিসর্জনের শোভাযাত্রার পাশে থাকা— কিছুই আমন কমিটি ছাড়া চলবে না!’’

ওয়াটগঞ্জের মুন্সিগঞ্জের ফাইভ স্টার ক্লাবের পুজোতেও ক্যাশিয়ার আব্দুল হুসেন, প্রেসিডেন্ট মির্জা সরফুদ্দিন বেগ বা সেক্রেটারি মহম্মদ নিজ়ামদের ছাড়া দইঘাটে ভাসান হবে কী ভাবে! আব্দুল বলছিলেন, ‘‘ঠাকুর তো মুটিয়ারাই ভাসানের গাড়িতে তোলেন। কিন্তু আমাদের তো পুজোর পণ্ডিত ছাড়া প্রায় সকলেই মুসলমান। যে যা পারি, নিয়ম মেনে চলি।’’ একদা এ পাড়ার শেখ জাহাঙ্গির পুরোহিতের সঙ্গে পুজোয় বসতেন। পুজোর নিয়ম বলতে পেশায় গাড়ি চালক আব্দুল বোঝেন, ৭-৮ দিন ‘মাছ-মাংস খানা বন্ধ’! মাত্র দু’লক্ষ টাকার নিম্নবিত্ত পুজো। কিন্তু বিজয়া দশমীতে ১০০০-১২০০ লোককে খিচুড়ি, তরকারি, পায়েস খাইয়েছে। ২০ কিলো চাল, ৫০-৬০ কিলো আনাজের খরচে কিপটেমি নেই।

পালাবদলের বছরে রাজ্যের নানা পুজোয় বদলটা চোখে লাগছে। আগের বছরের রীতি পাল্টে বেশির ভাগ পুজো কমিটিতেই মুসলিমেরা নেই। মুসলিমদের দোকানে কেনাকাটা ইত্যাদি নিয়ে উটকো অভিযোগ ভাসছে, হুমকি-ভিডিয়ো ঘুরপাক খেয়েছে। সাম্প্রতিক, দশমীর সকালে ভাসানের নিরাপত্তা-বিধি নিয়ে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর পর্যন্ত নির্দেশ, যাঁরা সনাতন ধর্ম মানেন, তাঁরাই মাকে হাত দেবেন! তিনি ব্যাখ্যাও দিয়েছেন, এ না কি চোরবাগান-কাণ্ডের থেকে শিক্ষা নিয়ে সতর্কতা। চোরবাগানে বৃষ্টির মধ্যে ভিড়ের মাঝে কারা দড়ি ছেড়ে দিয়েছিল বলে আঙুল তুলে শুভেন্দুর আক্ষেপ, দু’মিনিটের ভুলে এত বড় বিপর্যয়! এবং কলকাতা পুলিশে নিয়োগ হয় না, সবই অস্থায়ী হোমগার্ড আর সিভিক পুলিশ দিয়ে চলছে বলে জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী খোঁচাও দেন, ‘‘নামের তালিকা দেখলেই বুঝবেন, তাঁরা কারা!’’ নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক রাজ্য ও কলকাতা পুলিশের এক অবসরপ্রাপ্ত পুলিশকর্তার প্রশ্ন, ‘‘পুলিশে নিয়োগ না হওয়া গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। কিন্তু কাজের দক্ষতা বা অদক্ষতার সঙ্গে ব্যক্তির ধর্ম-পরিচয়ের কী সম্পর্ক! গরিব নিম্নবিত্তরাই সাধারণত সিভিক পুলিশে ঢোকেন। তাঁদের ধর্ম-পরিচয় কিসে গুরুত্বপূর্ণ।’’ ভাসান নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর সনাতনী মন্তব্য বিভাজনধর্মী, সংবিধান-বিরোধী এবং অস্পৃশ্যতায় ইন্ধন জোগায় বলে সরব হয়েছে রাজ্যের বিভিন্ন বিভিন্ন বিরোধী দলের নেতারাও। প্রশ্ন উঠেছে, পুজোর সর্বজনীন মর্যাদা নিয়েও।

শাসক-শিবিরের একাংশে এই ধরনের প্ররোচনার উল্টো পিঠে নিজের প্রত্যয়ে স্থির ওয়াটগঞ্জের আব্দুল বা বেলগাছিয়ার ওয়াসিম খান, শওকত আলিরা। বেলগাছিয়া, টালাপার্কে বেলগাছিয়া মহল্লার দু’-তিন হাজার তরুণ নিয়ম করে পুজোর সন্ধ্যায় বা বিসর্জনে নিয়ম করে ভিড় সামলান। হিন্দু, মুসলিম ভেদ নয়, মানুষের আচার, অনুষ্ঠানে মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাই যে তাঁদের ধর্ম।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Durga Puja Communal harmony

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy