রবীন্দ্রসদনের মঞ্চে জয় গোস্বামী ও তসলিমা নাসরিনের যৌথ সংলাপের সাক্ষী হওয়া হল না কলকাতার। তবে বন্ধু জয়কে সোমবার ফোন করেছিলেন তসলিমা। জয় পরে বলেছেন, “ওঁর (তসলিমা) গলা বুজে আসছিল। উনি খুবই আহত হয়েছেন, কষ্ট পেয়েছেন বোঝা যাচ্ছিল। মঞ্চের উইংসে দাঁড়িয়েও তসলিমার বেদনাহত মুখ দেখেই আমি বুঝতে পারি, কিছু সমস্যা হচ্ছে। তসলিমাকে আর কারও একটি প্রশ্নেও বিব্রত করা উচিত নয়।”
এর আগে সাংবাদিক সম্মেলনে তসলিমাও ‘জয়ের অপমান, আমার অপমান’ আখ্যা দিয়েছিলেন। সোমবার জয়-তসলিমার ফোনে ৩০-৩৫ মিনিটের আলাপচারিতায় তসলিমার সে-দিনের লিখিত বক্তৃতা নিয়ে উচ্ছ্বসিত মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন জয়। তিনি বলেন, “আমি তসলিমাকে বলেছি, আপনার বক্তৃতাটি উচ্চ স্তরের সাহিত্য! এটি যেন অবিলম্বে বই হয়ে বেরোয়। সে-দিন আর যা-ই ঘটুক, অসামান্য বক্তৃতাটিই থেকে যাবে।”
অপমানিত হয়েও নিজের আসনে বসে তসলিমার বক্তৃতা শুনে ওই সন্ধ্যায় আনন্দবাজারের জন্য প্রতিবেদনও লেখেন জয়। এ দিনও জয় বলেছেন, “শহরে তসলিমার আবারও কোনও অনুষ্ঠান হলে ওঁকে না-জানিয়ে টিকিট কেটে শুনতে যাব। কেউ ধিক্কার জানালে জানাবে।”
তবে এই অনুষ্ঠানেই উদ্যোক্তাদের কারও কারও কটূক্তি দর্শকদের মধ্যে উস্কানি ছড়াতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন। মুখ্যমন্ত্রী ছাড়াও বিজেপির নেতা-মন্ত্রীরা মঞ্চে ছিলেন। তসলিমার বঙ্গ থেকে বিতাড়ন-পর্বে বাম সরকার বা তৃণমূলের সমালোচনাও সঙ্গত বলে অনেকে মনে করছেন। কিন্তু অপ্রাসঙ্গিক ভাবেই তাঁর কালজয়ী কবিতা ‘বাবরের প্রার্থনা’র জন্য ওই মঞ্চ থেকে নিশানা হন কবি শঙ্খ ঘোষ। একুশ শতকের গোড়ায় বাংলাদেশে সংখ্যালঘু পীড়ন নিয়ে শঙ্খ ঘোষ কিছু বলেননি, অভিযোগ করে মোহিত রায় বলেন, “পশ্চিমবঙ্গের বিবেক হয়ে ওঠা বরিশালের (জন্মসূত্রে) এক কবি তখন ভারতের বিদেশি আক্রমণকারী বাবরের দুঃখে কবিতা লিখছেন! অন্ধকার সংস্কৃতির কৃষ্ণগহ্বরে আমরা প্রবেশ করছিলাম।”
অনুষ্ঠানের দু’দিন বাদেও এই মন্তব্যের জন্যও উপস্থিত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিরা এখনও পর্যন্ত একটি শব্দ খরচ করেননি। তবে জয় এ দিন বলেছেন, “তসলিমা আলাদা উচ্চতায় কথা বললেও আয়োজকদের মধ্যে এক জন ‘বাবরের প্রার্থনা’কে মুসলিম তোষণের সঙ্গে তুলনা করে কদর্থ করেন।” ১৯৭৪-এ লেখা কবিতাটি গানে রূপান্তর করেছেন প্রতুল মুখোপাধ্যায়। বহুল পঠিত, পুরস্কারে ভূষিত ‘বাবরের প্রার্থনা’ কাব্যগ্রন্থটিও জরুরি অবস্থার সময়ে, ১৯৭৬-এ প্রকাশিত। শঙ্খ ঘোষের সমালোচনা প্রসঙ্গে অত বছর আগে লেখা কবিতাটি টেনে আনাও অনেকের কাছেই অদ্ভুত ও কুরুচিকর ঠেকেছে। জয় এ দিন বলেছেন, “ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ স্থানাঙ্কে লেখা ‘বাবরের প্রার্থনা’ তো পিতৃহৃদয়ের কথা। রুগ্ণ সন্তান এখানে যেন দেশ! কবিতাটি এতটা সঙ্কীর্ণ ভাবে কেউ দেখতে পারেন, সেটাই অভাবনীয়।”
তথাগত রায়ও সে-দিন মঞ্চ থেকে মোহনদাস কর্মচন্দ গান্ধীকে ব্যঙ্গ করে বলেন, ‘দ্য স্টোরি অব মাই এক্সপেরিমেন্টস উইথ ট্রুথ’-এর লেখক নোয়াখালির বীভৎসতার সত্য চেপে গিয়েছিলেন। জীবন বিপন্ন করে গান্ধীর নোয়াখালির শান্তি-যাত্রা নিয়ে কটাক্ষের কুরুচি কেন দেখানো হল, সে প্রশ্নও অদ্যাবধি তোলেননি কেউ। মুক্ত হাওয়ার কলকাতা বোধহয় এ হেন সব মন্তব্যের প্রতিবাদ করতেও ভুলেছে!
কলকাতায় এ দিন কিছু বন্ধুজনের সঙ্গে দেখা করা ছাড়া তাঁর প্রিয় কলেজ স্ট্রিটে কফি হাউসে গিয়েছিলেন তসলিমা। ইনফিউশনে চুমুক দিতে দিতে চেনা-অচেনা সঙ্গীদের সঙ্গে গল্প করেন। কফি হাউসের বোর্ডে ‘আবার আসব’ লিখে এসেছেন বাংলা ভাষার দেশহারা কবি।