শরতের কাশফুল, ঢাকের বাদ্যি আর চার দিনের উৎসব—দুর্গাপুজোর সঙ্গে বাঙালির এই ছবিই চেনা। কিন্তু সুখড়িয়ার বিশ্বাস বাড়িতে দুর্গার আরাধনার গল্পটা একটু অন্য রকম। এখানে শরতের পাঁচ দিনের মৃন্ময়ী দুর্গার পাশাপাশি সারা বছর পুজো পান পিতলের দেবী শিবমোহিনী। সকাল-সন্ধ্যায় ধূপের গন্ধ, মন্ত্রোচ্চারণ আর সন্ধ্যারতির আলোয় আজও জেগে রয়েছে কয়েক শতকের পারিবারিক পরম্পরা।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, আনুমানিক তিনশো বছরেরও বেশি আগে বীরেশ্বর মিত্র মুস্তাফির হাত ধরে শিবমোহিনীর আরাধনার সূচনা। অবিবাহিত ছিলেন বীরেশ্বর। তাই ভাইপো রাধাজীবন মুস্তাফির তিন মেয়ে—প্রভাবতী, যোগমায়া ও নিস্তারিণী। আর ছেলে ক্ষেত্রনাথ। অসুস্থতায় সন্তানহীন অবস্থায় ক্ষেত্রনাথের মৃত্যু হলে পরিবারের বিশাল সম্পত্তির দেখভালের ভার এসে পড়ে বড় জামাই বিনোদবিহারী বিশ্বাসের উপর। সেই সময় থেকেই শিবমোহিনীর পুজোর দায়িত্ব নেয় বিশ্বাস পরিবার। পরবর্তী প্রজন্মেও সেই রীতির ব্যতিক্রম হয়নি।
প্রায় পাঁচ ফুট উচ্চতার দশভুজা দেবী সিংহবাহনা। হাতে অস্ত্র, সামনে মহিষাসুর—যুদ্ধের মুহূর্তে দাঁড়িয়েও দেবীর মুখে প্রশান্তির হাসি। প্রচলিত দুর্গাপ্রতিমার মতো পাশে নেই লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক বা গণেশ। একক দেবীরূপেই তাঁর আরাধনা।দেবীর পাশাপাশি সিংহ ও মহিষাসুরের মূর্তিও পিতলের। সিংহাসনেঅধিষ্ঠিত এই দেবীই পরিবারেরনিত্য আরাধ্যা।
প্রতিদিন দু’বেলা পুজোর সঙ্গে সন্ধ্যায় হয় আরতি। আতপ চাল, ফল, মিষ্টি, খই ও বাতাসায় সাজে ভোগের থালা। বিশেষ দিনে তার সঙ্গে থাকে সুজি ও লুচিও। এক সময়ে এই পুজোকে ঘিরে ছিল আরও নানা আচার। পরিবার সূত্রে জানা যায়, সপ্তমী ও অষ্টমীতে ছাগবলি এবং নবমীতে মোষ, ভেড়া ও ছাগবলির রীতি ছিল। তিন দিন ধরে ব্রাহ্মণ, আত্মীয়-স্বজন ও গ্রামবাসীদের জন্য বসত ভোজের আসর। বিজয়া দশমীতে দরিদ্র সধবাদের দেওয়া হত শাড়ি, তেল, হলুদ ও সিঁদুর।
সময়ের স্রোতে বদলেছে বাড়ি। হারিয়েছে পুরনো দালানের অনেকটা। ছাঁট পড়েছে বহু আচারেও। কিন্তু বদলায়নি শিবমোহিনীর নিত্যপুজো। বিশ্বাস পরিবারের বংশধর ভাস্কর বিশ্বাস বলেন, ‘‘দেবীর পাশে পিতলের শ্যামরাইয়েরও নিত্যপুজো হয়। পাশাপাশি দালানে পাঁচ দিন ধরে মৃৎশিল্পীর তৈরি দুর্গাপ্রতিমার পুজো চলে। কালী, জগদ্ধাত্রী ও সরস্বতীর পুজোর আয়োজনও রয়েছে।”
সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীতে চালকুমড়ো ও আখ বলি, দশমীতে বাড়ির অন্দরেই সিঁদুর খেলা—সব মিলিয়ে আজও পুরনো রীতির সঙ্গে নতুন সময়ের মেলবন্ধন। পরিবারের সদস্যেরা যে যেখানেই থাকুন, পুজোর টানে ফিরে আসেন নিজেদের শিকড়ে। তাই বিশ্বাস বাড়ির দুর্গোৎসব শুধু দেবীর আরাধনা নয়, হারিয়ে যাওয়া আপনজনকে ফের কাছে পাওয়ারও এক বার্ষিক উৎসব।
আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক তথা কলেজ শিক্ষক পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেন, “বলাগড়ের এই মূর্তিটি সার্বিক বাংলার দুর্গা কেন্দ্রিক ভাস্কর্য ক্ষেত্রে কেবল উল্লেকযোগ্যইনয়, অসাধারণ।”