চিকিৎসক সংগঠনের ভোটে দুই শিবিরের ‘আকচা-আকচি’ গড়াল থানা পর্যন্ত! রাজ্য আইএমএ-র নির্বাচন ঘিরে তুঙ্গে চাপানউতোর। শান্তনু সেনের শিবিরের বিরুদ্ধে ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (আইএমএ)-এর ‘সংবিধান চুরি’র অভিযোগে বীরভূমের সিউড়ি থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করলেন সিউড়ি শাখার সম্পাদক দেবাশিস দেবাংশী।
প্রতি দু’বছর অন্তর আইএমএ-র রাজ্য শাখার নির্বাচন হয়। ২০২৪ সালের ভোটে জয়যুক্ত প্রতিনিধিদের মেয়াদ শেষ হওয়ায় সম্প্রতি এ রাজ্যে ওই সর্বভারতীয় চিকিৎসক সংগঠনের ভোটপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ বারের ভোটে সম্পাদক পদে শান্তনু-‘ঘনিষ্ঠ’ চিকিৎসক অশোক নন্দীকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দেবাশিস। ভোটের দিন যত এগিয়ে আসছে, প্রচারের উত্তাপ ততই বাড়ছে। আইএমএ সূত্রের খবর, নির্বাচনী প্রচারে নেমে সম্প্রতি আইএমএ-র রাজ্য শাখার সদস্যদের গ্রুপে শান্তনুকে নিশানা করে দেবাশিস একের পর এক পোস্ট করেছিলেন। সেই সকল পোস্টের প্রেক্ষিতে রাজ্য শাখার সংবিধানের ৩০ নম্বর পাতার ১৩ নম্বর ধারা উল্লেখ করে গত ২০ সেপ্টেম্বর দেবাশিসকে একটি কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়। দেবাশিস জানান, রাজ্য আইএমএ-র সভাপতি চিকিৎসক চন্দন ঘোষাল, সম্পাদক শান্তনুর সই সম্বলিত বিজ্ঞপ্তির বৈধতা রয়েছে কি না তা জানতে আইএমএ-র সর্বভারতীয় সম্পাদক চিকিৎসক শর্বরী দত্তের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি। পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগে দেবাশিস দাবি করেছেন, গত শনিবার ই-মেলে শর্বরী জানান, ২০১২ সালের পর রাজ্য আইএমএ-র সংবিধানে কোনও সংশোধনী আনা হয়নি। আইএমএ রাজ্য শাখার সেই সংবিধান অনুযায়ী সিউড়ি শাখার সম্পাদককে যে কারণ দর্শানোর নোটিস পাঠানো হয়েছে তা ভিত্তিহীন।
সর্বভারতীয় সম্পাদকের চিঠিকে হাতিয়ার করে দেবাশিসের অভিযোগ, ‘‘এত দিন শান্তনু সেনেরা দাবি করে এসেছেন, ২০১২ সালের পরে ২০১৪ সালে সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। সেই সংশোধনীর কথা বলে গত ১২ বছর ধরে আইএমএ-র ২১ হাজার সদস্যের দেড়শোটির বেশি শাখা পরিচালনা করা হচ্ছে।’’ তাঁর আরও অভিযোগ, ‘‘২০১২ সালের সংবিধান বলছে, নির্বাচনে বিভিন্ন পদে মনোনয়নের ফি হল ২০০০, ১৫০০ এবং ১০০০ টাকা। ২০১৪ সালের সংশোধিত সংবিধানের নাম করে যেটা ওয়েবসাইটে দেওয়া রয়েছে সেখানে মনোনয়ন ফি যথাক্রমে ৫০০০, ৩০০০, ২০০০ টাকা। ২০১২ সালের সংবিধান অনুযায়ী সভাপতি সংগঠনের সর্বেসর্বা। ২০১৪ সালে সেখানে সম্পাদকের হাতে সব ক্ষমতা দেওয়া রয়েছে। ২০১২ সালের সংবিধানে বলা রয়েছে, ভোটের ব্যালট পৌঁছোবে শাখা সম্পাদকদের কাছে। সংবিধান সংশোধন হয়েছে দাবি করে ২০১৪ সাল থেকে প্রতিটি শাখার কাউন্সিল মেম্বারদের কাছে ব্যালট পাঠানো হচ্ছে। এ তো বড় প্রতারণা!’’
আরও পড়ুন:
পাল্টা শান্তনু বলেন, ‘‘আমি সম্পাদক হওয়ার আগে শুধুমাত্র ১৫৬ জন শাখা সম্পাদকের কাছে ব্যালট পেপার যেত। সংবিধান পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে ৭৭০ জন স্টেট কাউন্সিল সদস্যের প্রত্যেকের কাছে ব্যালট পাঠানো হয়। কোনটা বেশি গণতান্ত্রিক সেটা সবাই বুঝতে পারবে!’’ কিন্তু সেই সংবিধানের মান্যতা নেই বলেই তো অভিযোগ দায়ের হয়েছে। জবাবে শান্তনু বলেন, ‘‘যে সংবিধানের বিরোধিতা করা হচ্ছে সেই সংবিধান মেনেই অভিযোগকারী চিকিৎসক সিউড়ি শাখার পদাধিকারী হয়েছেন। গত ১২ বছর ধরে এই সংবিধানের উপর ভিত্তি করেই সদস্যেরা নির্বাচিত হয়েছেন। সেই সকল নির্বাচিত সদস্যদের ভোটেই তো কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব পদাধিকারী হয়েছেন। এই সংবিধান কোনও দিন অবৈধ হতে পারে?’’ দেবাশিসের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ দায়েরের কথা জানিয়ে রাজ্যসভার প্রাক্তন সাংসদ বলেন, ‘‘আমার মামাতো দাদা, বৌদির কাছে মৃত মামিমার নাম করে আমার নামে ভুল তথ্য দিয়ে তাঁদের অনুমতি ছাড়া দেবাশিসবাবু একটা কল রেকর্ড করেন। পরে সেটি সমাজ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। এই ফৌজদারি অপরাধের জন্য আমিও ওঁর বিরুদ্ধে পুলিশে অভিযোগ করেছি।’’
দেবাশিসের অভিযোগ প্রসঙ্গে বীরভূম জেলা পুলিশের এক আধিকারিক বলেন, ‘‘ওঁর অভিযোগ গ্রহণ করা হলেও তা এফআইআর হবে কি না সেটি তদন্তসাপেক্ষ। উনি যে অভিযোগ করেছেন তাতে আইএমএ-র ১৭৩টি শাখার নির্বাচনের বৈঠতা ঘিরেই তো প্রশ্ন উঠে গিয়েছে। তদন্ত করতে হলে আইএমএ-র সর্বভারতীয় শাখাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। এই তদন্ত স্বাস্থ্য দফতর বা অন্য কোনও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের এক্তিয়ারভুক্ত সেই প্রশ্নও রয়েছে। কাজেই সব দিক বিচার করে পরবর্তী পদক্ষেপ করা হবে।’’