“নির্বাসিত মানুষের ক্যালেন্ডারে বছর শুধু সময় নয়, প্রতিটি বছর একটি বন্ধ দরোজা। প্রতিটি মাস, অপেক্ষা। প্রতিটি দিন নিজের ঠিকানা হারানোর দুঃখ। আজ সেই দীর্ঘ অপেক্ষার পর কলকাতার মাটিতে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে, আমি শুধু একটি শহরে ফিরে আসিনি। আমার হারিয়ে যাওয়া জীবনের একটি অধ্যায়ের কাছে ফিরে এসেছি।” সমস্ত পৃথিবীতে যাঁর একটি বই বেরোলেই আঠাশ থেকে তিরিশটি ভাষায় অনূদিত হয়, সেই কবি-লেখক তসলিমা নাসরিন আগের সন্ধ্যায় দীর্ঘ নির্বাসিত জীবনের সারাৎসার যেন তুলে ধরলেন, এ ভাবেই, তাঁর বক্তৃতার আরম্ভে।
সকলেই আমরা জানি উনিশ বছর আগে কী ভাবে হঠাৎ ঝাপটের মুখে ঘটেছিল এই শহর থেকে তাঁর বিতাড়ন। সমগ্র পৃথিবীতে লেখক হিসেবে প্রভূত গুরুত্ব এবং সম্মান পাওয়া সত্ত্বেও তিনি কখনও বাংলা ব্যতিত অন্য ভাষায় লিখতে চাননি। যেমন, চেয়েছিলেন এবং পেরেছিলেন মিলান কুন্দেরা— নিজের চেক ভাষা থেকে আপন সাহিত্যকে সরিয়ে আনতে ফরাসি ভাষায়। কেননা, রাশিয়ান ট্যাঙ্কগুলি একের পর এক দেখা গেল প্রাগের রাস্তায় ১৯৬৮ সালে— আর, বইদোকান ও গ্রন্থাগার থেকে লুপ্ত হতে শুরু করল কুন্দেরা এবং তাঁর বন্ধুদের বইগুলি। তার পরে, তখনও, অন্য লেখকরা দেশত্যাগ করলেও নিজের দেশ ছেড়ে আসার জন্য ’৭৩ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিলেন কুন্দেরা। শেষমেশ, ফ্রান্সই হল তাঁর আশ্রয়। তাই, লেখার আশ্রয়ভাষাও বদলে গেল।
তসলিমা কিন্তু তা করেননি। পাঁচ বছর কেন, পাঁচ ঘণ্টাও নয়। মাত্র দু’ঘণ্টারও কম সময়ে তাঁকে এক প্রকার তাড়া করে নিয়ে গিয়ে উঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল বিমানে, বাধ্যতামূলক সরকারি আবেষ্টনীর মধ্যে।
এ খুবই আশ্বাস ও কৃতজ্ঞতার কথা আমাদের, তাঁর পাঠকদের পক্ষে যে, তরুণ মুখ্যমন্ত্রী জানিয়ে গেলেন, ভবিষ্যতে যখন ইচ্ছে, যত দিনের জন্য ইচ্ছে তিনি এসে কলকাতায় বসবাস করতে পারেন। তসলিমা নাসরিনের নিরাপত্তার সম্পূর্ণ দায়িত্ব তিনি এবং তাঁর প্রশাসন নিচ্ছেন। তসলিমার এই প্রত্যাবর্তনের পিছনে যাঁরা জড়িয়ে রয়েছে, সেই ওসমান মল্লিক, মোহিত রায়— এঁরাও আমাদের কৃতজ্ঞতার দাবিদার।
তসলিমা মনে করিয়ে দিলেন, “আজ পয়লা অগস্ট। অগস্ট আমার জন্মের মাস। অগস্ট আমার নির্বাসনের মাস। আজ থেকে অগস্ট আমার প্রত্যাবর্তনের মাস-ও।” যে রবীন্দ্রসদনের মঞ্চে দাঁড়িয়ে উনি এ কথা বলছেন, ১৯৮৬ সালে এই মঞ্চেই কবিতা পড়তে এসেছিলেন চব্বিশ বছরের এক ছিপছিপে তরুণী। এ বারের মতোই দর্শক আসনে বসে, তাঁর প্রথম যে কবিতার লাইনটি শুনেছিলাম, তা এই, “শৃঙ্খল ভেঙেছি আমি, পান থেকে খসিয়েছি সংস্কারের চুন”। তার পর চল্লিশ বছর কেটে গেছে। নির্বাসিত অবস্থায় তাঁকে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে বিভিন্ন দেশ-মহাদেশে। মৃত্যুদণ্ডের ফতোয়া, বই নিষিদ্ধকরণের চরম মানসিক অত্যাচার, জীবনের একাকিত্ব, সব সহ্য করে তিনি আজও শৃঙ্খল ভাঙার পক্ষে এক বজ্রদণ্ডের মতো দাঁড়িয়ে আছেন। কারণ, তিনি বলছেন, “রাষ্ট্র আমাকে দেশ থেকে সরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আমার ভেতর থেকে দেশকে সরাতে পারেনি।” আমি যখন প্রেক্ষাগৃহ থেকে বেরিয়ে আসছি, আমার চোখ থেকে উদ্গত অশ্রু যেন বলতে চাইছিল, “তোমার হৃদয় ঘরভাঙা পাক ঠাঁই/ তোমায় আজকে হাওয়ায় হাওয়ায় চাই।”
তসলিমা, আপনাকে আমরা আজ সমস্ত সহিত্যপাঠকরা এই স্বাধীন হাওয়ায় হাওয়ায় চাইছি। আর, সেই হাওয়া আমাদের উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
সাক্ষাৎকার-ভিত্তিক অনুলিখন: অভিরূপ মুখোপাধ্যায়