সড়ক পরিস্থিতি বেহাল। অভিযোগ, নতুন রাস্তা তৈরি হলেও, তার কঙ্কালসার দশা হয়ে যায় কিছু দিনের মধ্যেই। বিনিয়োগ টানার মতো উপযুক্ত পরিকাঠামো উন্নয়ন এখনও যে দূরঅস্ত— এই অভিযোগও নতুন নয়। উপরন্তু অনুদান-রাজনীতির কারণে রাজ্য পূর্ত দফতরের বাজেটও অতীতে বেড়েছে কার্যত নামেমাত্র। এই পরিস্থিতিতে সড়ক, সেতু, ভবনের মতো পরিকাঠামো নির্মাণে খরচের বিধি বদল করল রাজ্য সরকার। বাস্তবের সঙ্গে মানানসই নয়, কাজের তেমন খরচ (শিডিউল অব রেটস) বাড়িয়ে দেওয়া হল জাতীয় মানের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে। আধিকারিক স্তরের বক্তব্য, এর ফলে উল্লেখযোগ্য ভাবে বাড়াতেই হবে পূর্ত দফতরের বাজেট বরাদ্দ। প্রশাসনিক কর্তাদের অনুমান— কেন্দ্রীয় সরকার যেমন পরিকাঠামো ক্ষেত্রে লক্ষাধিক কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে, তেমনই এ রাজ্যেও পরিকাঠামো খাতে সর্বাধিক হারে বরাদ্দ দেওয়ার পথে হাঁটছে।
রাজ্যের সিদ্ধান্ত—সড়ক পরিকাঠামো তৈরির ক্ষেত্রে এ বার থেকে মেনে চলা হবে জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষের (এনএইচএআই) দর-তালিকা। ভবন-পরিকাঠামোর ক্ষেত্রে কেন্দ্রের পূর্ত দফতরের (সিপিডব্লিউডি) নির্ধারিত দর মানা হবে। ঘটনাচক্রে, এত দিন পর্যন্ত এ রাজ্যের নিজস্ব দর-তালিকা ধরে কাজ করতে হত পূর্ত দফতরকে। যা বাস্তব দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে মানানসই নয়। পূর্ত-কর্তারা জানাচ্ছেন, কেন্দ্রীয় দর তালিকায় কাজের খরচ অনেকটাই বেশি। ফলে পূর্ত দফতরের এখনকার বাজেট বরাদ্দ ধরলে আগের তুলনায় সেই অর্থে এ বার অনেক কম কাজ করা যাবে, যা সম্ভব নয়। ফলে একমাত্র পথ—দফতরের বাজেট বরাদ্দ যথেষ্ট বাড়িয়ে দেওয়া।
ইঞ্জিনিয়ারদের অনেকে জানান, সিমেন্ট, বালি, লোহা, পাথরের বাজারদরও যে ভাবে গত বেশ কয়েক বছরে বেড়েছে, সেই তুলনায় বাড়েনি রাজ্যের নির্ধারিত দর। সড়কের ক্ষেত্রে অন্যতম মূল উপাদান বিটুমিন (চলতি কথায় পিচ)। এত দিন ধরে চলে আসা রাজ্যের দর অনুযায়ী, কেজিপ্রতি বিটুমিনের জন্য বরাদ্দ মাত্র ৩০ টাকা। অথচ, তার বাজারমূল্য প্রায় ৯০ টাকা প্রতি কেজি। ফলে সড়কের গুণমান বজায় থাকে না। ব্যবহৃত হয় প্রয়োজনের তুলনায় কম বা নিম্নমানের উপকরণ। স্বাভাবিক ভাবেই তেমন মানের রাস্তার স্থায়িত্ব স্বল্প সময়েরই হয়ে থাকে। এক কর্তার কথায়, “গোটা দেশে প্রায় ৮৫ লক্ষ টন বিটুমিন দরকার হয় বছরে। এ দেশে তৈরি হয় ৫০ লক্ষ টনের আশেপাশে। বাকিটা বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ইরান যুদ্ধের পর সেই আমদানি কঠিন হয়ে পড়ছে। কেন্দ্রীয় বিধি অনুযায়ী, প্রতি ত্রৈমাসিকে আইওসিএল বিটুমিনের যে দর বেঁধে দেয়, তা মেনে নেয় সরকার। এ রাজ্যেও এ বার তা-ই হবে।”
পূর্ত-কর্তাদের একাংশ জানান, গত বেশ কয়েক বছর ধরেই পূর্ত দফতরের বাজেটে নামেমাত্র বরাদ্দ বাড়ানো হত। তার মধ্যে বেশিরভাগ অর্থ খরচ হত ঠিকাদারদের পাওনা মেটাতেই। বাকি কাজে প্রয়োজনীয় অর্থ মিলত না। এমনকি বাজেট বরাদ্দের পুরো অর্থও পাওয়া যেত না বলে অভিযোগ তাঁদের। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই সড়ক পরিকাঠামোর উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন এ রাজ্যে তেমন হয়নি। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সমান্তরালে ক্রমে কঙ্কালসার পরিস্থিতি হয়েছে জাতীয় সড়ক (এ রাজ্যের রক্ষণাবেক্ষণ-দায়িত্বে থাকা), রাজ্য সড়ক ও অন্যান্য রাস্তার। এখন কেন্দ্রের সব প্রকল্পের সুবিধা নিচ্ছে রাজ্য। পরিকাঠামো খাতে কেন্দ্রীয় সড়ক ও পরিবহণ মন্ত্রকের থেকে বরাদ্দও আসতে শুরু করেছে। কিছু দিন আগেই ছ’টি সড়কের জন্য প্রায় হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে কেন্দ্র। কেন্দ্রের অর্থের সঙ্গে রাজ্যের নিজস্ব বাজেটবৃদ্ধি ঘটলে বর্ধিত দরে আরও বেশি কাজ নিশ্চিত করা সম্ভব।