এক ভোটে জোট হয়। আর এক ভোটে জোট নয়! বারবার এই তৈলাক্ত বাঁশের অঙ্ক করতে বিরক্তির উদ্রেক হচ্ছে বাম ও তার সহযোগী শিবিরে! সামনের পুরভোট ও তার পরে পঞ্চায়েত নির্বাচন মাথায় রেখে বামেদের হাত ছেড়ে এ বার একা এগোতে চাইছে ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট (আইএসএফ)।
বিচ্ছেদ-ভাবনায় ইন্ধন জুগিয়েছে জোড়া কেন্দ্রের উপনির্বাচন ঘিরে ঘটনাপ্রবাহ। বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম কেন্দ্রে বামফ্রন্ট প্রথমে শরিক দল সিপিআইয়ের প্রার্থী শান্তিগোপাল গিরির নাম ঘোষণা করেছিল, তাঁর মনোনয়নপত্রেও প্রস্তাবকের সই ছিল সিপিএম প্রতিনিধির। কিন্তু পরে আবার সেখানে আইএসএফের প্রার্থী মহম্মদ সবে মিরাজ় খানের দিকে চলে যায় সিপিএমের সমর্থন! এ বার নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে উপনির্বাচনে সমঝোতার বিষয়ে আলোচনা চেয়ে সিপিএম তথা বামফ্রন্টকে চিঠি দিয়েছিলেন আইএসএফের চেয়ারম্যান নওসাদ সিদ্দিকী। তাঁদের বলা হয়েছিল, বামফ্রন্ট আগে নিজেরা আলোচনা করে তার পরে জানাবে। কিন্তু তার পরে বামফ্রন্টের তরফে দুই কেন্দ্রে প্রার্থী ঘোষণা হয়ে যাওয়ায় ক্ষুব্ধ আইএসএফ এ বার নন্দীগ্রামে পৃথক প্রার্থী দিয়েছে। রেজিনগরে তারা ‘নিষ্ক্রিয়’ থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
নওসাদের বক্তব্য, ‘‘মোটামুটি ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের জের টেনেই এই উপনির্বাচনে সিদ্ধান্ত হচ্ছে। নতুন কোনও নির্বাচন হিসেবে ধরা হচ্ছে না। গত বিধানসভা নির্বাচনের সূত্র মেনেই আমরা নন্দীগ্রামে লড়ব।’’ এক বার জোট, আর এক বার একক— লডাইয়ের এই রকমফের নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করে নওসাদের আরও সংযোজন, ‘‘এই কারণে আমাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে না। বিজেপির মতো ফ্যাসিবাদী শক্তির বিরুদ্ধে কংগ্রেস, বৃহত্তর বাম এবং আমাদের মতো দলের একসঙ্গে লড়া উচিত। দুর্নীতিগ্রস্ত তৃণমূল কংগ্রেসকে বাইরে রেখে। একসঙ্গে লড়লে একটা বার্তা দেওয়া যাবে, মানুষ বিকল্প পাবেন। কিন্তু একশো বছরের বেশি পুরনো দল যারা, তাদের নেতৃত্ব কেন ভাবছেন না, জানি না!’’
গত লোকসভা নির্বাচনে ডায়মন্ড হারবার কেন্দ্রে দাঁড়ানোর কথা বলেও শেষ পর্যন্ত প্রার্থী হননি নওসাদ। টানাপড়েনের জেরে বামেদের সঙ্গে সমঝোতাও হয়নি। বিধানসভা ভোটের আগে মধ্যরাত পর্যন্ত দফায় দফায় কথা চালিয়ে আসন-রফা হয়েছিল। সেই রফায় আবার অসন্তুষ্ট ছিলেন সিপিএমের কিছু জেলা নেতৃত্ব এবং বাম শরিকদের একাংশ। উপনির্বাচনে আবার রফা এবং আলোচনা না-হওয়ায় সমঝোতার পথ ছেড়ে আগামী পঞ্চায়েত ভোটে একক শক্তিপরীক্ষায় নামতে চায় আইএসএফ। দলীয় মহলে নওসাদের মত, বিধানসভা নির্বাচনেই তাঁরা বাম জোট ছেড়ে আসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ‘ভুল বার্তা’ যাওয়ার আশঙ্কায় ‘ত্যাগ’ স্বীকার করেও রফায় রাজি হয়েছিলেন। বারবার তার পুনরাবৃত্তি সম্ভব নয়। নিচু তলায় বহু ক্ষেত্রেই আইএসএফ সমর্থকেরা সিপিএমের মিছিলে-সমাবেশে সহজে চলে যান। পথ আলাদা করে নিলে নিজেদের শক্তি সংহত করা এবং সংখ্যালঘু জনতার মধ্যে নিজস্ব প্রক্রিয়ায় প্রভাব বাড়ানো যেতে পারে বলে আইএসএফ নেতৃত্বের ধারণা।
সিপিএম অবশ্য এখনও আইএসএফের স্নায়ুর পরীক্ষাই নিতে চায়! দলের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম বলছেন, ‘‘আইএসএফ যোগাযোগ করেছিল ঠিকই। তবে নন্দীগ্রামে গত বিধানসভা নির্বাচনে সিপিআই এবং আইএসএফ, দু’দলেরই প্রার্থী ছিল। সিপিআই ভোট বেশি পেয়েছিল। এ বার তাদের দাবিই গ্রাহ্য করা হয়েছে।’’ নন্দীগ্রাম নিয়ে আইএসএফ ক্ষুব্ধ, রেজিনগরে শরিক আরএসপি আলাদা লড়ছে। এই প্রেক্ষিতে সিপিএম নেতৃত্বের একাংশের মত, অন্য সব দলই মনে করছে তাদের শক্তি বেড়েছে আর বিভিন্ন দাবি সামাল দিয়ে সকলকে রাখতে গিয়ে তাঁদের হিমসিম খেতে হচ্ছে! একই সঙ্গে সেলিমের মত, ‘‘বিজেপি তো চায়, বিরোধী শক্তি যত বেশি ভাগ হোক। শুধু আমরাই এটা ভাবলে হবে না। চাইব, পুরভোটকে সামনে রেখে কংগ্রেস-সহ গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ বিভিন্ন দলের নেতৃত্বই ভাবুন।’’
বিজেপি্ ১ লক্ষ ২৭ হাজার ৩০১
তৃণমূল ১ লক্ষ ১৭ হাজার ৬৩৬
সিপিআই ২৯৯৭
মহম্মদ সবে মিরাজ় খান আইএসএফ ১৮৯৮
শেখ জারিয়াতুল হোসেন কংগ্রেস ৭৯৪